জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত শোধনাগার! কিন্তু বর্জ্য আনার পাইপলাইনই নেই! ফলে পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার করা যাচ্ছে না দাশেরকান্দি পয়োবর্জ্য শোধনাগার। এবার সেই পাইপলাইন নির্মাণে নতুন করে ১ হাজার ৪৪ কোটি ৯২ লাখ টাকার প্রকল্প প্রস্তাব করেছে ঢাকা ওয়াসা। পাইপলাইন নেই ৭৫% এলাকায় হাজার কোটি টাকা চায় ওয়াসা ।
২০২৩ সালে চালু হওয়া দাশেরকান্দি পয়োবর্জ্য শোধনাগারের দৈনিক পরিশোধন সক্ষমতা ৬০ কোটি লিটার। তবে প্রয়োজনীয় পয়োনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক না থাকায় শুষ্ক মৌসুমে পরিশোধন হচ্ছে ২৮ কোটি লিটার। তাই পয়োবর্জ্য সরবরাহে পাইপলাইন নির্মাণের জন্য নতুন প্রকল্প প্রস্তাব করেছে ঢাকা ওয়াসা।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় গুলশান, বনানী, বারিধারা, মহাখালী ও বাড্ডার আংশিক এলাকায় পয়োনিষ্কাশন লাইন নির্মাণ করা হবে। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য। এতে প্রায় ৯ লাখ মানুষ সরাসরি সেবার আওতায় আসবে।
প্রকল্পের মোট ব্যয় ১ হাজার ৪৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকার দেবে ১ হাজার ৩৪ কোটি ৯২ লাখ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থা দেবে ১০ কোটি টাকা। প্রকল্পটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
পয়োবর্জ্য লাইন ও পয়োলিফটিং স্টেশনের নকশা, সরবরাহ, নির্মাণ ও চালুকরণে দুটি প্যাকেজে ৯৪৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রথম প্যাকেজে ৫৩৪ কোটি ৯১ লাখ এবং দ্বিতীয় প্যাকেজে ৪১০ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। পাশাপাশি সরঞ্জাম, ভূমি উন্নয়ন, পরামর্শক সেবা, কম্পিউটার, মোটরসাইকেল ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র কেনার জন্যও অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, পূর্ণ সক্ষমতায় শোধনাগার চালাতে পয়োবর্জ্য সংগ্রহের লাইন নির্মাণ জরুরি।
দাশেরকান্দি প্রকল্পের মোট ব্যয় ৩ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। এর মধ্যে চীনের এক্সিম ব্যাংকের ঋণ ২ হাজার ৩৬৬ কোটি এবং সরকারি অর্থায়ন ১ হাজার ১০৬ কোটি টাকা। ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৩৭০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। ২০২৭ সাল থেকে ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরুর কথা।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরি জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, অতীতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও পানি নিষ্কাশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ও সুফল নিশ্চিত করা যায়নি। তিনি বলেন, ‘অতীতে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে আগামী পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জন ব্যাহত হতে পারে।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবিরের অভিযোগ, ঢাকার ১০টি পয়োনিষ্কাশন জোনের জন্য সমন্বিত পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। হাতিরঝিল ও আশপাশের ক্যাচমেন্ট এলাকার পাশাপাশি ধানমন্ডি, মিরপুর ও রায়েরবাজারের শোধনাগার পরিকল্পনা বিবেচনায় নিয়ে সামগ্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। জনগণকে সম্পৃক্ত না করে খণ্ডিত পরিকল্পনায় ব্যয়বহুল প্রকল্প নেওয়ায় তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ঢাকা ওয়াসার সাতটি চলমান প্রকল্পের ব্যয় ৪৩ হাজার ৮৭৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে ঢাকা এনভায়রনমেন্টালি সাসটেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই, ঢাকা ওয়াটার সাপ্লাই নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট ও সায়েদাবাদ পানিশোধনাগার ফেজ-৩ প্রকল্প এক দশকের বেশি সময় ধরে চলছে। গত পাঁচ বছরে নেওয়া চারটি প্রকল্পের অগ্রগতি ৩০ শতাংশের নিচে।
একদিকে হাজার হাজার কোটি টাকার শোধনাগার, অন্যদিকে পাইপলাইনের অভাবে পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার করা যাচ্ছে না। নতুন করে আরও ১ হাজার ৪৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব। এখন প্রশ্ন-সমন্বিত পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও যথাযথ তদারকি নিশ্চিত না হলে ঢাকার পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে এই বিপুল বিনিয়োগের সুফল মিলবে কতটা?
—জা. অর্থনীতি/এলএটি