Print Date & Time : 21 October 2026 Wednesday 08:26 pm

আগামীর ব্যবসার জায়গা কেবল মহাকাশ, কীভাবে হবে?

image

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: মহাকাশ কি একদিন পৃথিবীর সমুদ্র বা আকাশের মতোই একটি বড় অর্থনৈতিক বাজার হয়ে উঠবে? রকেট উৎক্ষেপণ থেকে স্যাটেলাইট, যোগাযোগ আর মহাকাশে উৎপাদন ইতিমধ্যে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ব্যবসা। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে আছে স্পেসএক্সের মতো বেসরকারি মহাকাশ কোম্পানি। প্রশ্ন হলো, স্পেসএক্স কি শুধু রকেট উৎক্ষেপণের খরচ কমাচ্ছে, নাকি খুলে দিচ্ছে পুরো মহাকাশ অর্থনীতির নতুন দরজা?

একসময় মহাকাশে যাওয়া ছিল মূলত রাষ্ট্রীয় শক্তির প্রদর্শন। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া কিংবা চীনের মতো রাষ্ট্রের বিশাল বাজেট ছাড়া মহাকাশ অভিযান কল্পনা করাই কঠিন ছিল। কিন্তু এখন সেই ছবিটা দ্রুত বদলাচ্ছে। বেসরকারি কোম্পানিগুলো মহাকাশকে গবেষণার জায়গা থেকে বাণিজ্যিক অবকাঠামোয় পরিণত করার চেষ্টা করছে। আর এই পরিবর্তনের অন্যতম বড় নাম স্পেসএক্স।

স্পেসএক্সের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলোর একটি হলো পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট। ফ্যালকন-৯ এর প্রথম ধাপ পৃথিবীতে ফিরে এসে আবার উড়তে পারে। কোম্পানির দাবি, এই পুনর্ব্যবহারযোগ্যতা মহাকাশে যাওয়ার খরচ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

এর অর্থনৈতিক প্রভাব বেশ বড়। কারণ রকেট যদি একবার ব্যবহার করেই ফেলে দিতে হয়, প্রতিটি উৎক্ষেপণের খরচ অনেক বেশি হয়। কিন্তু একই হার্ডওয়্যার বারবার ব্যবহার করা গেলে মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠানোর ব্যবসা আরও সহজলভ্য হতে পারে।

এর পরের ধাপ স্যাটেলাইট। স্পেসএক্সের স্টারলিংক ইতিমধ্যে হাজার হাজার স্যাটেলাইট ব্যবহার করে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ইন্টারনেট সেবা দিচ্ছে। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত কোম্পানির নথি অনুযায়ী, কক্ষপথে তাদের ৯ হাজার ৬০০টির বেশি ব্রডব্যান্ড ও মোবাইল স্যাটেলাইট ছিল।

অর্থাৎ স্পেসএক্সের ব্যবসা শুধু ‘রকেট বিক্রি’ নয়। রকেট দিয়ে স্যাটেলাইট কক্ষপথে পাঠানো, সেই স্যাটেলাইট দিয়ে ইন্টারনেট ও যোগাযোগ সেবা দেওয়া পুরো ব্যবস্থাটাকেই একটি সমন্বিত ব্যবসায়িক কাঠামোয় নিয়ে আসছে কোম্পানিটি।

এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা হলো রাইডশেয়ার। একটি রকেটে বড় একটি স্যাটেলাইটের পাশাপাশি ছোট ছোট স্যাটেলাইটও কক্ষপথে পাঠানো যায়। ফলে ছোট কোম্পানি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিংবা স্টার্টআপের জন্য মহাকাশে যাওয়ার প্রবেশমূল্য কমতে পারে। স্পেসএক্স নিজস্ব রাইডশেয়ার কর্মসূচির মাধ্যমে এই ধরনের উৎক্ষেপণ সেবা দিচ্ছে।

তাহলে ভবিষ্যতের বাজার কোথায়?

