কক্সবাজার প্রতিনিধি: কক্সবাজারে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে সৈকতে মানুষের চাপ। কিন্তু পর্যটকদের সমুদ্রস্নানের নিরাপত্তায় সেই অনুপাতে বাড়েনি উদ্ধার ব্যবস্থার সক্ষমতা। লাইফগার্ডের সংখ্যা রয়ে গেছে ২৭ জনেই। এর মধ্যে গত তিন বছরে সমুদ্রে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা আগের ৯ বছরের মোট মৃত্যুর সমান।
সী-সেইফ লাইফগার্ডের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৯ বছরে লাইফগার্ড এলাকার বাইরে সমুদ্রে ডুবে মারা যান ৪০ জন। ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় তিন বছরেই মারা গেছেন আরও ৪০ জন। একই সময়ে বিপদে পড়া পর্যটকদের উদ্ধারের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অর্থাৎ পর্যটক বাড়ার সঙ্গে সমুদ্রে বিপদে পড়া মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। কিন্তু তাদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত লাইফগার্ডের সংখ্যা আগের মতোই ২৭ জন।
২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর কক্সবাজারে ট্রেন চলাচল শুরু হওয়ার পর পর্যটকের চাপ আরও বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। আগে মূলত সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে সৈকতে বেশি ভিড় হতো। এখন সপ্তাহের অন্যান্য দিনেও পর্যটকের উপস্থিতি থাকে। কক্সবাজার রেলের স্টেশনমাস্টার জয়নাল আবেদীন জানান, ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ট্রেনে কক্সবাজারে এসেছেন ৩ লাখ ২১ হাজার ৮১৩ জন। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ লাখ ৪ হাজার ৯২৮ জনে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ট্রেনে এসেছেন ৯ লাখ ৮৯ হাজার ৭২২ জন। এর বাইরে বাস ও বিমানযোগেও বিপুলসংখ্যক পর্যটক কক্সবাজারে আসছেন।
সী-সেইফ লাইফগার্ডের আঞ্চলিক পরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ট্রেন চালুর পর কক্সবাজারে পর্যটকের চাপ বেড়েছে। আগে ছুটির দিনে চাপ সামলাতে হতো, এখন সপ্তাহের অন্য দিনেও সৈকতে পর্যটক থাকেন। ফলে স্বল্পসংখ্যক লাইফগার্ডের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
সী-সেইফ লাইফগার্ডের ২০১৫ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তথ্য বলছে, ২০১৫ সালে সমুদ্রে ডুবে ১০ জনের মৃত্যু হয়, জীবিত উদ্ধার করা হয় ৯৫ জনকে। ২০১৬ সালে ছয়জনের মৃত্যু ও ৫৬ জন উদ্ধার, ২০১৭ সালে দুজনের মৃত্যু ও ২৮ জন উদ্ধার, ২০১৮ সালে দুজনের মৃত্যু ও ৪৩ জন উদ্ধার এবং ২০১৯ সালে তিনজনের মৃত্যু ও ৫৪ জন উদ্ধার করা হয়। ২০২০ সালে দুজনের মৃত্যু ও ৩৯ জন উদ্ধার, ২০২১ সালে তিনজনের মৃত্যু ও ৭০ জন উদ্ধার, ২০২২ সালে ছয়জনের মৃত্যু ও ১১৫ জন উদ্ধার এবং ২০২৩ সালে ছয়জনের মৃত্যু ও ৯৯ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।
এরপর মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০২৪ সালে ১৪৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও মারা যান ১২ জন। ২০২৫ সালে ২১০ জনকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনা হলেও মারা যান ২০ জন। মৃত্যু ও উদ্ধারের দুই দিক থেকেই বছরটি ছিল সর্বোচ্চ। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১২৫ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে, মৃত্যু হয়েছে ৮ জনের। সব মিলিয়ে ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৯ বছরে মৃত্যু হয় ৪০ জনের, উদ্ধার হন ৫৯৯ জন। আর ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় তিন বছরে মৃত্যু হয়েছে আরও ৪০ জনের, উদ্ধার করা হয়েছে ৪৭৮ জনকে। আগের ৯ বছরের সমান মৃত্যু ঘটেছে পরের প্রায় তিন বছরেই। একই সময়ে উদ্ধার হয়েছে আগের ৯ বছরের মোট উদ্ধারের প্রায় ৮০ শতাংশ।
পর্যটকের চাপের পাশাপাশি সমুদ্রসৈকতের ভৌগোলিক অবস্থার পরিবর্তনও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু শরীফ মাহবুব-ই-কিবরিয়া বলেন, সৈকতের বালুচরের নিচে প্লাস্টিক জমে মাটির গঠন দুর্বল হয়ে ‘লুজ সয়েল’ তৈরি হচ্ছে। একইসঙ্গে বালিয়াড়ির সাগরলতা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বালু ধরে রাখার প্রাকৃতিক সক্ষমতা কমেছে। এতে বিভিন্ন স্থানে বড় গর্ত ও রিপ কারেন্ট চ্যানেল তৈরি হচ্ছে। তার মতে, গত দুই থেকে তিন বছরে সুগন্ধা, লাবণী ও কলাতলী পয়েন্টে এমন পরিবর্তন বিশেষভাবে দেখা গেছে।
তিনি বলেন, এখন কক্সবাজারে নির্দিষ্ট পর্যটন মৌসুমের বিষয়টি অনেকটাই বদলে গেছে। ট্রেন চালুর পর প্রায় সারা বছরই পর্যটক থাকছেন। কিন্তু পর্যটক বাড়লেও পরিবেশ ও সৈকতের পরিবর্তনের সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে একইভাবে প্রস্তুত করা যাচ্ছে না। বর্জ্যপানি, সৈকতে ময়লা-আবর্জনা, বর্ষায় অতিবৃষ্টি এবং জোয়ার-ভাটার প্রভাবে বালু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরে যাওয়ায় সৈকতের বিভিন্ন অংশের আচরণও বদলে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
সিনিয়র লাইফগার্ড ভুট্টো জানান, লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টের প্রতিটিতে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ মিটার এলাকা লাইফগার্ডের আওতায় থাকে। এসব এলাকায় পতাকা দিয়ে নিরাপদ গোসলের জায়গা চিহ্নিত করা হয়। তিনটি পয়েন্ট মিলিয়ে প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকা লাইফগার্ডের আওতায় থাকলেও এর বাইরে থাকা সৈকতের বড় অংশে গোসল ঝুঁকিপূর্ণ। তার ভাষায়, অনেক পর্যটক নিরাপদ ও অনিরাপদ এলাকার পার্থক্য না জেনে সৈকতের যেকোনো জায়গায় নেমে পড়েন। অনেকে আবার লাইফগার্ডের নির্দেশনাও মানেন না।
সরেজমিন লাইফগার্ড এলাকার বাইরে গিয়ে দেখা যায়, অনেক জায়গায় পর্যটকদের চোখে পড়ার মতো বড় সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড বা নির্দেশনা নেই। ফলে সমুদ্রের পানিতে নামার ক্ষেত্রে পর্যটকরা অনেক সময় নিরাপদ এলাকা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পান না।
প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পর্যটকের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ২৭ জন লাইফগার্ড। তাদের তিনটি পয়েন্টে দুই শিফটে দায়িত্ব পালন করতে হয়। লাইফগার্ড কর্মী জয়নাল বলেন, তাদের উন্নত প্রযুক্তি ও দ্রুত ঘটনাস্থলে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত সরঞ্জাম নেই। অ্যাম্বুলেন্স বা দ্রুত উদ্ধারযান না থাকায় কোনো পর্যটক স্রোতে ভেসে গেলে দ্রুত সেখানে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। সী-সেইফ লাইফগার্ডের আঞ্চলিক পরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদও বলেন, পর্যটক বেড়েছে, কিন্তু লাইফগার্ড ও অন্যান্য নিরাপত্তাসেবা সেই অনুপাতে বাড়েনি। পাশাপাশি উন্নত উদ্ধার সরঞ্জামের ঘাটতিও রয়েছে।
