নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: টানা দুই কার্যদিবসের পতনের পর গতকাল সোমবার দেশের শেয়ারবাজারে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রবণতা দেখা গেছে। ব্যাংক খাতের শেয়ারে বাড়তি লেনদেন ও নির্বাচিত কয়েকটি মৌলভিত্তির শেয়ারে ক্রয়চাপের ওপর ভর করে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক বেড়েছে। একই সঙ্গে বাজারের লেনদেনও আবার ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। তবে দিনের লেনদেনে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শক্তিশালী উপস্থিতির প্রমাণ না থাকায় এ উত্থানকে এখনই বড় ধরনের বাজার-র্যালি হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা।
দিন শেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২৭ দশমিক ৯৬ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৪৫০ দশমিক ৬৩ পয়েন্টে উঠেছে। এর আগে ১৮ অক্টোবর সূচক কমেছিল ১০ দশমিক ৫১ পয়েন্ট এবং ১৭ অক্টোবর কমেছিল ১৮ দশমিক ৮৮ পয়েন্ট। ফলে দুই দিনের পতনের পর সোমবারের উত্থানকে আপাতত বাজারের একটি স্বল্পমেয়াদি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা হিসেবেই দেখা যাচ্ছে। এদিন লেনদেন হওয়া ৩৮১টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ১৮৭টির দর বেড়েছে, ১৩৬টির কমেছে এবং ৫৮টির দর অপরিবর্তিত ছিল। অর্থাৎ উত্থানটি কয়েকটি শেয়ারে সীমাবদ্ধ না থেকে বাজারের তুলনামূলক বড় অংশে ছড়িয়েছে।
তবে দিনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে ব্যাংক খাতে। আগের কার্যদিবসে ব্যাংক খাতে যেখানে লেনদেন ছিল প্রায় ২৭ কোটি টাকা, সোমবার তা বেড়ে প্রায় ১১১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা হয়েছে। মোট বাজারের লেনদেনের প্রায় এক-চতুর্থাংশই এসেছে এই খাত থেকে। প্রাইম ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংকের মতো নির্বাচিত ব্যাংকের শেয়ারে ক্রয়চাপ ছিল। ব্যাংকের আসন্ন তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফল প্রকাশকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে, এমন ইঙ্গিত বাজার পর্যালোচনায় পাওয়া গেছে। তবে এসব কোম্পানির ফল প্রকাশের আগে ভালো ফলের প্রত্যাশাকে বাজারের সম্ভাব্য অনুঘটক বলা গেলেও এটিকে নিশ্চিত কারণ বলা যাচ্ছে না।
ব্যাংক খাতে আগ্রহ বাড়ার পেছনে কোম্পানি-নির্দিষ্ট কিছু ইতিবাচক খবরও কাজ করেছে। ব্র্যাক ব্যাংক কৃষি অর্থায়ন ও গ্রামীণ উদ্যোক্তা উন্নয়ন নিয়ে নতুন উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। পাশাপাশি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাল বাংলাদেশ সম্প্রতি ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংককে পছন্দের ব্যাংক হিসেবে উল্লেখ করেছে। প্রতিবেদনে এসব ব্যাংকের জন্য উল্লেখযোগ্য দরবৃদ্ধির সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়েছে। ফলে ব্যাংক খাতকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তৈরির পেছনে শুধু স্বল্পমেয়াদি লেনদেন নয়, মৌলভিত্তি ও ভবিষ্যৎ ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রত্যাশাও কাজ করতে পারে।
অন্যদিকে সব খাতে একই ধরনের ক্রয়চাপ দেখা যায়নি। বস্ত্র খাতে প্রায় ১০২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা লেনদেন হলেও খাতটির সামগ্রিক দর কিছুটা কমেছে। তবে মতিন স্পিনিংয়ের শেয়ারে ৫ দশমিক ১০ শতাংশ দরবৃদ্ধি হয়েছে। কোম্পানিটির ৪৫ শতাংশ নগদ ও ১০ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশের সুপারিশের পাশাপাশি উৎপাদন আধুনিকায়নে প্রায় ৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি কেনার পরিকল্পনা বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়াতে সহায়তা করেছে। কোম্পানিটি এ বিনিয়োগের ফলে বছরে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা অতিরিক্ত মুনাফার প্রত্যাশা জানিয়েছে।
কোম্পানি-নির্দিষ্ট তথ্যের প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়েছে পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্স ও শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের ক্ষেত্রে। পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্সের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় ১ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বেড়ে ১ টাকা ৪৬ পয়সা হওয়ায় শেয়ারটির দর ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ বেড়েছে। বিপরীতে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ লভ্যাংশ না দেওয়ার ঘোষণা এবং দুর্বল আর্থিক ফলের পর দর ১১ দশমিক ৮১ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে সামগ্রিক প্রবণতার পাশাপাশি কোম্পানির আর্থিক ফল, লভ্যাংশ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের তথ্যের ভিত্তিতে শেয়ার বাছাইয়ের প্রবণতাও স্পষ্ট হচ্ছে।
সোমবার ডিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছে ৫০২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, যা আগের দিনের তুলনায় ৩৭ শতাংশের বেশি। লেনদেনের পরিমাণ বাড়লেও খুচরা বিনিয়োগকারীদের আধিপত্য অব্যাহত রয়েছে। ফলে লেনদেন বৃদ্ধিকে পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক অর্থপ্রবাহের প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং ব্যাংকসহ নির্দিষ্ট কিছু শেয়ারে খুচরা বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণই আজকের লেনদেন বৃদ্ধির বড় বৈশিষ্ট্য।
বাজারের আরেকটি দিকও নজরে রাখার মতো। ব্লক মার্কেটে সায়হাম টেক্সটাইল, রেনাটা ও প্রাইম ব্যাংকসহ কয়েকটি শেয়ারে উল্লেখযোগ্য লেনদেন হয়েছে। কিন্তু এসব লেনদেনকে সরাসরি নতুন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ হিসেবে ব্যাখ্যা করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য নেই। একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন কোম্পানির আসন্ন আর্থিক ফল ও লভ্যাংশ নিয়ে আলোচনা থাকলেও সেগুলোকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। বরং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোও গুজবনির্ভর লেনদেন থেকে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে।