Print Date & Time : 21 October 2026 Wednesday 12:16 am

নারীর কর্মসংস্থান ও আয় সহায়তায় সুফলের সম্ভাবনা

image

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: নিম্ন আয়ের পরিবারকে লক্ষ্যভিত্তিক আয়সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে সংস্কার করা হলে বাংলাদেশের পারিবারিক ভোগব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত এশিয়ার অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে যেসব দেশের, বাংলাদেশ তার একটি।

আইএমএফের ২০২৬ সালের অক্টোবরের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারতে আয়ের অনিশ্চয়তা বেশি। একই সঙ্গে দেশ দুটিতে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তাই আয়সহায়তা ও শ্রমবাজার সংস্কার একসঙ্গে করা হলে সম্ভাব্য সুফল বিশেষভাবে বেশি হতে পারে।

এসব সংস্কার পরিবারগুলোকে আকস্মিক আয়হানি থেকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি শ্রমের জোগান ও পারিবারিক আয় বাড়াতে পারে। এতে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় সঞ্চয় করে রাখার প্রয়োজন কমবে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো বেশি ব্যয় করতে পারবে।
তবে এই ফলাফল মডেলভিত্তিক বিশ্লেষণ থেকে পাওয়া। এটি বাস্তবে অর্জিত ফলাফল বা বাংলাদেশের জন্য ঘোষিত সংস্কার কর্মসূচি নয়। বাংলাদেশের আর্থিক, সরকারি অর্থায়ন ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে বাড়তি সঞ্চয় প্রত্যাশিত মাত্রায় বিনিয়োগ ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে কাজে না-ও লাগতে পারে বলেও সতর্ক করেছে আইএমএফ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘যেসব দেশে আয়ের অনিশ্চয়তা বেশি এবং শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ বেশি, সেসব দেশেই সুফল সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতে।’

আইএমএফের মতে, বিনিয়োগ ও রপ্তানির ওপর চাপ বাড়তে থাকায় প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোকে অভ্যন্তরীণ চাহিদা জোরদার করতে হবে। বিনিয়োগের সুফল কমে আসা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির গতি শ্লথ হওয়া এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে বিভাজন এই অঞ্চলের প্রবৃদ্ধির প্রচলিত চালিকা শক্তিগুলোকে চাপে ফেলছে।

অথচ আয় বাড়লেও পারিবারিক ভোগব্যয় তুলনামূলকভাবে কম বেড়েছে। বাংলাদেশ, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামে বেসরকারি ভোগব্যয় উৎপাদনের চেয়ে ধীরগতিতে বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পারিবারিক ব্যয় বাড়লে অর্থনীতিগুলো বাইরের ধাক্কা ভালোভাবে সামাল দিতে পারবে। বিশেষ করে রপ্তানির চাহিদা বা বিনিয়োগ দুর্বল হলে তা সহায়ক হবে। এ জন্য আয়হানি ও অবসরজীবনের প্রয়োজন নিয়ে পরিবারের অনিশ্চয়তা কমাতে হবে।

আয়ের সুরক্ষা ও নারীর অংশগ্রহণ
আইএমএফের দ্বিতীয় সংস্কার পরিস্থিতিতে এমন পরিবারগুলোর জন্য শর্তসাপেক্ষ নগদ সহায়তা ধরা হয়েছে, যারা আয় কমে গেলে ভোগব্যয় আগের পর্যায়ে ধরে রাখতে হিমশিম খায়। মডেলে সামগ্রিক আয়বণ্টনের ১৫তম পারসেন্টাইলের নিচে কোনো পরিবারের আয় নেমে গেলে অতিরিক্ত সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ আয় বণ্টনের নিচের দিকের ১৫ শতাংশের সীমারেখায় সহায়তা পাওয়ার আয়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। কর্মসূচির ব্যয় ধরা হয়েছে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশের সমান।

এর পাশাপাশি শ্রমশক্তিতে নারী ও পুরুষের অংশগ্রহণের ব্যবধান অর্ধেক কমানোর সংস্কার ধরা হয়েছে। ন্যূনতম আয়ের নিশ্চয়তা অনিশ্চয়তা ও সতর্কতামূলক সঞ্চয়ের প্রয়োজন কমাবে। নারীর অংশগ্রহণ বাড়লে শ্রমের জোগান ও পারিবারিক আয় বাড়বে।

সমন্বিত সংস্কারে আইএমএফের হিসাবে, সংস্কার না হলে উৎপাদন যে পর্যায়ে থাকত, তার তুলনায় উৎপাদন গড়ে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি হতে পারে। এটি বাংলাদেশের আলাদা হিসাব বা বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার নয়।

