Print Date & Time : 08 November 2026 Sunday 04:26 pm

শহরের বর্জ্য কি ঠাঁই পাবে হাওরের বুকে?

image

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: শহর পরিষ্কার রাখতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জরুরি। তবে সেই বর্জ্যের জায়গা কি হাওরের বুকেই হবে- এমন প্রশ্ন উঠেছে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে। হাইল হাওরের কোলঘেঁষা এলাকায় পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের জন্য স্থান নির্বাচনের প্রস্তাবের খবরে প্রতিবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষক, মৎস্যজীবী ও সাধারণ মানুষ। তাদের আশঙ্কা, সেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা হলে হাওড়ের পরিবেশ, কৃষিজমি ও জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়তে পারে।

শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভুনবীর ও আশিদ্রোন ইউনিয়নের অলিপুর ও মতিগঞ্জ মৌজায় হাইল হাওড়সংলগ্ন এলাকায় সম্ভাব্য স্থানটি নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, শহর পরিষ্কার রাখার প্রয়োজন রয়েছে, তবে হাওড়কে ময়লার ভাগাড় বানিয়ে নয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রস্তাবিত স্থানটির মাত্র দেড়শ ফুটের মধ্যে রয়েছে মাদ্রাসা, এতিমখানা, মসজিদ ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আশপাশে রয়েছে কয়েক হাজার মানুষের বসতি এবং শত শত বিঘা উর্বর তিন ফসলি জমি। উন্মুক্তভাবে বর্জ্য ফেলা হলে দুর্গন্ধ ও মাছির উপদ্রবে জনজীবন অতিষ্ঠ হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার পরিবেশও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

একজন ক্ষুব্ধ কৃষক বলেন, “এখানে যাতে ময়লা না ফেলা হয়। চা-বাগানের কোনো জায়গায় ফেলা হোক। এখানে ময়লা ফেলা হলে আমরা কৃষিকাজ করব কীভাবে? দুর্গন্ধে ফসলি জমিতে কাজ করা কঠিন হয়ে যাবে। হাওড় রক্ষা না করলে দেশও রক্ষা হবে না।”

এলাকাবাসীর সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হাইল হাওড়কে ঘিরে। এই হাওরের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে দেশের অন্যতম মৎস্য অভয়াশ্রম বাইক্কা বিল, শাপলা বিলসহ প্রায় ৩০টি ইজারাকৃত সরকারি জলমহাল। হাওড়ের ওপর নির্ভরশীল শত শত জেলে পরিবার।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, বর্ষায় বর্জ্যের দূষিত পানি ও লিচেট হাওড়ে গিয়ে পড়লে পানিদূষণ ঘটতে পারে। এতে বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি মাছের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে হাইল হাওড়ের পরিবেশগত ভারসাম্যও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

তবে প্রশাসন বলছে, প্রস্তাবিত স্থানে উন্মুক্তভাবে বর্জ্য ফেলার পরিকল্পনা নেই। শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আলাউদ্দিন বলেন, “এটি এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নয়। প্রস্তাবিত স্থানে উন্মুক্ত ময়লা না ফেলে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ট্রিটমেন্ট প্লান্টের মাধ্যমে বর্জ্য থেকে জৈব সার উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। তাই পরিবেশের বড় ক্ষতির আশঙ্কা কম।”

শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মো. জিয়াউর রহমান বলেন, “সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী খাসজমি সন্ধান করা হয়েছে। পরবর্তীতে পরিবেশগত সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রকৌশলী ও প্রতিনিধি দল আসবেন। সম্পূর্ণ পরিবেশসম্মত উপায়ে আধুনিক ট্রিটমেন্ট প্লান্ট করা হবে, যাতে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকে।”

তিনি আরও বলেন, “উন্মুক্ত ডাম্পিং নয়, বরং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবেই এই প্রকল্প ভাবা হচ্ছে।”

তবে প্রশাসনের আশ্বাসেও পুরোপুরি আশ্বস্ত নন হাওড়পাড়ের মানুষ। তাদের দাবি, হাওর থেকে দূরে জনবসতিহীন কোনো পরিত্যক্ত টিলা কিংবা চা-বাগানের অনুর্বর জমিতে ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন করা হোক। শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি হাইল হাওড়ের পরিবেশ, কৃষি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও কার্যকর পরিকল্পনা চান তারা।  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি