Print Date & Time : 26 October 2026 Monday 10:19 pm

ঐতিহ্য ও সংকটের দোলাচলে যশোরের খেজুরের গুড়

image

মীর কামরুজ্জামান মনি, যশোর: শীতের কুয়াশা ভেজা ভোরে খেজুরগাছ থেকে নামানো মাটির হাঁড়িতে জমে মিষ্টি রস। সেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় সুগন্ধি গুড় ও পাটালি, যার স্বাদে জমে ওঠে বাংলার শীতের পিঠা-পায়েসের আয়োজন। যশোরের গ্রামবাংলায় এই চিরচেনা দৃশ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো মানুষের জীবিকা ও কয়েক প্রজন্মের ঐতিহ্য।

শীত মৌসুমে খেজুরের রস ও গুড়কে ঘিরে জেলায় ১২০ কোটি টাকার বেশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ায় ঐতিহ্যবাহী এই পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও বেড়েছে। তবে বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিপরীতে খেজুরগাছের স্বল্পতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, দক্ষ গাছির সংকট ও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার শঙ্কা এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

যশোরের খেজুরের গুড় কেবল একটি মৌসুমি খাদ্যপণ্য নয়; এটি এ অঞ্চলের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ‘যশোরের যশ, খেজুরের রস’-প্রচলিত এই প্রবাদে পণ্যটির সঙ্গে জেলার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ফুটে উঠেছে। ২০২৪ সালে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার মধ্য দিয়ে যশোরের খেজুরের গুড় পেয়েছে স্বতন্ত্র ভৌগোলিক পরিচিতি। এখন এই স্বীকৃতিকে কাজে লাগিয়ে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও পণ্যটির পরিচিতি বাড়ানোর প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

মৌসুম ঘিরে ব্যস্ত গাছিরা

শীতের আগমনী বার্তা ছড়িয়ে পড়তেই যশোরের বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয়েছে খেজুরগাছ প্রস্তুতের কাজ। গাছের ডালপালা পরিষ্কার করা, মাথা ছেঁটে রস সংগ্রহের উপযোগী করে তোলা এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরা। কয়েক দিনের মধ্যেই গাছে গাছে ঝুলবে মাটির হাঁড়ি। ভোরে সংগৃহীত সেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হবে গুড় ও পাটালি।

যশোরের খাজুরা এলাকার গাছি জিয়ারুলের কাছে শীত মানেই বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপার্জনের সময়। গত মৌসুমে ৯২টি খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় ও পাটালি তৈরি করেছিলেন তিনি। মান ভালো হওয়ায় ক্রেতাদের কাছ থেকেও সাড়া পেয়েছিলেন। সব মিলিয়ে বিক্রি করেছিলেন প্রায় ৮৫ হাজার টাকার গুড়-পাটালি। এবারও একই প্রত্যাশা নিয়ে গাছ প্রস্তুত করছেন তিনি।

তবে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও খাঁটি গুড়ের বাজার ধরে রাখার অনিশ্চয়তা তাকে ভাবিয়ে তুলছে। শুধু গাছ থেকে রস সংগ্রহ করলেই লাভ নিশ্চিত হয় না। গাছ পরিচর্যা, রস সংগ্রহ, জ্বালানি ও অন্যান্য উপকরণের ব্যয় মিটিয়ে প্রত্যাশিত আয় হাতে পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে বলে জানান গাছিরা।

জিয়ারুলের মতো যশোরের হাজারো গাছির কাছে খেজুরের রস ও গুড় মৌসুমি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। কয়েক মাসের এই কর্মযজ্ঞের সঙ্গে যুক্ত থাকেন গাছিদের পরিবারের সদস্য, জ্বালানি কাঠের সরবরাহকারী, মাটির হাঁড়ি প্রস্তুতকারক, গুড় ব্যবসায়ী ও পরিবহনকর্মীরা। ফলে এই শিল্পের উৎপাদন ও বিপণন কার্যক্রমের সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরের মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে।

বাড়ছে ব্যয়, অনিশ্চিত ন্যায্যমূল্য

খেজুরের গুড় উৎপাদনের প্রতিটি ধাপেই রয়েছে ব্যয়। গাছ প্রস্তুত করা, রস সংগ্রহ, মাটির হাঁড়ি স্থাপন এবং সংগৃহীত রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করতে প্রয়োজন হয় শ্রম, সময় ও অর্থের। গাছিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এক মণ জ্বালানি কাঠ কিনতে খরচ হচ্ছে প্রায় ২০০ টাকা। রস সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত ভালো মানের একটি দার দাম ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। এ ছাড়া মাটির হাঁড়ি বা ভাড়, শক্ত দড়ি এবং অন্যান্য সরঞ্জাম কিনতেও অর্থ ব্যয় করতে হয়।

