অনলাইন ডেস্ক: বগুড়ার শেরপুরে একটি হোটেলে জন্মদিনের কেক কাটার সময় জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংক্রান্ত একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ডা. সামির হোসেন মিশু। তিনি স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি ও বাগেরহাট সরকারি ম্যাটসের ইন্সট্রাক্টর।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) রাত সাড়ে ১১টার দিকে শেরপুর উপজেলার ধুনট মোড়ের হোটেল মকটেল থেকে তাকে আটক করা হয় । পরে তাকে বগুড়া সদর থানায় নেওয়া হয়।
ডা. মিশু বগুড়া শহরের জলেশ্বরীতলা এলাকার বাসিন্দা। তিনি প্রয়াত চিকিৎসক ডা. সাফদার হোসেনের ছেলে। স্থানীয় পর্যায়ে তিনি ‘গরিবের ডাক্তার’ হিসেবে পরিচিত।
তাকে গ্রেপ্তার ঘিরে নানা মহলে চলছে আলোচনা-সমালোচনা, এরই মধ্যে ডা. মিশুর মুক্তি চেয়ে নিয়ে তার বাল্যকালের বন্ধু ড. পিনাকী ভট্টাচার্য নিজের ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন।
ড. পিনাকী ভট্টাচার্য লিখেছেন,
বগুড়ায় ডা সামির হোসেন মিশু গ্রেপ্তার হয়েছে। বিস্ফোরক মামলায়। আমার জন্য এই গ্রেপ্তার একটা জটিল মানসিক ও নৈতিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। আমি জানি এই পোষ্ট নিয়ে আমার হেইটারেরা সমালোচনার বন্যা বয়াইবে। কিন্তু আমি সেই ঝুঁকি সতেচন ভাবেই নিলাম।
একটা কথা পরিষ্কার করে বলি।
ডা. মিশু আমার বাল্যবন্ধু। অতি ঘনিষ্ঠ বাল্যবন্ধু। আর সে আওয়ামী লীগ করে। যখন থেকে আমাদের রাজনৈতিক বিশ্বাস ভিন্ন হতে শুরু করলো, তখন থেকে আমরা কখনো আমাদের রাজনীতি নিয়ে কথা বলিনি। এটা আমাদের অলিখিত চুক্তি ছিলো। আমি আমার বাল্যবন্ধুর বিপরীত শিবিরের অবস্থান বেদনা স্বত্ত্বেও মেনে নিয়েছিলাম। আপনারা জানেন আমি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় লড়াইটা করেছি ও করছি। গত পনেরো বছর এই দলের ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে আমি লড়াই করে এসেছি। কিন্তু আজ যে কথাটা বলব, সেটা রাজনীতির কথা নয়। ন্যায়ের কথা।
মিশুর বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছে, সেটা মিথ্যা। আমার কাছে প্রমাণ আছে। এই মামলা সাজানো হয়েছে তাকে ব্ল্যাকমেইল করার জন্য। এটা বিচার নয়, এটা চাঁদাবাজির হাতিয়ার। মিশুর কাছে এই মামলার জন্য টাকা চাওয়া হয়েছিলো।
বগুড়ার কেউ বিশ্বাস করবে না ডা মিশু বিস্ফোরক নিয়ে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে গেছিলো অথবা কারো উপরে আক্রমণ করার জন্য প্ররোচিত করেছিলো। আর মিশু কে? বগুড়ার মানুষ চেনে তাকে গরীবের ডাক্তার হিসেবে। যে লোক টাকার জন্য রোগী ফেরায় না।
আর বন্ধুত্ব নিয়ে একটা কথা। বন্ধুত্ব আমার কাছে দায়িত্ব, সুবিধাবাদ নয়। আমি কখনো আমার বন্ধুর হাত ছেড়ে দেবোনা। মিশু যদি সত্যিই অপরাধ করত, আমি লুকাতাম না। এই একই কলমে তার বিচার চাইতাম। বন্ধু বলে কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে বসানো আমার নীতি নয়। কিন্তু তখনও আমি বন্ধুর দায়িত্ব পালন করতাম। মিশু অপরাধ করলে কষ্ট পেতাম কিন্তু আমি বন্ধু হিসাবে আমার কর্তব্য থেকে পিছু হঠতাম না। তার ন্যায্য বিচার যেন হয় সেটা দেখতাম, তাকে যেন সাজানো মামলা আর রিমান্ডের নামে নিপীড়ন করা না হয় সেটা দেখতাম, তার পরিবারের পাশে থাকতাম। বাংলাদেশের মতো ক্লোজড সোসাইটিতে এইরকম জটিল অবস্থায় অনেকেই পড়বেন বা পড়েন। আমি পড়বো কখনো ভাবিনি।
অপরাধীকে আড়াল করা আর একজন মানুষের ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করা এক জিনিস নয়। আমি সবসময় দ্বিতীয়টার পক্ষে। আর এই ক্ষেত্রে তো প্রশ্নই আসে না। কারণ অপরাধটাই বানানো। আমার হেইটারেরা বলতে পারে "পিনাকী আওয়ামী লীগারের পক্ষ নিচ্ছে।" না। আমি কোনো আওয়ামী লীগারের পক্ষ নিচ্ছি না। আমি মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে আমার অবস্থান ঘোষণা করছি।
মিথ্যা মামলা, সাজানো এজাহার, ব্ল্যাকমেইলের জন্য আইনের অপব্যবহার এগুলো যার বিরুদ্ধেই হোক অন্যায়। গত পনেরো বছর এই হাতিয়ার দিয়ে আমাদের পক্ষের হাজার হাজার মানুষকে জেলে পোরা হয়েছে। আমরা তখনো চিৎকার করেছি।
আজ যদি একই হাতিয়ার আওয়ামী লীগের একজনের বিরুদ্ধে ব্যবহার হয় আর আমরা চুপ থাকি, তাহলে আমরা সেই ফ্যাসিবাদকেই বৈধতা দিচ্ছি যার বিরুদ্ধে লড়েছিলাম। শুধু হাতবদল হলো, চরিত্র বদলালো না।ন্যায় বেছে বেছে হয় না। শত্রুর জন্যও যদি ইনসাফ চাইতে না পারি, তাহলে আমার ন্যায়ের দাবি ফাঁপা।
ডা. মিশুর মুক্তি চাই। মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার চাই। যে বা যারা এই ব্ল্যাকমেইলের পেছনে, তাদের জবাবদিহি চাই।
আমি বগুড়াবাসীকে এই অন্যায় গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ জানাতে বলি। আমার স্কুলের বন্ধুদের আহবান জানাই সর্বশক্তি দিয়ে নির্ভয়ে মিশুর পাশে দাঁড়িয়ে বন্ধুত্বের দায় শোধ করতে।
কেউ প্রশ্ন করতে পারেন যে, আমি এই বিপদে পড়লে কি মিশু এইভাবে আমার পাশে দাড়াতো? আমি এই প্রশ্নের উত্তর জানিনা। কিন্তু আমি বন্ধু হিসাবে আমার কর্তব্য জানি।
মিশু পাচই আগষ্টের পরে বগুড়া থেকে পালায় নাই। আজকে একটা সামাজিক অনুষ্ঠান থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হলে গ্রেপ্তার না করেও জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়। মামলা চালাতে হলে তাকে গ্রেপ্তার করা আবশ্যক না।
মিশুকে সসন্মানে মুক্তি দিন। মিশু অপরাধ করে থাকলে আদালতে প্রমাণ দাখিল করে শাস্তি দিন। অযথা কাউকে হয়রানি করবেন না। এটা শুধু মিশুর জন্য না, কারো উপরেই অন্যায়ভাবে বেইনসাফি করবেন না।
‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’
—জা. অর্থনীতি/এএইচএ