সিনিয়র লাইফগার্ড ভুট্টোর মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে অনিরাপদ স্থানে গোসলে নামার কারণে। সমুদ্রের পরিবেশ না বুঝে বিপজ্জনক স্থানে নামা, লাইফগার্ডের নির্দেশনা না মানা এবং সন্ধ্যার পর গোসলে নামার প্রবণতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। বিচকর্মীদের সুপারভাইজার মাহবুব রহমান বলেন, সন্ধ্যার পর সমুদ্রে গোসলে নামা নিষেধ হলেও অনেকে তা মানেন না। গত ২৪ জুলাই সায়মন বিচের সামনে সন্ধ্যার পর গোসলে নেমে নিখোঁজ হন পর্যটক হেলাল শেখ। গত ১৮ সেপ্টেম্বর সুগন্ধার অদূরে গ্রিন নেচার রিসোর্টের সামনে সন্ধ্যা ৬টার পর সমুদ্রে নেমে ডুবে মারা যান কিশোরগঞ্জের কলেজছাত্র সীমান্ত। এর আগে ২০২৫ সালের ৭ জুলাই হিমছড়ি সৈকতে গোসলে নেমে স্রোতে ভেসে যান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থী অরিত্র হাসান, কে এম সাদমান রহমান ও আসিফ আহমেদ। তাদের মধ্যে দুজনের লাশ উদ্ধার হলেও অরিত্র এখনও নিখোঁজ।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, কক্সবাজারের পর্যটনশিল্প সমুদ্রসৈকতকে ঘিরে বিস্তৃত হলেও পর্যটকদের নিরাপত্তায় এখনও পূর্ণাঙ্গ সরকারি লাইফগার্ড ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। তার মতে, হাজার হাজার পর্যটকের নিরাপত্তার জন্য মাত্র ২৭ জন লাইফগার্ড যথেষ্ট নয়। আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী এবং সরকারি ব্যবস্থাপনায় পূর্ণাঙ্গ লাইফগার্ড ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশ রিজিয়নের পুলিশ সুপার মো. মারুফাত হোসাইন বলেন, আগের তুলনায় পর্যটক বেড়েছে। তাদের সতর্ক করতে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে এবং সৈকতে টহলও চলছে। তবে পর্যটকদের অসতর্কতায় অনিরাপদ স্থানে গোসলে নামার ঘটনাও ঘটছে।
সী-সেইফ লাইফগার্ডের হিসাবে, ২০১৫ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সৈকতে ৮০ জনের মৃত্যু হলেও জীবিত উদ্ধার হয়েছেন ১ হাজার ৭৭ জন। এ সময়ে হারিয়ে যাওয়া ১০৬ শিশুকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পর্যটকদের সচেতন করতে ৪৯ লাখ ৯ হাজার ৬৫৫ জনকে সচেতন করা হয়েছে এবং ১০৪ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধার তৎপরতার প্রয়োজনও বেড়েছে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, আগের ৯ বছরে যত মানুষ সমুদ্রে ডুবে মারা গেছেন, পরের প্রায় তিন বছরেই মারা গেছেন সমানসংখ্যক মানুষ। ফলে কক্সবাজারের পর্যটন যত বিস্তৃত হচ্ছে, সমুদ্রসৈকতের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও তত দ্রুত সক্ষম করে তোলার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসছে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান বলেন, লাইফগার্ড কর্মীরা পর্যটকদের সেবায় কাজ করছেন। তাদের জনবল বাড়ানোর জন্য পর্যটন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।