Print Date & Time : 07 November 2026 Saturday 05:26 am

নতুন পে-স্কেলেই বাড়ছে সরকারের ঋণের চাপ (ভিডিও)

image

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ছে, সঙ্গে মিলবে আগের মাসগুলোর বকেয়াও। কিন্তু এই বাড়তি বেতন দিতে টাকা আসবে কোথা থেকে? রাজস্ব আয় দিয়ে কি সামলানো যাচ্ছে না সরকারের ব্যয়? পরিস্থিতি এমনই যে, বেতন পরিশোধের অর্থ জোগাতে ব্যাংক থেকে আরও পাঁচ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আর এই ঋণের খবর সামনে আনছে সরকারি অর্থব্যবস্থার এক বড় চাপের চিত্র।

পাঁচ হাজার কোটি টাকার ঋণ; কী ঘটছে?

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলামের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকা তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। পহেলা নভেম্বর নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে আগের তিন মাসের বকেয়া পরিশোধের প্রস্তুতি রয়েছে।

 

কিন্তু, ট্রেজারি বিল কী? সহজভাবে বললে, সরকার ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য টাকা ধার নেয়। বিনিময়ে নির্ধারিত শর্তে সুদসহ সেই অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। অর্থাৎ, এই পাঁচ হাজার কোটি টাকা অনুদান নয়; এটি সুদসহ পরিশোধযোগ্য ঋণ।

এক মাসেই ঋণ ৬০ হাজার কোটি ছাড়ানোর হিসাব

সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ কতটা বেড়েছে, তা বোঝা যায় অক্টোবরের হিসাবেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে সরকার ঋণ নিয়েছে ৫৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আরও পাঁচ হাজার কোটি টাকা তোলা হলে অক্টোবরের মোট ঋণ গ্রহণ দাঁড়াবে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।

চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেও ঋণের অঙ্ক ছিল বড়। জুলাইয়ে ৫৬ হাজার কোটি, আগস্টে ৫০ হাজার কোটি এবং সেপ্টেম্বরে প্রায় ৪১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।  তবে মনে রাখতে হবে, এগুলো মোট ঋণ গ্রহণের হিসাব; পুরোনো ঋণ পরিশোধ ও নবায়নের কারণে সরকারের নিট ঋণের অঙ্কটি আলাদা।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক 

মূল সংকট কোথায়?  আয় কম, ব্যয় বেশি

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, সরকারকে এত ঋণ নিতে হচ্ছে কেন? কারণ, সরকারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। অথচ, আগের অর্থবছরে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ ছিল রেকর্ড এক লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা।

অন্যদিকে, অর্থবছরের প্রথম দুমাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। এ কারণে, বেতন-ভাতা থেকে শুরু করে সরকারের নিয়মিত ব্যয় মেটাতেও ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।

ঋণ বাড়লে সুদের চাপও বাড়ে

সরকারের ঋণের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে বাড়ছে ঋণের খরচও। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদের হার বা ইল্ড ৫ অক্টোবরের ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ থেকে ২৬ অক্টোবর বেড়ে প্রায় ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ হয়েছে। এখানে আরেকটি বিষয়ও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।  গত আগস্ট শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল চার লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, ব্যাংকে অর্থ থাকলেও সরকারকে ধার নিতে হচ্ছে এবং সেই ঋণের খরচও বাড়ছে।

এর প্রভাব পড়তে পারে কোথায়?

চলতি অর্থবছরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও পেনশনের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে এক লাখ ৩১ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা। আর নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে সরকারের বার্ষিক ব্যয় আরও প্রায় এক লাখ পাঁচ হাজার কোটি টাকা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো একদিকে যেমন তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে পারে, অন্যদিকে বাড়তি ব্যয়ের স্থায়ী অর্থায়ন নিশ্চিত করাও জরুরি। রাজস্ব আয় না বাড়লে ঋণ ও সুদের বোঝা বাড়ার ঝুঁকি থাকবে। সেই সঙ্গে, ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা ও বেসরকারি বিনিয়োগের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। তাই, বেতন বাড়ানোর ঘোষণা নয়, সেই বেতন দেওয়ার টেকসই অর্থের জোগান নিশ্চিত করাই এখন সরকারের সামনে বড় পরীক্ষা।

—জা. অর্থনীতি/এলএটি