Print Date & Time : 08 November 2026 Sunday 10:30 am

লালমনিরহাটে কৃষকের সোনালি আঁশের স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্ন

image

লালমনিরহাট প্রতিনিধি: লালমনিরহাটে চলতি মৌসুমে পাটের আশানুরূপ ফলন পাননি কৃষকেরা। অল্প ফলনের পাশাপাশি ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার শঙ্কায় ভুগছেন তারা।

উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম না পেলে গত কয়েক বছরের মতো এবারো লোকসানের মুখ দেখবে কৃষকরা, পাশাপাশি আগামী মৌসুমে পাট চাষে নিরুৎসাহিত হবে এই জেলার কৃষকেরা।

জেলার আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা, পাটগ্রাম ও সদর উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চল ও গ্রামে এবার ব্যাপকভাবে পাটের আবাদ হয়েছে। বিশেষ করে তিস্তা, ধরলা ও সানিয়াজান নদীর চরাঞ্চলের অনাবাদি ও বন্যাপ্রবণ জমিতে এবং জেলার কিছু কিছু উঁচু এলাকার জমিতেও পাট চাষে আগ্রহ বেড়েছে কৃষকদের মাঝে। যেসব জমিতে ধানসহ অন্যান্য ফসল ভালো হয় না, সেসব জমিতেও পাটের আবাদ করেছে কৃষকেরা। কিন্তু ফলাফলে ভাল ফলনের আশা ভেস্তে গিয়ে ভাল দাম নিয়েও হতাশ অনেকে।

সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জাগ দেওয়া বা পচানো পাট থেকে আঁশ বের করার কাজে জোর দিয়েছে কৃষকেরা, কোন কোন কৃষকের পাট এখনও পরিপূর্ণ জাগ বা পচানো হয়নি, তবে কিছু দিনের মধ্যে পুরোপুরি শেষ হবে পাট থেকে আঁশ ছাড়ানোর পর্ব।

কৃষকেরা পাট কাটার পরে ডোবা নালা পুকুর ও খাল বিলের পানিতে বিশেষ কায়দায় স্তূপ আকারে রেখে দেয় পাট, ২০-২৫ দিন পরে জাগ আসলে বা পচন হলে সেখান থেকে আঁশ ছাড়িয়ে নিয়ে রৌদ্রে শুকিয়ে নেয়।

কৃষকরা জানান, এ বছর চলতি মৌসুমের শুরুতে খরার কারণে পাটের জমিতে সেচ দিতে হয়েছে। আবার পরবর্তীতে প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে উৎপাদন কিছুটা কমেছে। এ বছর অনেক এলাকায় রোগবালাইয়ের প্রকোপও তুলনামূলক বেশি ছিল। ফলে পাটের ফলন আশানুরূপ হয়নি।

পাট চাষিরা জানান, গত কয়েক বছর পাটের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় উৎপাদন খরচ তুলতে হিমশিম খেতে হয়েছে তাদের। কখনো কখনো পাট বিক্রি করে লাভের পরিবর্তে লোকসান গুনতে হয়েছে। কৃষকের ভাষায়, তাদের কাছে এক সময়ের সোনালি আঁশ গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এবারো ফলন ভালো না হওয়ার পাশাপাশি ভাল দাম না পেলে সেই ক্ষত শুকাতে পারবে না তারা।

পাটের বাজার নিয়ে কৃষকদের মধ্যে রয়েছে বড় শঙ্কা। কৃষকের অভিযোগ, পাট কাটার মৌসুমে স্থানীয় ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীরা সিন্ডিকেট করে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। এতে কৃষকরা উৎপাদন খরচের তুলনায় কম দামে পাট বিক্রি করতে বাধ্য হন। অথচ পরে সেই পাটই বেশি দামে বিক্রি করে লাভবান হন মধ্যস্বত্বভোগীরা।

পাট চাষিরা বলছেন, সরকারি উদ্যোগে পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে এবং সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পাট কেনার ব্যবস্থা করা হলে তারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন। ধান ও গমের মতো পাটের ক্ষেত্রেও সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন তারা।

আদিতমারী উপজেলার পাট চষী সামাদ মিয়া বলেন, প্রকৃত পাটচাষিদের প্রশিক্ষণ, উন্নতমানের বীজ ও কৃষি উপকরণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছতা প্রয়োজন। তাদের দাবি, যারা প্রকৃতপক্ষে পাট চাষ করেন, তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা দেওয়া হলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে।

কালীগঞ্জ উপজেলার চলবলা ইউনিয়নের কৃষক নুর হাবিব বলেন, পাটের জমিতে পানি জমা হয়ে থাকার কারণে এবার পাটের গাছ লম্বা হয়নি ফলে পাটের আশ ভাল হয়নি এবারেও আমাদের লোকসানের মুখ দেখতে হবে।

চরাঞ্চলের কৃষক সাইদুল ইসলাম বলেন, আমরা প্রতিবার আশা নিয়ে পাট চাষ করি কিন্তু প্রতিবারই লোকসানের মুখ দেখি, অতিবৃষ্টির কারণে এবার পাটের গাছ আশানুরূপ বড় হয়নি তাই ফলন কম হয়েছে। আমরা চাই সরকার পাটের দাব নির্ধারণ করে দিলে কিছুটা ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারবো।

লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মোঃ মতিউল আলম জানান, এ বছর জেলায় ৪০৪৫ হেক্টর জমিতে পাট চাষ করা হয়, যেখানে আমাদের লক্ষ মাত্রা ছিলো ৪০১০ হেক্টর, লক্ষ মাত্রার চেয়ে ৩৫ হেক্টর জমিতে বেশি চাষ হলেও। এবার অতিবৃষ্টির কারণে ফলন কিছুটা কম হয়েছে তবে আশা করি আগামী বছরে আবহাওয়া ভাল থাকলে ফলন ভাল হবে। এই জেলায় তোশা পাট, দেশি পাট ও ক্যানাফ পাট নামে ৩ ধরনের পাট চাষ করা হয়।

—জা. অর্থনীতি/এলএটি