Print Date & Time : 07 November 2026 Saturday 05:10 am

ব্রাজিল ফুটবলের অমর ১০ কিংবদন্তি

image

আরমান ইসলাম: ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, ব্রাজিলের কাছে এটি সংস্কৃতি, আবেগ এবং পরিচয়ের নাম। বিশ্বের অনেক দেশ ফুটবল খেলেছে, কিন্তু ফুটবলকে শিল্পে পরিণত করেছে ব্রাজিল। এই দেশের ফুটবলাররা বল পায়ে শুধু ম্যাচ জেতাননি, কোটি মানুষের হৃদয়ও জয় করেছেন। কখনও অসাধারণ ড্রিবলিং, কখনও জাদুকরী ফ্রি-কিক, কখনও নিখুঁত ফিনিশিং কিংবা মাঠজুড়ে অনন্য সৃজনশীলতায় তারা বদলে দিয়েছেন ফুটবলের সংজ্ঞা। ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে অসংখ্য কিংবদন্তির জন্ম হলেও কিছু নাম সময়কে ছাড়িয়ে আজও আলো ছড়ায়।

ফ্যালকাও: ভুল সময়ে জন্ম নেওয়া এক জিনিয়াস

পাওলো রবার্তো ফ্যালকাওকে ফুটবল বিশ্ব চিনতো শুধু ফ্যালকাও নামে। ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের এক ‘আনসাং হিরো’ তিনি। অনেকের মতে, ব্রাজিলের স্বর্ণযুগে যদি তিনি খেলতেন, তাহলে তার নাম হয়তো আরও বেশি উচ্চারিত হতো। কিন্তু ভাগ্য তাকে নিয়ে যায় ১৯৮২ বিশ্বকাপের সেই দলে, যেখানে জিকো, সক্রেটিস, এডার কিংবা জুনিয়রের মতো কিংবদন্তিরা ছিলেন, অথচ ট্রফি জেতা হয়নি।

তবুও ফ্যালকাও নিজের শিল্পীসুলভ মিডফিল্ড নিয়ন্ত্রণ দিয়ে বিশ্বকে মুগ্ধ করেছিলেন। বল নিয়ন্ত্রণ, দূরদৃষ্টি এবং পাসিং দক্ষতায় তিনি ছিলেন অসাধারণ। ইতালির রোমা ক্লাবে খেলতে গিয়ে পেয়েছিলেন ‘রোমের অষ্টম সম্রাট’ উপাধি। ফিফার শতাব্দীর সেরা ১২৫ ফুটবলারের তালিকাতেও জায়গা পেয়েছিলেন এই মিডফিল্ড জাদুকর।

জিজিনহো: পরিপূর্ণ ফুটবলারের প্রতিচ্ছবি

ড্রিবলিং, পাসিং, শুটিং, হেডিং কিংবা ফ্রি-কিক ফুটবলের প্রায় প্রতিটি দিকেই ছিলেন দক্ষ। এজন্যই জিজিনহোকে বলা হতো ‘কমপ্লিট ফুটবলার’। ১৯৫০ বিশ্বকাপে তার পারফরম্যান্স আজও আলোচিত।
১৯৫৪ এবং ১৯৫৮ বিশ্বকাপে শেষ মুহূর্তে ডাক পেয়েও খেলেননি তিনি। কারণ তার মনে হয়েছিল তার জায়গায় তরুণ কেউ সুযোগ পাক। সেই তরুণদের তালিকায় ছিলেন পেলের মতো খেলোয়াড়ও। ব্যক্তিত্ব আর খেলোয়াড়সুলভ মনোভাবের দিক থেকেও তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম।

রিভালদো: নীরব ঘাতকের মতো এক সুপারস্টার

রিভালদোকে অনেকেই ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সবচেয়ে অবমূল্যায়িত কিংবদন্তিদের একজন মনে করেন। অথচ তার অর্জনের তালিকা ঈর্ষণীয়। বার্সেলোনার জার্সিতে গোল করেছেন অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতায়। পরে এসি মিলান, অলিম্পিয়াকস কিংবা দেপোর্তিভো লা করুনার হয়েও ছড়িয়েছেন আলো।

তবে জাতীয় দলের জার্সিতেই তিনি সবচেয়ে উজ্জ্বল। ২০০২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের শিরোপা জয়ে তার অবদান ছিল অসাধারণ। রোনালদো আর রোনালদিনহোর পাশে থেকেও নিজের গুরুত্ব বুঝিয়ে দিয়েছিলেন রিভালদো। নিখুঁত বাঁ-পা, দূরপাল্লার শট এবং ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়ার ক্ষমতা তাকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে।

রিভেলিনো: ‘ফ্লিপ ফ্ল্যাপ’-এর জাদুকর

রবার্তো রিভেলিনো শুধু একজন ফুটবলার ছিলেন না, তিনি ছিলেন ফুটবল কৌশলের এক উদ্ভাবক। তার বিখ্যাত ‘ফ্লিপ ফ্ল্যাপ’ ড্রিবল পরে দেখা গেছে ম্যারাডোনা, রোনালদিনহো, ইব্রাহিমোভিচ কিংবা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পায়েও।

দুর্দান্ত ফ্রি-কিক, লম্বা পাস এবং অসাধারণ বল নিয়ন্ত্রণ ছিল তার শক্তি। বিশাল গোঁফ ছিল তার পরিচয়ের অংশ, কিন্তু মাঠে তার আসল পরিচয় ছিল সৃজনশীলতা। ১৯৭০ বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন তিনি।

কাকা: ভদ্রলোক ফুটবলের রাজপুত্র

কাকার মধ্যে ছিল গতি, সৌন্দর্য আর পরিমিতির মিশেল। ছোটবেলায় টেনিসের প্রতি ঝোঁক থাকলেও শেষ পর্যন্ত ফুটবলই তাকে বিশ্বসেরা বানায়। এসি মিলানের জার্সিতে তিনি ছিলেন আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে মার্জিত প্লেমেকারদের একজন।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতানো, ব্যালন ডি’অর জয় কিংবা ফিফার বর্ষসেরা হওয়া— সবই এসেছে তার ক্যারিয়ারে। মাঠে তার দৌড়, ড্রিবলিং এবং নিখুঁত ফিনিশিং তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপ ও কনফেডারেশন কাপ জেতা কাকা ছিলেন এমন এক তারকা, যিনি ফুটবলে সৌন্দর্যের নতুন সংজ্ঞা দিয়েছিলেন।

রোমারিও: গোলবক্সের নির্মম শিকারি

রোমারিও ছিলেন সেই ধরনের স্ট্রাইকার, যিনি অর্ধেক সুযোগ থেকেও গোল বের করে আনতে পারতেন। গোলপোস্টের সামনে তার ঠান্ডা মাথা এবং নিখুঁত ফিনিশিং ছিল অবিশ্বাস্য। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের শিরোপা জয়ে সবচেয়ে বড় নায়ক ছিলেন তিনি।
পিএসভি, বার্সেলোনা কিংবা জাতীয় দল— সব জায়গাতেই গোল করেছেন ধারাবাহিকভাবে। জোহান ক্রুইফ একবার বলেছিলেন, ‘গোল এরিয়ার মধ্যে রোমারিও ছিল অপ্রতিরোধ্য, জিনিয়াস।’ সেই মন্তব্যই বুঝিয়ে দেয় তার শ্রেষ্ঠত্ব।

জিকো: সাদা পেলে

যারা পেলের খেলা দেখেননি, তাদের জন্য ছিলেন জিকো। তাই তাকে বলা হতো ‘সাদা পেলে’। আশির দশকে তার মতো স্কিলফুল ড্রিবলার এবং নিখুঁত ফিনিশার খুব কমই ছিল।
অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হয়েও ব্রাজিলের হয়ে ৭২ ম্যাচে ৫২ গোল করেছিলেন। ফ্রি-কিক নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন এক বিস্ময়। জোরালো গতি আর নিখুঁত নিশানায় নেওয়া তার ফ্রি-কিক আজও ফুটবলপ্রেমীদের মনে গেঁথে আছে। বিশ্বকাপ না জিতেও তিনি হয়ে আছেন ব্রাজিলের অন্যতম সেরা কিংবদন্তি।

রোনালদো: ‘দ্য ফেনোমেনন’

রোনালদো লুইস নাজারিও ডি লিমা— ফুটবল বিশ্ব তাকে চিনত ‘দ্য ফেনোমেনন’ নামে। তার সেরা সময়ের রোনালদো ছিলেন ডিফেন্ডারদের দুঃস্বপ্ন। গতি, শক্তি, ড্রিবলিং এবং ফিনিশিং— সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন পূর্ণাঙ্গ স্ট্রাইকার।
পিএসভি, বার্সেলোনা, ইন্টার মিলান, রিয়াল মাদ্রিদ— সব ক্লাবেই গোলের বন্যা বইয়েছেন। ২০০২ বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে ব্রাজিলকে শিরোপা জেতান। তিনবার ফিফার বর্ষসেরা হওয়া এই কিংবদন্তি বিশ্বকাপে ১৫ গোল করে দীর্ঘদিন রেকর্ড ধরে রেখেছিলেন।

গারিঞ্চা: ড্রিবলিংয়ের অবিনশ্বর জাদুকর

গারিঞ্চার মতো ড্রিবলার ফুটবল ইতিহাসে খুব কমই এসেছে। বল পায়ে তিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। ডিফেন্ডারদের কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় মনে হতো ফুটবল যেন তার পায়ের সঙ্গে কথা বলছে।
১৯৫৮ ও ১৯৬২ বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল দলের অন্যতম বড় শক্তি ছিলেন তিনি। অনেকে মনে করেন, পেলের পর ব্রাজিলের সর্বকালের সেরা ফুটবলার গারিঞ্চাই। তার খেলার আনন্দ আর স্বতঃস্ফূর্ততা আজও ফুটবল ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। 

পেলে: ফুটবলের চিরন্তন রাজা

ফুটবল ইতিহাসে ‘রাজা’ শব্দটি উচ্চারিত হলে প্রথম যে নামটি আসে, সেটি পেলে। দারিদ্র্য থেকে উঠে এসে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রে পরিণত হওয়ার গল্পটি যেন রূপকথার মতো।
মাত্র ১৭ বছর বয়সে বিশ্বকাপ জেতা পেলে পরে আরও দুইবার সেই কীর্তি গড়েন। তিনটি বিশ্বকাপ জেতা একমাত্র ফুটবলার তিনি। ১৩৬৩ ম্যাচে ১২৮১ গোল করার অবিশ্বাস্য রেকর্ড এখনও বিস্ময় জাগায়।

পেলে শুধু একজন ফুটবলার ছিলেন না, তিনি ছিলেন ফুটবলের বিশ্বদূত। তার খেলা, ব্যক্তিত্ব এবং অর্জন ফুটবলকে পৌঁছে দিয়েছে অন্য এক উচ্চতায়। তাই আজও যখন সর্বকালের সেরা ফুটবলারের বিতর্ক ওঠে, তখনও সবচেয়ে জোরালো নামটি পেলেরই।