Print Date & Time : 08 November 2026 Sunday 08:56 am

ইউক্রেন যুদ্ধে রোবট সৈনিক: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দাপটে রণক্ষেত্রের সমীকরণ বদল

image

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুদ্ধক্ষেত্রে এখন আর শুধু মানুষের লড়াই নয়, আধিপত্য বিস্তার করছে যান্ত্রিক সেনারা। ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যকার চলমান যুদ্ধে এক অভাবনীয় পরিবর্তনের সাক্ষী হচ্ছে বিশ্ব। সম্প্রতি ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা সংস্থা 'ডেভড্রয়েড' একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে ক্লান্তি আর আতঙ্কে বিপর্যস্ত একদল রুশ সেনা হাত তুলে আত্মসমর্পণ করছে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত গ্রাউন্ড রোবটের কাছে। 

দূরনিয়ন্ত্রিত মারণাস্ত্রের যুগ পেরিয়ে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই যুদ্ধক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নিতে শুরু করেছে। 

ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, যুদ্ধের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো কোনো শত্রু অবস্থান শুধুমাত্র ড্রোন এবং গ্রাউন্ড রোবটের সমন্বয়ে দখল করা সম্ভব হয়েছে। তিনি আরও জানান, গত মাত্র তিন মাসে এই রোবটিক সিস্টেমগুলো ২২ হাজারেরও বেশি মিশনে অংশ নিয়েছে। 

লড়াইয়ের পাশাপাশি রসদ সরবরাহের ক্ষেত্রেও এই রোবটগুলো বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। সম্মুখ সমরের কিছু ব্রিগেডের ক্ষেত্রে প্রায় ৭০ শতাংশ সরবরাহ এখন মানুষের বদলে এই স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমের মাধ্যমে করা হচ্ছে। খাবার, গোলাবারুদ এবং ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি এই রোবটগুলো বিপজ্জনক এলাকা থেকে আহত সেনাদের উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসছে। স্থলপথের পাশাপাশি সমুদ্রপথেও স্বয়ংক্রিয় ড্রোন কৃষ্ণসাগরে নতুন যুদ্ধের রণকৌশল তৈরি করছে। 

বিশেষজ্ঞরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই ব্যবহারকে যুদ্ধের ইতিহাসে ‘তৃতীয় বিপ্লব’ হিসেবে অভিহিত করছেন, যা গানপাউডার এবং পারমাণবিক অস্ত্র আবিষ্কারের মতোই প্রভাব বিস্তারকারী। ২০০০ সালের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের 'প্রিডেটর' ড্রোনের মতো দূরনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হলেও, বর্তমান এআই সিস্টেমগুলো নিজেই লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করা এবং আক্রমণের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করার সক্ষমতা অর্জন করছে। 

তবে এই দ্রুত উন্নতি বিশ্বজুড়ে এক গভীর নৈতিক বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। গবেষক আনা নাদিবাইজে বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে ‘মানুষের নিয়ন্ত্রণ’ রাখা কতটা জরুরি, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে জোরালো আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। 

এআই বিশেষজ্ঞ টবি ওয়ালশ সতর্ক করে বলেছেন, এআই চালিত যুদ্ধ মানুষের চিন্তার গতির চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত এবং প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। যার ফলে, মানুষ হয়তো একসময় আর এই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী হিসেবে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে না। 

এআই প্রযুক্তিতে আধিপত্য বিস্তারের দৌড়ে শামিল হয়েছে বিশ্বের বড় শক্তিগুলো। মার্কিন পেন্টাগন সম্প্রতি ওপেনএআই, এক্সএআই এবং অ্যানথ্রোপিকের মতো বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ২০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থের চুক্তি করেছে যাতে যুদ্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত করা যায়। 

বিপজ্জনক এই প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। জাতিসংঘ ‘প্রাণঘাতী স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবস্থা’নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে আসছে। আগামী জুনে জাতিসংঘের নিরস্ত্রীকরণ গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইউএনআইডিআইআর) আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তায় এআই-এর প্রভাব নিয়ে বিশেষ আলোচনায় বসবে। 

গ্লোবাল সাউথ বা বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোও এই প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণে আঞ্চলিক উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে । বিশেষজ্ঞদের মতে, রাসায়নিক অস্ত্রের মতো এআই-এর ব্যবহারের ক্ষেত্রেও যদি একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক নীতিমালা তৈরি না করা হয়, তবে ভবিষ্যৎ যুদ্ধ আরও ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। 

—জা. অর্থনীতি/এনএ