স্যাটেলাইট যোগাযোগের পাশাপাশি পৃথিবী পর্যবেক্ষণ, নেভিগেশন, আবহাওয়া তথ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন তথ্যভিত্তিক সেবা আরও বড় হতে পারে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বৈশ্বিক মহাকাশ অর্থনীতি ২০২৩ সালের প্রায় ৬৩০ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০৩৫ সালে ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

আর ভবিষ্যতের আরও বড় সম্ভাবনা হতে পারে মহাকাশে উৎপাদন। মাইক্রোগ্র্যাভিটি পরিবেশে এমন কিছু উপাদান বা পণ্য তৈরি করা সম্ভব কি না, যা পৃথিবীতে তৈরি করা কঠিন বা ব্যয়বহুল এ নিয়ে গবেষণা চলছে। পাশাপাশি কক্ষপথে ডেটা সেন্টার, উন্নত স্যাটেলাইট এবং মহাকাশভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামোর ধারণাও সামনে আসছে। স্পেসএক্স ইতিমধ্যে কক্ষপথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-ভিত্তিক স্যাটেলাইট তৈরির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।
তবে এই বাজারের ঝুঁকিও আছে। মহাকাশে অতিরিক্ত স্যাটেলাইট, ধ্বংসাবশেষ, কক্ষপথের নিরাপত্তা এবং কয়েকটি বড় কোম্পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে সমস্যা তৈরি করতে পারে।

তাই স্পেসএক্স একা মহাকাশ অর্থনীতি তৈরি করবে এমনটা বলা ঠিক হবে না। তবে তারা যে পরিবর্তনের গতি বাড়াচ্ছে, সেটি স্পষ্ট।

হয়তো ভবিষ্যতে মহাকাশে যাওয়াই হবে না সবচেয়ে বড় ব্যবসা। সবচেয়ে বড় ব্যবসা হবে মহাকাশে তৈরি অবকাঠামো ব্যবহার করে পৃথিবীতে সেবা বিক্রি করা।

অর্থাৎ মহাকাশ হয়তো আর শুধু বিজ্ঞানীদের জায়গা থাকবে না। ধীরে ধীরে হয়ে উঠতে পারে পৃথিবীর অর্থনীতির নতুন একটি স্তর।

মহাকাশে নতুন বাজার তৈরি করছে স্পেসএক্স

মহাকাশে ব্যবসা মানেই শুধু রকেট উৎক্ষেপণ নয়। স্পেসএক্স পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেটের মাধ্যমে উৎক্ষেপণ খরচ কমানোর চেষ্টা করছে, আর স্টারলিংকের মাধ্যমে হাজার হাজার স্যাটেলাইটকে একটি বড় যোগাযোগ নেটওয়ার্কে পরিণত করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ছোট স্যাটেলাইটের রাইডশেয়ার উৎক্ষেপণ। ভবিষ্যতে পৃথিবী পর্যবেক্ষণ, যোগাযোগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মহাকাশভিত্তিক উৎপাদনও বড় বাজার তৈরি করতে পারে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের হিসাবে, ২০৩৫ সালে বৈশ্বিক মহাকাশ অর্থনীতি ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

ভাবুন, ভবিষ্যতে মহাকাশে শুধু মানুষ নয়, কারখানাও থাকবে। কক্ষপথে এমন পণ্য তৈরি হতে পারে, যেগুলো পৃথিবীতে তৈরি করা কঠিন। তার সঙ্গে থাকবে স্যাটেলাইট যোগাযোগ, পৃথিবী পর্যবেক্ষণ এবং মহাকাশভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। স্পেসএক্স ইতিমধ্যে কক্ষপথে এআই স্যাটেলাইট তৈরির পরিকল্পনা করছে। তবে বড় প্রশ্ন হলো, মহাকাশে ব্যবসা যত বাড়বে, স্যাটেলাইটের ভিড় ও মহাকাশের আবর্জনা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। অর্থাৎ নতুন বাজারের সঙ্গে নতুন নিয়মও দরকার হবে।  

 

—জা. অর্থনীতি/এলএটি