কক্সবাজার প্রতিনিধি: ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় বাজারে ছিলেন মুহাম্মদ কাশেম। সেখান থেকে তাকে তাড়া করে বাড়িতে ঢুকে শাহেদ খান, আবদুল গফুর ও রাসেলসহ কয়েকজন কুপিয়ে হত্যা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নের কামিতার পাড়া গ্রামের কবির বাজারে।
পরদিন কাশেমের স্ত্রী ফাতেমা বেগম বাদী হয়ে মহেশখালী থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় রাসেলসহ ১০ জনকে আসামি করা হয়। রাসেল ওই মামলার ৪ নম্বর আসামি।
ঘটনার এক মাস পর ২৪ মে ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও মালামাল লুটের অভিযোগে আদালতে মামলা করেন রাসেলের মা নুর জাহান বেগম। ওই অভিযোগে নিহত কাশেমের স্ত্রী ফাতেমা বেগম, তার শাশুড়ি, ভাসুর, দেবর ও ননদসহ ৭ জনকে আসামি করার আবেদন করা হয়।
প্রায় ৪ মাস পর দেশে ফিরল লেবাননে নিহত শুভ দাসের মরদেহ
আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে মহেশখালী থানাকে তদন্তের দায়িত্ব দেন। মামলাটির তদন্ত করেন উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মোজাহেরুল ইসলাম।
তিনি ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়ে ২৪ মে ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও মালামাল লুটের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করেন।
তবে ওই তদন্ত প্রতিবেদন ঘিরেই উঠেছে একাধিক প্রশ্ন।
আদালতে দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তদন্ত কর্মকর্তা বাদীর দেওয়া ৭ জন সাক্ষীর বক্তব্য নেন। আর কোনো সাক্ষীর বক্তব্য নেওয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, ৭ সাক্ষীর বক্তব্যেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য মিল।
প্রতিবেদনে এসআই মোজাহেরুল ইসলাম লিখেছেন, তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিদর্শন করেছেন এবং সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় তাদের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেছেন। পাশাপাশি বিবাদীদের নাম-ঠিকানা যাচাই এবং প্রকাশ্যে ও গোপনে তদন্তের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পথচারীকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ গেল যুবকের
জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা মোজাহেরুল ইসলাম বলেন, আদালতে দেওয়া অভিযোগের তদন্তের ক্ষেত্রে বাদীর দেওয়া সাক্ষীদের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। ২৪ মে কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি না, সেটিই তদন্তে দেখা হয়েছে এবং সাক্ষীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে।
তবে তদন্ত প্রতিবেদনে সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা ৩ নারী নুরুন্নাহার, মুন্নি আকতার ও মোতাহারা বেগমের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে ভিন্ন তথ্য।
তাদের প্রত্যেকেই জানিয়েছেন, ফাতেমা বেগমের বিরুদ্ধে করা মামলায় তারা কোনো সাক্ষ্য দেননি। এমনকি মামলার সাক্ষী তালিকায় তাদের নাম কীভাবে এসেছে, সেটিও তারা জানেন না। ২০২৫ সালের ২৪ মে কোনো ঘরবাড়ি ভাঙচুর বা লুটপাটের ঘটনা ঘটেনি বলেও জানান তারা।
তাদের দাবি, কাশেম হত্যার দিন ২৩ এপ্রিল উত্তেজিত এলাকাবাসী রাসেলের বাড়িঘর ভাঙচুর করেছিলেন। সেখানে কাশেমের পরিবারের কেউ জড়িত ছিলেন না।
রূপায়ণ গ্রুপের চেয়ারম্যানের মা ফরিদা বেগমের দাফন সম্পন্ন
এদিকে ঘটনাটি নিয়ে মিজানুর রহমান, আয়েশা বেগম, মমতাজ বেগমসহ একাধিক স্থানীয় বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয়।
তারাও দাবি করেন, ২৪ মে ঘরবাড়ি ভাঙচুরের কোনো ঘটনা ঘটেনি। ২৩ এপ্রিল কাশেম হত্যার পর এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হলে রাসেলের বাড়িঘর ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরে কাশেমের পরিবারকে চাপে রাখা এবং প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাদের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নুর জাহান বেগমের বাড়ির পাশে সংঘটিত একটি হত্যা মামলায় তার ছেলে মোহাম্মদ রাসেলকে “অন্যায়ভাবে” আসামি করা হয়েছে। রাসেল যে কাশেম হত্যা মামলার ৪ নম্বর আসামি, সেটি নথিপত্রে উল্লেখ থাকলেও তদন্ত প্রতিবেদনে নিহত ব্যক্তির নাম মুহাম্মদ কাশেম হিসেবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