উপকরণের দাম বাড়লেও উৎপাদিত গুড়ের ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় বিক্রয়মূল্য কম হলে গাছিদের লাভের পরিমাণ কমে যায়। অন্যদিকে বাড়তি খরচ পুষিয়ে নিতে গুড়ের দাম বাড়ালে সাধারণ ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টিও সামনে আসে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, উৎপাদক ও ভোক্তা—উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করে বাজারে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। গাছিদের শ্রমের যথাযথ মূল্য নিশ্চিত করা না গেলে তাঁরা দীর্ঘ মেয়াদে এই পেশায় আগ্রহ হারাবেন। এর প্রভাব পড়বে উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায়।

৩ লাখের বেশি গাছ, বড় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, যশোরে রস আহরণের উপযোগী খেজুরগাছের সংখ্যা তিন লাখ ১২ হাজার ৯৬১টি। এসব গাছ থেকে চলতি মৌসুমে ৩ কোটি ৮৮ লাখ ছয় হাজার ৫৬৫ লিটার রস সংগ্রহ এবং তিন হাজার ৯০ মেট্রিক টন গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এই উৎপাদন ও বিপণন কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে মৌসুমজুড়ে জেলায় ১২০ কোটি টাকার বেশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে। স্থানীয় হাটবাজারের পাশাপাশি অনলাইনভিত্তিক উদ্যোক্তাদের মাধ্যমেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে যাচ্ছে যশোরের গুড় ও পাটালি। এতে স্থানীয় বাজারের গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর ক্রেতাগোষ্ঠীর কাছে পণ্যটি পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে একটি খেজুরগাছ থেকে পুরো মৌসুমে গড়ে সাত থেকে আট কেজি গুড় পাওয়া যেতে পারে। প্রকৃত উৎপাদন নির্ভর করে গাছের বয়স ও উৎপাদনক্ষমতা, আবহাওয়া, রসের পরিমাণ এবং মৌসুমের দৈর্ঘ্যের ওপর। ফলে শুধু গাছের সংখ্যা বা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা দিয়ে শিল্পটির প্রকৃত সাফল্য নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। উৎপাদন খরচ, বাজারদর, পণ্যের মান এবং উৎপাদকদের হাতে থাকা নিট আয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।

কমছে খেজুরগাছ, বাড়ছে দক্ষ গাছির সংকট

অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি যশোরের খেজুরের গুড়শিল্পের অন্যতম বড় উদ্বেগ খেজুরগাছের সংখ্যা কমে যাওয়া।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে খেজুরগাছ ব্যবহারের কারণে অনেক এলাকায় গাছের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। পাশাপাশি নতুন গাছ রোপণ, চারার পরিচর্যা ও পুরোনো গাছ সংরক্ষণে পর্যাপ্ত উদ্যোগের অভাব ভবিষ্যৎ উৎপাদনের ভিত্তিকে দুর্বল করছে।

খেজুরগাছ রোপণের পরপরই রস সংগ্রহ করা যায় না। গাছকে উৎপাদনক্ষম অবস্থায় পৌঁছাতে সময় ও নিয়মিত পরিচর্যা প্রয়োজন। তাই বর্তমানের উৎপাদন ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন গাছ রোপণ ও পরিচর্যায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। তা না হলে বাজারের চাহিদা বাড়লেও পর্যাপ্ত কাঁচামাল সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

এদিকে এই পেশায় দক্ষ গাছির সংকটও বাড়ছে। চৌগাছা উপজেলার চাকলা গ্রামের আবদুল কুদ্দুসের পরিবারে খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির ঐতিহ্য কয়েক প্রজন্মের। তার দাদা হবিবুর মণ্ডল এই পেশায় যুক্ত ছিলেন। পরে তার বাবাও একই কাজ করেছেন। পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখতে এখন নিজেই এই কাজে যুক্ত হয়েছেন কুদ্দুস।

