জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক:
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ কি থমকে গেছে? বছরের পর বছর নানা উদ্যোগ, বিনিয়োগ সম্মেলন আর ওয়ান স্টপ সার্ভিসের প্রতিশ্রুতি-তারপরও কেন বিদেশি পুঁজি ঘুরপাক খাচ্ছে দেড় বিলিয়ন ডলারের আশপাশে? সর্বশেষ হিসাবে, এক অর্থবছরেই নিট বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ১২ দশমিক ৪৩ শতাংশ! কিন্তু কেন এই পরিস্থিতি? চলুন জেনে নেওয়া যাক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই এসেছে প্রায় ১৪৮ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ১৬৯ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরে কমেছে প্রায় ২১ কোটি ডলার।
গত ছয় বছরের পরিসংখ্যানেও বড় পরিবর্তন নেই। ২০২০-২১ অর্থবছরে বিনিয়োগ এসেছিল ১৩৩ কোটি ডলার, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৭১ কোটি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৬৫ কোটি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৪১ কোটি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৬৯ কোটি ডলার। অর্থাৎ দুই বিলিয়ন ডলারের সীমাও পেরোতে পারছে না বাংলাদেশ।
শুধু বার্ষিক হিসাব নয়, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকেও কমেছে বিনিয়োগ। এপ্রিল থেকে জুনে নিট এফডিআই এসেছে ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ ডলার, যা জানুয়ারি-মার্চের তুলনায় ২২ দশমিক ৪৪ শতাংশ কম। তবে ২০২৫ সালের একই প্রান্তিকের তুলনায় এবার বিনিয়োগ বেড়েছে ১২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
বিনিয়োগের তিনটি প্রধান উপাদান-ইক্যুইটি মূলধন, পুনর্বিনিয়োগকৃত আয় ও আন্তঃকোম্পানি ঋণ-সব ক্ষেত্রেই প্রান্তিকভিত্তিক নিট প্রবাহ কমেছে। আন্তঃকোম্পানি ঋণ কমেছে ৬৭ দশমিক ০৪ শতাংশ, পুনর্বিনিয়োগ কমেছে ২৩ দশমিক ৯২ শতাংশ এবং ইক্যুইটি মূলধন কমেছে ১ দশমিক ০৭ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদ ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরীর মতে, অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ কম থাকা এবং রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক পরিবেশের অস্থিতিশীলতা বিদেশি বিনিয়োগে বড় বাধা। অন্যদিকে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন নীতিগত অনিশ্চয়তা, জ্বালানির সংকট ও উচ্চব্যয়, দুর্বল অবকাঠামো, প্রশাসনিক জটিলতা এবং দুর্বল ব্যাংকিং খাতকে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বিনিয়োগ বোর্ড থেকে বিডা, পরে ইনভেস্ট বাংলাদেশ গঠন এবং ওয়ান স্টপ সার্ভিসের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রত্যাশিত সুফল মিলছে না।
কোন দেশ থেকে আসছে বিনিয়োগ? দেশভিত্তিক হিসাবে দেখলে শীর্ষে আছে সিঙ্গাপুর ২৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলার। এরপর চীন ২০ কোটি ৭৪ লাখ এবং দক্ষিণ কোরিয়া ১৯ কোটি ১৯ লাখ ডলার। খাতভিত্তিক হিসাবে বিদ্যুতে এসেছে ৪১ কোটি ৩৮ লাখ, বস্ত্র ও তৈরি পোশাকে ৩১ কোটি ২৯ লাখ এবং ব্যাংকিং খাতে ১৫ কোটি ৬৪ লাখ ডলার।
জুন শেষে দেশে মোট এফডিআই স্টক দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১৪২ কোটি ডলার। দেশভিত্তিক হিসাবে শীর্ষে যুক্তরাজ্য, ৩২৪ কোটি ১৭ লাখ ডলার। এরপর চীন ও সিঙ্গাপুর। খাতভিত্তিক হিসাবে শীর্ষে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক, ৪৬৮ কোটি ২০ লাখ ডলার। এরপর বিদ্যুৎ ও ব্যাংকিং খাত।
এফডিআই কমলে কর্মসংস্থান, রপ্তানি সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থানান্তরের সুযোগ সীমিত হতে পারে। তাই বিনিয়োগের ঘোষণা নয়, বাস্তবে প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ বাড়ানোই হবে সাফল্যের আসল মাপকাঠি।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি