Print Date & Time : 28 October 2026 Wednesday 07:39 am

১১০ বছরেও বদলায়নি সিলেট-আখাউড়া রেলপথ

image

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: ব্রিটিশ আমলে পণ্য পরিবহনের জন্য তৈরি হয়েছিল সিলেট-আখাউড়া রেলপথ। এক শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই রেলপথে লাগেনি উন্নয়নের ছোঁয়া। পুরোনো লাইন, ঝুঁকিপূর্ণ সেতু, যন্ত্রাংশের ঘাটতি আর এক লাইনে ট্রেন চলাচলের কারণে প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রীরা। গত তিন দশক ধরে ডাবল লাইনের দাবি উঠলেও বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। সম্প্রতি অবশ্য মিটারগেজ থেকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে দেখা যায়, সিলেট-আখাউড়া ২৩৯ কিলোমিটার রেলপথের বেশিরভাগ অংশই ব্রিটিশ আমলে নির্মিত। ট্রেন চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হলেও বিভিন্ন স্থানে রেললাইনের নাট-বল্টু, ফিশপ্লেট ও ক্লিপসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ নেই। কোথাও কোথাও বল্টুর পরিবর্তে সুতো দিয়ে বাঁধার চিত্রও দেখা গেছে।

রেলপথের বিভিন্ন স্থানে থাকা শতবর্ষী সেতুগুলোও রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব কারণে লাইন দুর্বল হয়ে বড় ধরনের ট্রেন দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এক লাইনে ট্রেন চলাচল করায় ক্রসিংয়ের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। আবার পাহাড়ি এলাকায় ইঞ্জিন ও রেললাইন দুর্বল হওয়ায় ট্রেনের গতিও কমে যায়।

জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯১২ থেকে ১৯১৫ সাল পর্যন্ত সিলেট-আখাউড়া রেলপথ নির্মাণ করা হয়। শুরুতে পণ্য পরিবহনের কথা মাথায় রেখে রেলপথটি তৈরি করা হলেও পরবর্তী সময়ে বাণিজ্যের পাশাপাশি যাত্রী পরিবহনও বাড়তে থাকে। সময়ের সঙ্গে সিলেট অঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে ট্রেন।

তবে শত বছর পেরিয়ে গেলেও এই রেলপথ নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের রেলপথে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও সিলেট-আখাউড়া রেলপথের বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে ডাবল লাইনের দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয়রা। এর মধ্যে জনবল ও ইঞ্জিন সংকটের কারণ দেখিয়ে একের পর এক লোকাল ট্রেন ও স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রতিদিন রেলসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এই অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষ।

ঢাকা-সিলেট রেলপথের এক যাত্রী বলেন, আখাউড়া থেকে সিলেট পর্যন্ত বেশিরভাগ রেলপথই দুর্বল। প্রতিবছর এ পথে বিভিন্ন দুর্ঘটনাও ঘটে। ব্রিটিশ আমলের তৈরি রেললাইনে টুকটাক সংস্কার করা হলেও বড় ধরনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এই পথে ট্রেন চলাচল নির্বিঘ্ন করতে হলে ডাবল লাইন করার বিকল্প নেই। এখন সিলেট থেকে ঢাকা যেতে প্রায় আট ঘণ্টা লাগে। ডাবল লাইন হলে সময়ও অনেক কমে আসবে।

শমশেরনগর স্টেশনের বাসিন্দা গিলমান আহমেদ বলেন, ব্যবসায়িক কাজে নিয়মিত ঢাকায় যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু ট্রেনের ভোগান্তির কারণে অনেক ব্যবসায়ী এখন বাসে যাতায়াত করেন। পাহাড়ি এলাকায় ট্রেন ধীরগতিতে চলে, আবার রেল ক্রসিংয়ের জন্যও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। কোনো কারণে ছোট দুর্ঘটনা ঘটলেও একসঙ্গে অনেক ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় হয়। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য সিলেট-আখাউড়া রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীত করা জরুরি।

এই পথের নিয়মিত ট্রেনযাত্রী ও সচেতন নাগরিক মুহাম্মদ খান বলেন, আখাউড়া থেকে সিলেট পর্যন্ত ডাবল লাইন করা খুবই জরুরি। শুধু ডুয়েলগেজ বা ব্রডগেজ করা হলে সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হবে না। ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথের ঝুঁকি থেকেই যাবে এবং ক্রসিং সমস্যাও থাকবে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এই অঞ্চলের মানুষের দাবি, সিলেট-আখাউড়া রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীত করা হোক।

বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ডাবল লাইনের পরিবর্তে সিলেট-আখাউড়া রেলপথকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে এই পথে নতুন ধরনের ট্রেন যুক্ত করা সম্ভব হবে এবং মিটারগেজ ও ব্রডগেজ—দুই ধরনের ট্রেন চলতে পারবে। এ প্রকল্প নিয়ে চীনের সঙ্গেও ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে।

কুলাউড়া রেলওয়ে স্টেশনমাস্টার রুমান আহমেদ ও শমশেরনগর স্টেশনমাস্টার রজত কুমার রায় বলেন, ডাবল লাইন হবে কি না, তা তাদের জানা নেই। তবে আখাউড়া-সিলেট রেলপথকে ব্রডগেজে রূপান্তরের পরিকল্পনার কথা তারা শুনেছেন। এটি বাস্তবায়ন হলে নতুন ও পুরোনো—দুই ধরনের ট্রেন চলাচলের সুযোগ তৈরি হবে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান বলেন, সরকারিভাবে সিলেট-আখাউড়া রেললাইনকে মিটারগেজ থেকে ডুয়েলগেজে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে চীনের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। লাইনটি ডুয়েলগেজ হলে নতুন ট্রেন সংযোজন করা হবে। এতে এ পথে ভিন্ন মাপের দুটি ট্রেন চলাচল করতে পারবে।

—জা. অর্থনীতি/এলএটি