Print Date & Time : 23 October 2026 Friday 08:44 am

ইউয়ান কি সত্যিই ডলারকে হারাবে

image

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: বিশ্বের অর্থনীতিতে গত ৮০ বছর ধরে যে মুদ্রাটি একচেটিয়া রাজত্ব করে আসছে, এবার কি তবে তার পতনের সময় ঘনিয়ে এসেছে? বাংলাদেশের কোনো সাধারণ কেনাকাটা থেকে শুরু করে দুবাইয়ের বিলাসবহুল বাড়ি- সব লেনদেনের অদৃশ্য সুতো এতদিন ছিল আমেরিকার হাতে। কিন্তু এখন সেই অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দিতে নেপথ্যে তৈরি হচ্ছে এক অদৃশ্য মাস্টারপ্ল্যান! কী সেই পরিকল্পনা, আর কে ছক কষছে এই পতনের?

পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো বড় সাম্রাজ্যই চিরস্থায়ী হতে পারেনি। রোমানদের স্বর্ণমুদ্রা কিংবা ব্রিটিশদের পাউন্ড—একসময় বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করলেও আজ সেগুলো ইতিহাস। একইভাবে গত ৮ দশক ধরে বিশ্ববাজারে রাজত্ব করছে মার্কিন ডলার। আমেরিকা এতদিন এই মুদ্রার জোর দেখিয়ে যেকোনো দেশের অর্থনীতিকে যেমন আকাশে তুলতে পেরেছে, তেমনি এক নিমেষে মাটিতে নামিয়েও দিয়েছে।

তবে এই ক্ষমতার সূচনা হয়েছিল ১৯৪৪ সালে, ব্রেটন উডস সম্মেলনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিপর্যস্ত দেশগুলোকে আমেরিকা আশ্বাস দিয়েছিল- ডলারের পেছনে সমপরিমাণ সোনা গচ্ছিত থাকবে। কিন্তু ১৯৭১ সালে আমেরিকা হঠাৎ সেই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসে। এরপর তারা নতুন কৌশল হিসেবে সৌদি আরবের সাথে একটি চুক্তি করে, যা ইতিহাসে ‘পেট্রোডলার’ নামে পরিচিত। নিয়ম হয়- বিশ্বের যেকোনো দেশকে জ্বালানি তেল কিনতে হলে অবশ্যই ডলার ব্যবহার করতে হবে। আর এভাবেই পুরো বিশ্ব আমেরিকার অর্থনৈতিক বলয়ে আটকা পড়ে।

আমেরিকার এই একচ্ছত্র আধিপত্যে প্রথম বড় ধাক্কা আসে ২০২২ সালে। রাশিয়ার ওপর অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। ঠিক তখনই সতর্ক হয়ে যায় চীন। বেইজিং বুঝতে পারে- আজ যা রাশিয়ার সঙ্গে ঘটেছে, কাল তা তাদের সঙ্গেও হতে পারে।

এরপরই চীন ও রাশিয়া নিজেদের মুদ্রায় বাণিজ্য শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়। শুধু তাই নয়, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪০টিরও বেশি দেশের সঙ্গে বিকল্প বাণিজ্য চুক্তি করা হয়, যার মাধ্যমে মার্কিন মুদ্রাকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি নিজস্ব মুদ্রায় কেনাবেচা চালু হচ্ছে। এমনকি যে পেট্রোডলারের ওপর ভর করে আমেরিকা টিকে ছিল, সেই সৌদি আরবও এখন চীনের কাছে বিকল্প মুদ্রায় তেল বিক্রি করতে সম্মত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ এবং ইউরোপের কিছু বড় জ্বালানি কোম্পানিও এখন এই বিকল্প পথ ব্যবহার করছে।

চীন এখানেই থেমে থাকেনি; তারা চালু করেছে তাদের নিজস্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো- এক দেশ থেকে অন্য দেশে সরাসরি ডিজিটাল ওয়ালেটে অর্থ পৌঁছে যাবে। মাঝে কোনো মধ্যস্থতাকারী ব্যাংকের প্রয়োজন হবে না। ফলে আমেরিকা চাইলেও এই লেনদেনে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।

যদিও বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি বিশাল অংশ এখনো পুরনো ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে এবং পরিবর্তনের এই পথ মোটেও সহজ নয়, তবুও শক্তির ভারসাম্য যে বদলে যাচ্ছে তা নিশ্চিত। ইতিহাস আমাদের শেখায়- কোনো মুদ্রাই চিরদিন তার আধিপত্য ধরে রাখতে পারে না। পর্তুগিজ, স্প্যানিশ বা ব্রিটিশ যুগের মতো আমরাও কি তবে এক নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি?

—জা.অর্থনীতি/জেআরটি