তবে নতুন প্রজন্মের অনেকেই শ্রমসাধ্য এই পেশায় আসতে আগ্রহী নন। শীতের ভোরে গাছে ওঠা, নিয়মিত পরিচর্যা, রস সংগ্রহ এবং দীর্ঘ সময় চুলায় রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরির কাজ শারীরিকভাবে কষ্টকর। এর সঙ্গে রয়েছে গাছে ওঠার দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং বছরের কয়েক মাসের আয়ের ওপর নির্ভর করে সংসার চালানোর অনিশ্চয়তা।

ফলে অভিজ্ঞ গাছিরা পেশা ছেড়ে দিলে তাদের জায়গায় পর্যাপ্ত দক্ষ কর্মী তৈরি হবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অভিজ্ঞ গাছিদের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া, নিরাপদে গাছে ওঠানামার কৌশল শেখানো এবং পেশাটিকে আর্থিকভাবে আকর্ষণীয় করে তোলার উদ্যোগ প্রয়োজন।

জিআই স্বীকৃতি কাজে লাগানোর সুযোগ

যশোরের খেজুরের গুড়ের জিআই স্বীকৃতি পণ্যটির স্বতন্ত্র পরিচিতি তুলে ধরার পাশাপাশি বাজার সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এই স্বীকৃতি থেকে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল পেতে হলে উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বিপণনের প্রতিটি ধাপে মান নিশ্চিত করতে হবে।

নিরাপদ উপায়ে রস সংগ্রহ, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে গুড় তৈরি, ভেজাল প্রতিরোধ, মানসম্মত মোড়কজাতকরণ এবং সঠিক সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে পণ্যের গুণগত মান সম্পর্কে ক্রেতাদের আস্থা অর্জন এবং নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালক জাহিদুল ইসলাম বলেন, যশোরের খেজুরের গুড়ের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের পাশাপাশি বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে। জিআই পণ্য হিসেবে নিরাপদ রস ও ভেজালমুক্ত গুড় উৎপাদনে গাছিদের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ এবং উঠোন বৈঠকের মাধ্যমে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, জিআই স্বীকৃতির যথাযথ ব্যবহার, আধুনিক বিপণনব্যবস্থা এবং পণ্যের মান নিশ্চিত করা গেলে যশোরের খেজুরের গুড়ের বাজার আরও বিস্তৃত করা সম্ভব। এতে নতুন ক্রেতা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদকদের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সুযোগও বাড়বে।

ঐতিহ্য রক্ষায় প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

যশোরের খেজুরের রস ও গুড়কে ঘিরে ১২০ কোটি টাকার বেশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রত্যাশা এই শিল্পের সম্ভাবনাকে স্পষ্ট করে। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে শুধু উৎপাদন ও বিক্রি বাড়ানোর দিকে নজর দিলেই চলবে না; উৎপাদনের মূল ভিত্তি—খেজুরগাছ ও দক্ষ গাছিদের সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে।

এ জন্য নতুন খেজুরগাছ রোপণ, বিদ্যমান গাছের পরিচর্যা, মানসম্মত উৎপাদন উপকরণ সরবরাহ এবং সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি গাছিদের সঙ্গে ব্যবসায়ী ও অনলাইন উদ্যোক্তাদের সরাসরি সংযোগ তৈরি করা গেলে উৎপাদকদের বাজারে প্রবেশ সহজ হবে এবং ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে।

একই সঙ্গে খাঁটি গুড়ের বাজার প্রতিষ্ঠা, ভেজাল প্রতিরোধ, নিরাপদ উৎপাদনপ্রক্রিয়া এবং পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। গাছিদের প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে এই পেশায় যুক্ত করতে পারলে ঐতিহ্যবাহী শিল্পটির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সহজ হবে।

শীতের সকালে মাটির হাঁড়িতে জমা মিষ্টি রস আর চুলায় জ্বাল দেওয়া গুড়ের সুবাস যশোরের পরিচয়ের সঙ্গে মিশে আছে। এই ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে হাজারো মানুষের জীবিকা, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং প্রজন্মান্তরের অভিজ্ঞতা। তাই ১২০ কোটি টাকার সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে গাছ, গাছি ও বাজার—তিনটির সমন্বিত সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। তাহলেই যশোরের খেজুরের গুড় কেবল শীতকালীন জনপ্রিয় পণ্য হিসেবে নয়, বরং একটি টেকসই অর্থনৈতিক শিল্প হিসেবেও প্রতিষ্ঠা পাওয়ার সুযোগ পাবে।

—জা. অর্থনীতি/এনজে