জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: সয়াবিন তেল, দুধ কিংবা টুথপেস্টের কথা তো শুনেছেন! কিন্তু ভেবেছেন কি- সকালে যে মিষ্টি এক কাপ চা বা মিষ্টি কোনো খাবার খাচ্ছেন, তার সাথেও অজান্তেই পেটে চলে যাচ্ছে ক্ষতিকর প্লাস্টিক কণা? হ্যাঁ, চাঞ্চল্যকর এক নতুন গবেষণায় পাওয়া গেছে চিনিতেও বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক!
দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া টুথপেস্ট, দুধ ও সয়াবিন তেলে আগেই মিলেছিল মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি। আর এবার নতুন করে যুক্ত হলো আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকার অন্যতম জরুরি উপাদান- চিনি। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার খুচরা বাজার থেকে পরীক্ষা করা চিনির শতকরা ৯৫ ভাগ নমুনাতেই ক্ষতিকর এই মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। আপনার কেনা প্রতি কেজি চিনিতে ২১০ থেকে ৫০৮টি পর্যন্ত অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা মিশে থাকছে!
এই গবেষণাটি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস’-এ প্রকাশিত হয়েছে। দেশের বিশিষ্ট গবেষক সাদিয়া আফরিন, নায়ন হোসেন ও মোস্তাফিজুর রহমান ঢাকার বিভিন্ন বাজার থেকে ব্র্যান্ডেড এবং খোলা- সাত ধরনের চিনির নমুনা সংগ্রহ করে এই শিউরে ওঠার মতো তথ্য সামনে এনেছেন।
গবেষণায় দেখা যায়, প্যাকেটজাত বা ব্র্যান্ডেড চিনিতে প্রতি কেজিতে গড়ে ৩২২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা থাকলেও, খোলা চিনিতে এর পরিমাণ আরও বেশি—গড়ে প্রায় ৪০৩টি!
খালি চোখে এসব কণা ধরা না পড়লেও, ল্যাব পরীক্ষায় এদের আকার পাওয়া গেছে মাত্র ১২ মাইক্রোমিটার থেকে ৩ দশমিক ১৯ মিলিমিটার পর্যন্ত। যার মধ্যে ৬৩ শতাংশই আঁশজাতীয়, ২১ শতাংশ খণ্ডাকৃতির, ১১ শতাংশ পাতলা স্তর এবং ৫ শতাংশ ছিল গোলাকার প্লাস্টিক কণা।
রাসায়নিক বিশ্লেষণে পিভিসি, নাইলন, পলিইথিলিনের মতো ভয়াবহ সব প্লাস্টিক উপাদানের সন্ধান মিলেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, চিনিতে কীভাবে আসছে এই বিষ?
গবেষকদের মতে, চিনি উৎপাদন, পরিশোধন, পরিবহন ও বিক্রির প্রতিটি ধাপে ব্যবহার করা হচ্ছে প্লাস্টিকের পাইপ, ফিল্টার, বস্তা, কনভেয়ার বেল্ট এবং নিম্নমানের প্যাকেজিং। এছাড়া বাজারজাতকরণের সময় খোলা অবস্থায় বাতাস থেকেও চিনিতে মিশছে এসব অণুকণা।
স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরে গবেষকরা জানান, শুধু চিনি থেকেই একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন তার শরীরের প্রতি কেজি ওজনের বিপরীতে গড়ে ০.২১৭৮টি মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করছেন। যা দীর্ঘমেয়াদে শরীরে জমা হয়ে ক্যানসারসহ নানা জটিল শারীরিক সমস্যা তৈরি করতে পারে।
টুথপেস্ট, দুধ, সয়াবিন তেল এবং এখন চিনি- সবখানেই যদি এই প্লাস্টিকের রাজত্ব চলে, তবে খাদ্যনিরাপত্তা থাকে কোথায়? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটাকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। খাদ্য উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ, প্লাস্টিকের ব্যবহার হ্রাস এবং মাইক্রোপ্লাস্টিক পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা এখনই সময়ের দাবি। তাই সচেতন হোন, খাদ্যনিরাপত্তায় সরকারকে জোরালো পদক্ষেপ নিতে সোচ্চার হোন।
—জা.অর্থনীতি/জেআরটি