Print Date & Time : 25 October 2026 Sunday 09:13 am

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, কৃষিতে বিরূপ প্রভাবের শঙ্কা

image

রিয়াদ হোসেন: বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এ দেশের শতকরা প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ এখনও কোনো না কোনোভাবে কৃষির ওপর নির্ভর করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে। বিশেষ করে কৃষি গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ও মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে গ্রামীণ জনপদে ব্যবসা বা ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশ ঘটছে তবুও খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্য হ্রাস এবং সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতায় কৃষি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সার সংকট, কৃষি উপকরণের ব্যয় বৃদ্ধিসহ নানা প্রতিকূলতায় কৃষিতে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে আবার আরেক দফায় বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। চলতি বছরে তিন ধাপে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে কৃষি খাত গভীর সংকট ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে পড়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন খাতের মালিক-শ্রমিকরা সরকারের সঙ্গে বসে আলাপ-আলোচনা করে গাড়িভাড়া বৃদ্ধি করেছে। এতে জ্বালানির মূল্য বাড়ায় যে অতিরিক্ত চাপ তা পুরোপুরি যাত্রীদের ঘাড়ে এসে পড়তে মোটেও সময় লাগেনি। কিন্তু সাধারণত দেখা যায়, পরিবহন খাতের পর সবচেয়ে বেশি ডিজেল ব্যবহৃত হয় আমাদের কৃষি খাতে। সেখানে কৃষকরা সদ্য বাড়া জ্বালানির বাড়তি খরচের বোঝা কোনো ক্রেতা বা ভোক্তার ঘাড়ে চাপাতে পারছে না।

কৃষি খাতে সবচেয়ে বেশি ডিজেল ব্যবহৃত হয় সেচের কাজে। আমাদের দেশে ধান উৎপাদন করতে যে পরিমাণ সেচের প্রয়োজন হয় তার প্রায় ৭৫ শতাংশ ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া অন্যান্য ফসল উৎপাদনেও ব্যাপক পরিমাণে পানির প্রয়োজন হয়; যা কৃষকরা ডিজেল চালিত ইঞ্জিন দিয়ে চাহিদা মিটিয়ে থাকে। কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, প্রতি বিঘা জমিতে সেচ ও চাষের জন্য প্রায় ২০ লিটারের মতো ডিজেলের প্রয়োজন হয়। এ বছরই শুধু কয়েক ধাপে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি করে আকাশচুম্বী করে তোলা হয়েছে। ফসলের দামও কি কৃষক কয়েক ধাপে বৃদ্ধি করতে পারবে? সাধারণত কৃষকের উৎপাদিত কৃষিপণ্যের বাজারমূল্য নির্ধারণে তাদের কোনো হাত থাকে না। ফলে তারা চাইলেও এসব পণ্যের দাম বাড়াতে পারে না। দীর্ঘ একটি সময় ধরে মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এজন্য সরকারের উচিত সবকিছুর আগে এ দেশের কৃষকের স্বার্থের দিকে নজর দেওয়া, যাতে কৃষকরা উৎপাদিত পণ্য ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে পারে— তার যথাযথ পরিবেশ নিশ্চিত করা। 

ফসল উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে বাড়তি এই অতিরিক্ত চাপ কৃষককে দিনে দিনে দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলছে। ডিজেলের এবং কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধি একটা পর্যায়ে গিয়ে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলে দেবে। আর বিশেষ করে যেসব কৃষকের নিজস্ব জমিজমা নেই, যারা বর্গা করে কৃষিকাজ পরিচালনা করে থাকে তারাই সবচেয়ে সংকটের মধ্যে পতিত হচ্ছে। এই সংখ্যাও আমাদের দেশে নেহাত কম নয়। একটি সময় বাধ্য হয়ে তারা যদি চাষাবাদ কমিয়ে দেয় বা জমি অনাবাদি রাখে তাহলে একদিকে যেমন আমাদের দেশীয় শস্য উৎপাদন কমে যাবে অন্যদিকে আমদানি নির্ভরতা কয়েকগুণে বৃদ্ধি পাবে। তাই সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত, কৃষকের উন্নয়নে এবং কৃষিকে বাঁচাতে জরুরি সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এ ক্ষেত্রে কৃষকের সেচ প্রকল্প স্বাভাবিক রাখতে পরিবেশবান্ধব সৌর সেচ পাম্পের সংখ্যা বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া জরুরি। যাতে বিদ্যুৎ এবং ডিজেলের বাইরে গিয়ে কৃষক জমিতে পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে। মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলতে হবে। যাতে কৃষক তার পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায়। এর পাশাপাশি ভর্তুকি মূল্যে ডিজেল সরবরাহের লক্ষ্যে উদ্যোগ নিতে হবে। প্রান্তিক পর্যায়ে যাতে ডিজেলের সংকট তৈরি না হয় সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। সরকারের বিশেষ প্রকল্পের আওতায় কৃষি ডিজেল-কার্ড করা যায় কিনা সেটা বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। কৃষি ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কৃষকরা যেন সহজ শর্তে কৃষিঋণ পান সেদিকে খেয়াল করা। প্রতিবছর সরকারিভাবে যেসব সার, বীজ কিংবা কৃষি সুযোগ-সুবিধা আসে সেগুলো যেন প্রকৃত কৃষকরা পায় তার জন্য মাঠ পর্যায়ে মনিটরিং বাড়াতে হবে। আশা রাখি, সরকার কৃষি খাত বাঁচাতে অন্ততপক্ষে ডিজেলের সদ্য বর্ধিত মূল্য পুনর্বিবেচনা করবে, কৃষি উপকরণ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। 

রিয়াদ হোসেন, শিক্ষার্থী, সরকারি বিএল কলেজ, খুলনা