এরই মধ্যে ওই মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন কাশেমের স্ত্রী ফাতেমা বেগম, শাশুড়ি রাশেদা বেগম এবং বেড়াতে আসা নাছিমা আকতার।
পুকুরে ডুবে একই পরিবারের দুই শিশুসহ ৩ জনের মৃত্যু
রাশেদা বেগম জানান, ৩১ আগস্ট রাতে মহেশখালী থানা পুলিশের একটি দল তাদের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকে, পুত্রবধূ ফাতেমা বেগম ও বেড়াতে আসা মেয়ে নাছিমা আকতারকে গ্রেপ্তার করে। তখনই তারা জানতে পারেন, তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। পরদিন ১ সেপ্টেম্বর তাদের আদালতে হাজির করা হলে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত রাশেদা বেগম ও নাছিমা আকতারকে জামিন দেন। তবে দেড় বছরের শিশুসহ ফাতেমা বেগমকে কারাগারে পাঠানো হয়।
রাশেদা বেগম বলেন, আমার ছেলেকে হত্যা করে আমাদের বিরুদ্ধেই উল্টো মিথ্যা মামলা করেছে। আমরা জানতেই পারিনি যে আমাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, পুলিশ তদন্ত করেছে এবং ওয়ারেন্ট হয়েছে। এখন আমার পুত্রবধূকে কারাগারে পাঠিয়ে আসামিরা আমাদের হুমকি দিচ্ছে।
ফাতেমার দুই মেয়ে রাজমিন আকতার চতুর্থ শ্রেণিতে এবং মিশকাত জান্নাত প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। মা কারাগারে যাওয়ার পর তারা কুতুবজোমের তাজিয়াকাটা সুমাইয়া (রা.) এতিমখানায় থাকছে।
স্বামীকে হারানোর পর ফাতেমা এখন দেড় বছরের শিশুসন্তানকে নিয়ে কারাগারে। অন্যদিকে তার দুই মেয়ে রয়েছে এতিমখানায়। মাকে কাছে না পেয়ে শিশু দুটি কান্নাকাটি করছে বলে জানান স্বজনরা।
অর্থাৎ, একটি হত্যাকাণ্ডের পর এক পরিবারের ওপর যেন নেমে এসেছে আরেক দফা বিপর্যয়।
সার না পেয়ে কৃষকদের বিক্ষোভ, গুদাম ভাঙচুর
কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মাহমুদুল হক বলেন, ২০২৫ সালের ২৪ মে কোনো ঘটনা ঘটেনি এবং ওইদিন কারও ঘরবাড়ি ভাঙচুরও করা হয়নি। কাশেমকে হত্যার পর তার পরিবারকে দুর্বল করতে তার স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে এই মামলা করা হয়েছে। সেই মামলায় দেড় বছরের শিশুসহ ফাতেমা এখন কারাগারে। আর বাড়িতে ছোট ছোট দুটি শিশু মাকে ছাড়া রয়েছে।
কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শেখ কামাল বলেন, কাশেম হত্যার পর এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হলে উত্তেজিত লোকজন তার পরিবারের বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করেন বলে তিনি জানতে পারেন।
তার ভাষ্য, নিহত কাশেম ও অভিযুক্ত রাসেল আত্মীয়। সামান্য টাকার বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে রাসেলসহ কয়েকজন কবির বাজার থেকে কাশেমকে তাড়া করে বাড়ির দরজার সামনে কুপিয়ে হত্যা করেন বলে তিনি জানান।
চেয়ারম্যান বলেন, কাশেম হত্যার পর তার পরিবার শোকের মধ্যে ছিল। তখন উত্তেজিত লোকজন তাদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই আসামিপক্ষ আদালতে মামলা করে। ওই মামলায় ১ সেপ্টেম্বর ৩ জনকে পুলিশ ওয়ারেন্টমূলে গ্রেপ্তার করে। ২ জন জামিন পেলেও দেড় বছরের শিশুসহ ফাতেমা বেগমকে আদালত কারাগারে পাঠান। ফাতেমা বেগমের জামিনের জন্য তিনি বিনা ফিতে আদালতে যাবেন বলেও জানান।
কর্মসূচির আগে গাংনী বিএনপি কার্যালয়ের পাশে বিস্ফোরণ
মামলার তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা প্রতুল কুমার শীল বলেন, থানার প্রতিটি মামলার তদন্ত তদারকির দায়িত্ব তার। তবে এই মামলার বিস্তারিত তার মনে নেই। বিষয়টি জেনে পরে জানাবেন।
তিনি আরও বলেন, সব সাক্ষীর জবানবন্দি যদি একই ধরনের হয়ে থাকে এবং বিষয়টি আদালতের দৃষ্টিগোচর হয়, তাহলে আদালত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে।
—জা. অর্থনীতি/এনজে