সহায়তা নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে দেওয়া হবে বলে ভোগব্যয় বৃদ্ধির সুফল বেশি হতে পারে। এসব পরিবার বাড়তি আয়ের তুলনামূলক বড় অংশ ব্যয় করে। মডেলে সব আয়স্তরের পরিবার সুফল পেলেও দরিদ্র পরিবারগুলোর ভোগব্যয় ও জীবনমানের উন্নতি বেশি হয়।

নগদ সহায়তায় নিম্ন আয়ের পরিবারের অনুকূলে সম্পদ পুনর্বণ্টন হয় এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সুরক্ষা বাড়ে। নারীর অংশগ্রহণ বাড়লে বিভিন্ন আয়স্তরের পরিবারের শ্রম থেকে অর্জিত আয়ও বাড়ে।

অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে ঝুঁকি
বাংলাদেশে অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের উচ্চহার বিশ্লেষণটির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ। চীন ও থাইল্যান্ডের মতো দেশে অবসরজীবনে পর্যাপ্ত আয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যদিকে বাংলাদেশ ও ভারতে পরিবারগুলোকে আকস্মিক আয়হানির ধাক্কা থেকে সুরক্ষা দিতে হবে।

অনানুষ্ঠানিক কাজে সাধারণত চাকরির নিরাপত্তা কম থাকে। স্বাস্থ্যবিমা ও পেনশনের মতো সুবিধাও থাকে না। ফলে বেকারত্ব, সাময়িক আয়হানি বা চিকিৎসাব্যয়ে শ্রমজীবীরা আর্থিক চাপে পড়তে পারেন। পর্যাপ্ত সুরক্ষা না থাকলে ভবিষ্যতের বিপদ সামলাতে সঞ্চয়ের প্রবণতা বাড়ে, যা বর্তমান ভোগব্যয় সীমিত করতে পারে।

কঠিন সময়ে ঋণ পাওয়ার সুযোগ ব্যয় ধরে রাখতে সহায়ক। তবে আনুষ্ঠানিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হিসাব থাকলেই সাশ্রয়ী সুদে ঋণ পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। জামানত বা যাচাইযোগ্য আয়ের তথ্য না থাকলে ঋণ পেতে সমস্যা কিংবা বেশি ব্যয় হতে পারে।

অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন
মডেলে বাড়তি সরকারি ব্যয়ের অর্ধেক শ্রম আয়ের ওপর কর বাড়িয়ে এবং বাকি অর্ধেক সরকারের বিবেচনাধীন ব্যয় কমিয়ে মেটানোর কথা ধরা হয়েছে।

আইএমএফের মতে, মডেলে সমন্বিত সংস্কার সরকারি অর্থব্যবস্থার টেকসই সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে না। কারণ সুদের হার ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারের ব্যবধানের ওপর এর প্রভাব সামান্য। ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ ও দক্ষতা বাড়িয়েও অর্থায়নে সহায়তা করা যেতে পারে।

তবে সংস্কারের পরিসর, সময়, অর্থায়ন ও নকশা দেশের পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে। মধ্যমেয়াদি রাজস্ব ও ব্যয় কাঠামোর আওতায় ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ।

সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি কাজের প্রণোদনা বজায় রাখতে হবে। যথাযথ সুবিধাভোগী নির্বাচন, ডিজিটাল অর্থ প্রদান ও সুচিন্তিত সহায়তার কাঠামো অনানুষ্ঠানিক শ্রমজীবীদের কাছে পৌঁছাতে সহায়ক হবে। সামাজিক সহায়তার মাধ্যমে আয়ের তথ্য সংগ্রহ ও শ্রমিক নিবন্ধনও শুরু করা যেতে পারে।

বিনিয়োগের বাধা
মডেলে বিনিয়োগের সম্ভাব্য বাধা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। বাংলাদেশকে উদাহরণ দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আর্থিক, সরকারি অর্থায়ন ও অবকাঠামোগত বাধায় বাড়তি সঞ্চয় থেকে মূলধন গঠন ও উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগ সীমিত হতে পারে। তাই পারিবারিক ভোগব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি অবকাঠামো, মানবসম্পদ, জলবায়ু ও ডিজিটাল খাতের বিনিয়োগঘাটতিও পূরণ করতে হবে। শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগকে পরস্পরের পরিপূরক অগ্রাধিকার হিসেবে দেখার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ।