Print Date & Time : 07 November 2026 Saturday 10:27 am

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধা কতটা

image

অনলাইন ডেস্ক: দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন হলো আজ। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বেলা ২টা থেকে জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে ঐতিহাসিক এই নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়। বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ শেষে ফলাফল ঘোষণা করা হয়। এতে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। 

এ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী ছিলেন দলটির সদ্য সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান অলি আহমদ। ১১–দলীয় ঐক্যের অন্যতম শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস।

সংরক্ষিত নারী সদস্যসহ ভোটার ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য। বিএনপির আসলাম চৌধুরীর সংসদ সদস্য পদ আদালতের নির্দেশে বাতিল রয়েছে।সংসদে বিএনপির সদস্যসংখ্যা ২৪৭। অন্যদিকে ১১–দলীয় ঐক্যের মোট সদস্য ৯০ জন। অন্যরা স্বতন্ত্র, বিএনপি জোটের শরিক এবং ইসলামী আন্দোলনের সদস্য।

রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ। সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে রাষ্ট্রের অন্য সব ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়েছে। তাঁর নামেই রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তবে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির পদটি মূলত রাষ্ট্রপ্রধানের, সরকারপ্রধানের নয়। ফলে রাষ্ট্রপতির পদটির মর্যাদা ও আনুষ্ঠানিক গুরুত্ব যতটা, নির্বাহী ক্ষমতা ততটা নয়। এখন অনেকের কৌতূহল, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কতটুকু এবং তিনি কী কী সুবিধা পান?

সংবিধান অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির নিজস্ব সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। এর বাইরে রাষ্ট্রপতিকে প্রায় সব দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়। তবে রাষ্ট্রপতির জন্য রয়েছে বঙ্গভবনের মতো বিশাল সরকারি বাসভবন, বেতন-ভাতা, পরিবহন, চিকিৎসা, আপ্যায়নসহ নানা সুযোগ-সুবিধা। পদ ছাড়ার পরও সাবেক রাষ্ট্রপতিরা কিছু সুবিধা পান।

সংবিধানের ৪৮ (৩) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাধীন ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে। এর একটি হলো প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ এবং অন্যটি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ। এ বিষয়ে সংবিধানে বলা হয়েছে, সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী এবং ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ছাড়া রাষ্ট্রপতি তাঁর অন্য সব দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন।

সংসদ নির্বাচনে কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সাধারণত সেই দলের সংসদীয় দলের নেতাকেই প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন রাষ্ট্রপতি। তবে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে কে সরকার গঠন করতে পারবেন, সে বিষয়ে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে কাজ করতে বাধ্য নন। সংবিধান তাঁকে এ ক্ষেত্রে স্বাধীন ক্ষমতা দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় ও পররাষ্ট্রনীতি-সংক্রান্ত বিষয় সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত রাখবেন। রাষ্ট্রপতি কোনো বিষয় মন্ত্রিসভার বিবেচনার জন্য পেশ করতে অনুরোধ জানালে প্রধানমন্ত্রী তা মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করবেন।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সুরক্ষা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আদৌ কোনো পরামর্শ দিয়েছেন কি না এবং দিয়ে থাকলে কী পরামর্শ দিয়েছেন, সে সম্পর্কে কোনো আদালত কোনো প্রশ্নের তদন্ত করতে পারবেন না।

রাষ্ট্রপতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা হলো দণ্ড মওকুফ বা কমানোর ক্ষমতা। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের দেওয়া দণ্ড রাষ্ট্রপতি মার্জনা, স্থগিত, হ্রাস বা মওকুফ করতে পারেন; যদিও সংসদীয় ব্যবস্থার সামগ্রিক কাঠামোর মধ্যে রাষ্ট্রপতির অন্যান্য দায়িত্বের মতো এ ক্ষমতার প্রয়োগ সরকারের পরামর্শের ওপর নির্ভর করে।

রাষ্ট্রপতির পদটির আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো সাংবিধানিক দায়মুক্তি। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে কোনো আদালতে জবাবদিহি করতে হয় না। তাঁর কার্যকাল চলাকালে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আদালতে ফৌজদারি মামলা করা যায় না এবং তাঁকে গ্রেপ্তার বা কারাগারে পাঠানোর জন্য আদালত থেকে পরোয়ানাও জারি করা যায় না।

তবে এর অর্থ এই নয় যে রাষ্ট্রপতিকে কোনোভাবেই পদ থেকে সরানো যায় না। সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় তাঁকে অভিশংসন করা যায়। আবার শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণেও তাঁকে পদ থেকে অপসারণের বিধান রয়েছে।

রাষ্ট্রপতি পদ থেকে পদত্যাগ বা অবসরে যাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে বাধা নেই।

রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও উত্তরাধিকারী দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি পদে বহাল থাকেন। একই ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ রাষ্ট্রপতি থাকতে পারেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে আবদুল হামিদ রাষ্ট্রপতি হিসেবে পরপর এবং সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ দায়িত্ব পালন করেন।

রাষ্ট্রপতি পদে থাকার সময় তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য থাকেন না। কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে দায়িত্ব গ্রহণের দিন তাঁর সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয়ে যায়।  রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য বয়স কমপক্ষে ৩৫ বছর হতে হয়। 

বর্তমান সংবিধান অনুসারে, রাষ্ট্রপতি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না। জাতীয় সংসদের সদস্যরা তাঁকে নির্বাচিত করেন। একজন সংসদ সদস্য কোনো প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করেন এবং আরেকজন তা সমর্থন করেন।

ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার বিপরীতে রাষ্ট্রপতির পদটির আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা বেশ বিস্তৃত। রাষ্ট্রপতি কী সুযোগ-সুবিধা পান, তা বলা আছে দ্য প্রেসিডেন্টস (রেমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) (সংশোধন) অ্যাক্টে। রাষ্ট্রপতির মাসিক বেতন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এই বেতন আয়করমুক্ত। সর্বশেষ ২০১৬ সালে বেতন বাড়ানো হয়। আগে মাসিক বেতন ছিল ৬১ হাজার ২০০ টাকা। রাষ্ট্রপতি অবসর বা পদত্যাগের পরও কিছু সরকারি সুবিধা পান।

রাষ্ট্রপতির আপ্যায়ন বা এন্টারটেইনমেন্টের জন্যও বার্ষিক ভাতা রয়েছে। এই ব্যয়ের নিরীক্ষা করা হয় না।

রাষ্ট্রপতির জন্য সরকারি বাসভবন বঙ্গভবন নির্ধারিত। এর সাজসজ্জা, রক্ষণাবেক্ষণসহ প্রয়োজনীয় ব্যয় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বহন করা হয়। রাষ্ট্রপতির সরকারি যাতায়াতের জন্য গাড়ি ও প্রয়োজনীয় পরিবহনসুবিধাও সরকার দিয়ে থাকে।

রাষ্ট্রপতি সরকারি কাজে বিদেশ সফরে গেলে সরকার নির্ধারিত হারে ভাতা পান।

রাষ্ট্রপতির জন্য রয়েছে স্বেচ্ছাধীন তহবিল। বছরে এ তহবিলের পরিমাণ দুই কোটি টাকা। রাষ্ট্রপতির বিবেচনায় বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় এ অর্থ ব্যয় করা যায়।

এ ছাড়া রাষ্ট্রপতি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার জন্যও রয়েছে বিশেষ সুবিধা। রাষ্ট্রপতি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা দেশের যেকোনো হাসপাতালে বিনা খরচে চিকিৎসার সুবিধা পাবেন। চিকিৎসকদের পরামর্শে দেশের বাইরে চিকিৎসার প্রয়োজন হলে সেই ব্যয়ও সরকার বহন করে।

রাষ্ট্রপতির বিমানভ্রমণের জন্য বিমাসুবিধাও রয়েছে। বর্তমানে এ সুবিধার পরিমাণ বছরে ২৭ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের আগে এর পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ টাকা।

অর্থাৎ রাষ্ট্রপতির বেতন ছাড়াও বাসভবন, গাড়ি, চিকিৎসা, বিদেশ সফরের ভাতা, আপ্যায়ন, বিমানভ্রমণের বিমাসহ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় তাঁর দায়িত্ব পালনের জন্য বিস্তৃত সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশের সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির পদটির মূল বৈশিষ্ট্য এখানেই—তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক ব্যক্তি, কিন্তু সরকারের প্রধান নন। সরকারের নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্র প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা।

—জা.অর্থনীতি/আরএস