Print Date & Time : 21 October 2026 Wednesday 12:11 am

ডেঙ্গু নির্মূলে চাই জনসচেতনতা, সম্মিলিত উদ্যোগ

image

ড. মো. শামীম হোসেন নোমান: ডেঙ্গু বর্তমানে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আরবোভাইরাল রোগ হিসেবে বিবেচিত হয় যা A. aegypti ভেক্টর দ্বারা সংঘটিত হয়। বর্ষাকালে শহর ও উপশহর এলাকার জনগোষ্ঠীর মাঝে ডেঙ্গু জ্বর সংক্রমণের উচ্চহার লক্ষ্য করা যায়। বিশ্বের প্রতিটি বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা অঞ্চলে এখন ডেঙ্গুর সংক্রমণ চলমান রয়েছে এবং এশিয়া, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া ও উত্তর আমেরিকার ১২৫টিরও বেশি দেশ ডেঙ্গু মহামারির ঝুঁকিতে রয়েছে। বর্তমানে সারা বিশ্বে প্রতি বছর ৫০ থেকে ১০০ মিলিয়ন লোক ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন, যার মধ্যে ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়ে থাকে। জলবায়ু পরিবর্তন, ভাইরাসের বিবর্তন, অপরিকল্পিত ও অত্যধিক জনসংখ্যার ফলে সৃষ্ট নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত এবং অস্বাস্থ্যকর বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনার কারণে ডেঙ্গু জ্বর ক্রমেই বেড়ে চলেছে।

ডেঙ্গু এখন বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বর্ষা এলেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি, হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ এবং মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়া যেন নিয়মিত চিত্রে পরিণত হয়েছে। তবে ডেঙ্গু কেবল একটি মৌসুমি রোগ নয়; এটি নগর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা, জনসচেতনতা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা। ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে শুধু ওষুধ ছিটানো কিংবা মশা নিধনের সাময়িক অভিযান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগ। তাই ডেঙ্গু নির্মূলে জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলাই সময়ের দাবি।

চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গুতে তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা, গায়ে র‌্যাশ ও বমির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এখন ডেঙ্গু হলে সামান্য জ্বরেই হার্ট, কিডনি ও ব্রেইন আক্রান্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে রোগীর দ্রুত শকে যাওয়ার আশঙ্কাও বেড়েছে। বর্তমান বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকেই ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে আছেন। আগে আমরা জানতাম এডিস মশা শুধু পরিষ্কার ও স্বচ্ছ পানিতে হয়, এখন দেখা যাচ্ছে নোংরা এমনকি নোনা পানিতেও এই মশা ডিম পাড়তে পারে। ধারণা করা হতো, এডিস মশা শুধু দিনে কামড়ায়। তাই রোগীদের বলা হতো দিনের বেলা মশারি টানিয়ে ঘুমাতে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে এ মশা দিনে-রাতে দুই সময়েই কামড়াচ্ছে। আগে সাধারণত বর্ষার বা বৃষ্টিপাতের সঙ্গে ডেঙ্গুর সম্পর্ক থাকলেও বর্তমানে সারা বছরই ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। এমনকি শীতকালেও এর প্রভাব দেখা গেছে। এ কারণেই বলা যায়, ডেঙ্গুও যেমন নিজের লক্ষণ বদলাচ্ছে, এডিস  মশাও তেমনি বদলাচ্ছে নিজের চরিত্র।

এডিস মশা সাধারণত জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে বংশবিস্তার করে। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের পাত্র, পানির ট্যাংক ও নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। আমাদের চারপাশে সামান্য অসতর্কতাই মশার বংশবিস্তারের সুযোগ তৈরি করে। অনেকেই মনে করেন, বাড়ির ভেতর পরিষ্কার রাখলেই দায়িত্ব শেষ। অথচ পাশের বাড়ি, ছাদ, নালা, পরিত্যক্ত জমি কিংবা নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পানিও ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এ কারণেই ডেঙ্গু প্রতিরোধকে শুধু ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি সামগ্রিক সামাজিক দায়িত্ব।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হলো, অনেক ক্ষেত্রে রোগের প্রকোপ বাড়ার পর তৎপরতা শুরু হয়। অথচ মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা গেলে রোগের বিস্তার আগেই অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই ডেঙ্গু মোকাবিলায় সংকট দেখা দেওয়ার পর নয়, বরং সারা বছর ধরে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম চালাতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপগুলোর একটি হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। এজন্য প্রত্যেক পরিবারকে নিয়মিত বাড়ির আশপাশ পরিদর্শন করতে হবে। কোথাও পানি জমে থাকলে তা অপসারণ করতে হবে। পানির পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে এবং পানির ট্যাংক ভালোভাবে ঢেকে রাখতে হবে। ফুলের টবের নিচের পাত্র, অব্যবহৃত বালতি, ড্রাম, টায়ার ও অন্যান্য পানি জমতে পারে এমন সামগ্রী পরিষ্কার রাখতে হবে অথবা যথাযথভাবে সরিয়ে ফেলতে হবে। সপ্তাহে অন্তত একদিন নির্দিষ্ট করে বাড়ি, ছাদ, বারান্দা ও আশপাশের পরিবেশ পরীক্ষা করার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। তবে একবার পরিষ্কার করেই দায়িত্ব শেষ নয়; নিয়মিত পর্যবেক্ষণ জরুরি।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রতিটি পরিবারের সদস্যকে বুঝতে হবে, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা অন্যের জন্য উপকার করার পাশাপাশি নিজের পরিবারকেও সুরক্ষিত রাখার উপায়। শিশুদের এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে এবং বাড়ির পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় পরিবারের সবাইকে সম্পৃক্ত করতে হবে। দিনের বেলায়ও এডিস মশা কামড়াতে পারে। তাই প্রয়োজনে মশা প্রতিরোধক ব্যবহার, শরীর ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরা, জানালা-দরজায় মশা প্রতিরোধী জাল ব্যবহার এবং ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহারের মতো সতর্কতাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও অসুস্থ মানুষের সুরক্ষায় বাড়তি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। পরিবারের পাশাপাশি প্রতিবেশীদের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে। একটি বাড়ি পরিষ্কার থাকলেও আশপাশের পরিবেশে মশার প্রজনন চলতে থাকলে ঝুঁকি থেকে যায়। তাই ব্যক্তিগত সচেতনতার সঙ্গে সামাজিক অংশগ্রহণের সমন্বয় ঘটাতে হবে।

জনসচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদপত্র, টেলিভিশন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সংগঠনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে প্রচার হতে হবে তথ্যভিত্তিক, সহজবোধ্য ও বাস্তবসম্মত। ভুল তথ্য, গুজব কিংবা আতঙ্ক সৃষ্টি না করে মানুষকে প্রতিরোধের কার্যকর উপায় জানানো জরুরি। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা, নালা-নর্দমা পরিষ্কার রাখা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং নির্মাণাধীন ভবনগুলোতে জমে থাকা পানি অপসারণ নিশ্চিত করতে হবে।

মশা নিধনের জন্য কীটনাশক প্রয়োগের প্রয়োজন হতে পারে, তবে তা হতে হবে পরিকল্পিত, বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা অনুসরণ করে এবং যথাযথ নজরদারির মাধ্যমে। শুধু দৃশ্যমান ধোঁয়া তৈরি করাই মশা নিয়ন্ত্রণের পূর্ণাঙ্গ সমাধান নয়। প্রজননস্থল ধ্বংস, লার্ভা নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনে কার্যকর কীটনাশক প্রয়োগের সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা ও মশার প্রতিরোধ ক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে নিয়মিত নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ এবং ফলাফল মূল্যায়ন অপরিহার্য। কোন এলাকায় মশার ঘনত্ব বেশি, কোথায় রোগীর সংখ্যা বাড়ছে এবং কোন ধরনের পদক্ষেপ কার্যকর হচ্ছে, এসব তথ্যের ভিত্তিতে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। একই সঙ্গে পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অবহেলা, উন্মুক্ত জলাধার এবং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা পানির সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। শুধু জরুরি পরিস্থিতিতে অভিযান চালিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সারা বছর ধরে পরিচালিত একটি ধারাবাহিক কর্মসূচি, যেখানে প্রতিরোধ, নজরদারি ও জনসম্পৃক্ততা সমান গুরুত্ব পাবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতন প্রজন্ম গড়ে তোলার কার্যকর ক্ষেত্র। বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, সচেতনতামূলক আলোচনা, পোস্টার প্রদর্শনী এবং শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে পরিবেশ পর্যবেক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীরা নিজেদের বাড়ি ও পাড়া-মহল্লায় সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দিতে পারে। এছাড়া স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, যুবসমাজ, ক্লাব, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সম্মিলিতভাবে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করতে পারেন। মসজিদসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও পরিচ্ছন্নতা ও জনস্বাস্থ্যের গুরুত্ব তুলে ধরা যেতে পারে। গণমাধ্যমের উচিত ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশের পাশাপাশি প্রতিরোধের বাস্তব উপায়গুলো মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

ডেঙ্গু প্রতিরোধকে একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। প্রতিটি ওয়ার্ড, মহল্লা, গ্রাম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থান শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ সহজ করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এসব কার্যক্রম যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতা বা প্রচারসর্বস্ব কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রতিটি উদ্যোগের সঙ্গে বাস্তব কাজ, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং অর্জিত ফলাফল মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকতে হবে। 

ডেঙ্গু সম্পূর্ণ মানবসৃষ্ট একটি দুর্যোগ, আমাদের কর্মফলই এজন্য বহুলাংশে দায়ী। আমরা পরিবেশের উপর যে অন্যায় ও বিরূপ আচরণ করছি, তারই ফলস্বরূপ এই রোগ আমাদের দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। এখনই পরিবেশ রক্ষায় ও পরিবেশ দূষণে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ না নিলে সামনে এই জাতিকে ডেঙ্গুর মতো আরও ভয়াবহ পরিবেশগত সমস্যা মোকাবিলা করতে হতে পারে। সে বিষয়টি মাথায় রেখেই আমাদের গবেষণা ও পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমাদের বাহক বা এডিস মশা নিধন ছাড়া আর কোনো করণীয় বিষয় নেই। এ ক্ষেত্রে আমাদের জনবল ঘাটতি রয়েছে, গবেষণার অনেক সুবিধাদি নেই। 

ডেঙ্গু নির্মূলের লক্ষ্য অর্জন সহজ নয়; তবে ধারাবাহিক ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এর বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন সচেতন নাগরিক, দায়িত্বশীল প্রশাসন, কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশের প্রতি সম্মিলিত অঙ্গীকার। নিজস্ব সচেতনতা, পারিবারিক সতর্কতা, সামাজিক অংশগ্রহণ ও প্রশাসনিক কার্যকর পদক্ষেপ এই চারটি বিষয়কে সমন্বিত করতে পারলেই ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন সম্ভব। আজই যদি আমরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করি, তাহলে আগামীদিনের জন্য একটি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রতিটি নাগরিকের সচেতনতাই হোক প্রথম পদক্ষেপ, আর সম্মিলিত উদ্যোগ হোক সাফল্যের ভিত্তি।

অধ্যাপক, কীটতত্ত্ব বিভাগ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়