সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রোল করতে করতে হঠাৎ দেখলেন একটি নির্দিষ্ট পোস্টে হাজার হাজার লাইক, কমেন্ট কিংবা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে একচেটিয়া কুৎসা রটানো হচ্ছে। ভেবেছেন কি, এর পেছনে মানুষের চেয়ে বেশি কাজ করছে কৃত্রিম 'বট বাহিনী'?
ডিজিটাল দুনিয়ায় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে বা নিজেকে রাতারাতি জনপ্রিয় বানাতে বর্তমানে বট (Bot) বা স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারের অপব্যবহার মহামারির রূপ নিয়েছে। কিন্তু একজন মুসলিম হিসেবে এই প্রযুক্তির অনৈতিক ব্যবহার কি ইসলাম সমর্থন করে? চলুন, ইসলামের আয়নায় বিষয়টি সহজভাবে জেনে নেয়।
বট আসলে কী এবং এর ব্যবহার কেমন?
'রোবট' শব্দ থেকে আসা 'বট' হলো একটি বিশেষ কম্পিউটার প্রোগ্রাম, যা মানুষের নির্দেশনা অনুযায়ী ইন্টারনেটে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে।
ব্যবসার ক্ষেত্রে গ্রাহকসেবা (চ্যাটবট), স্বয়ংক্রিয় তথ্য ব্যবস্থাপনা বা সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় পোস্ট শেয়ার করার মতো বৈধ কাজে এটি দারুণ দরকারী এক প্রোগ্রাম।
তবে ভুয়া ফলোয়ার বাড়ানো, কৃত্রিম ট্রেন্ড তৈরি, অর্থের বিনিময়ে অনলাইন ট্রোলিং বা চরিত্রহনন।প্রযুক্তির এই নেতিবাচক অপব্যবহার ইসলামের দৃষ্টিতে মারাত্মক অপরাধ।
কেন অপরাধ? তার প্রধান ৪টি কারণ রয়েছে আসুন সেই সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক
১. ভুয়া ফলোয়ারের মাধ্যমে প্রতারণা
টাকা দিয়ে লাইক, কমেন্ট বা ফলোয়ার কিনে নিজেকে বিপুল জনপ্রিয় জাহির করা এক ধরনের ডিজিটাল ধোঁকাবাজি। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট বলেছেন, তোমরা সত্যকে মিথথার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ো না এবং জেনেবুঝে হককে গোপন করো না। (সুরা বাকারা, আয়াত: ৪২)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও কঠোরভাবে সতর্ক করে বলেছেন, যে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়। (মুসলিম)
২. মিথ্য রিভিউয়ের মাধ্যমে জালিয়াতি সাক্ষ্য প্রদান
বট দিয়ে কোনো পণ্যের অবাস্তব গুণগান গাওয়া কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো ব্র্যান্ডের নামে মিথ্যা কুৎসা রটানো সরাসরি মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার শামিল। অথচ ইসলামে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া কবিরা গুনাহ। আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা মিথ্যা কথা পরিহার করো। (সুরা হজ, আয়াত: ৩০)
৩. ডিজিটাল মাধ্যমে চরিত্রহনন ও ট্রোলিং করা
আজকাল প্রতিপক্ষকে দমাতে কমেন্ট বক্সে বট দিয়ে অকথ্য গালিগালাজ ও সাইবার বুলিং করানো হয়। কোরআনে এমন আচরণকারীদের অভিশাপ দিয়ে বলা হয়েছে, দুর্ভোগ প্রত্যেকের জন্য, যে সামনে নিন্দাকারী ও পেছনে গিবতকারী। (সুরা হুমাযা, আয়াত: ১)
রাসুল (সা.)-এর বাণী অনুযায়ী, কোনো মুসলিমকে গালি দেওয়া ‘ফাসেকি’ বা জঘন্য পাপাচার। (বুখারি)
৪. গুজব ছড়ানো ও কৃত্রিম জনমত গঠন করা
সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই বটের মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে সমাজ বা রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা হচ্ছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, কোনো মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে (যাচাই ছাড়া) তা-ই রটিয়ে বেড়ায়। (মুসলিম)
এইসব অপপ্রচারে যারা অর্থ দেয়, বট পরিচালনা করে কিংবা হুজুগে মেতে তা শেয়ার করে, তারা সবাই পাপের অংশীদার। কারণ আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা কোরো না। (সুরা মায়েদা, আয়াত: ২)
বাস্তব জীবনে আমরা যেভাবে সততা বজায় রাখি, আমাদের ডিজিটাল জীবনও তার বাইরে নয়। প্রযুক্তির ভালো দিক গ্রহণ করা জায়েজ হলেও, বট বা অটোমেশন ব্যবহার করে কাউকে ধোঁকা দেওয়া, গুজব ছড়ানো বা মানুষের মতামতকে কৃত্রিমভাবে প্রভাবিত করা সম্পূর্ণ হারাম। একজন প্রকৃত মুমিনের স্ক্রিন ও জীবন—উভয় জায়গাতেই আল্লাহভীতির প্রতিফলন থাকা অপরিহার্য।
জা.অর্থনীতি/ উমার