Print Date & Time : 04 November 2026 Wednesday 12:48 am

সামুদ্রিক রাসায়নিক উপাদানের বৈজ্ঞানিক ও ওষুধি সম্ভাবনা

image

মো. আবু হাসান: পৃথিবীর উপরিভাগের প্রায় ৭১ শতাংশ জুড়ে বিস্তৃত মহাসাগরগুলো কেবল বিশাল জলরাশিই নয়, বরং এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় এবং চরম বাস্তুতন্ত্রের আধার। সমুদ্রের তলদেশের উচ্চচাপ, সূর্যালোকের অনুপস্থিতি, লবণের উচ্চ ঘনত্ব এবং তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিবেশে টিকে থাকার জন্য সামুদ্রিক জীবসমূহ কোটি কোটি বছর ধরে বিবর্তিত হয়েছে। এই প্রতিকূল পরিবেশে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং আত্মরক্ষা করতে তারা অনন্য কিছু সেকেন্ডারি মেটাবোলাইট এবং জৈব-সক্রিয় রাসায়নিক যৌগ সংশ্লেষণ করে। আধুনিক জৈবপ্রযুক্তি এবং ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্পে এই সামুদ্রিক প্রাকৃতিক উপাদানগুলোর অন্বেষণ ও ব্যবহার যাকে বিজ্ঞানসম্মত ভাষায় ‘মেরিন বায়োপ্রোস্পেক্টিং’ (Marine Bioprospecting) বলা হয়, তা চিকিৎসা ও প্রযুক্তির দুনিয়ায় এক নতুন বৈপ্লবিক দিগন্তের সূচনা করেছে।

ফার্মাকোলজিক্যাল উদ্ভাবন এবং ক্যানসার গবেষণা
সামুদ্রিক অমেরুদণ্ডী প্রাণী, বিশেষ করে Porifera (স্পঞ্জ), Tunicates (অ্যাসিডিয়ান) এবং Cnidaria (প্রবাল) বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য জীবনরক্ষাকারী ওষুধি উপাদানের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে। ক্যানসার চিকিৎসায় সাইটোটক্সিক যৌগ বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সামুদ্রিক স্পঞ্জ এবং অণুজীব থেকে প্রাপ্ত রাসায়নিক যৌগগুলো শক্তিশালী অ্যান্টি-টিউমার বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে। উদাহরণস্বরূপ ‘সাইট্যারাবিন’ (Cytarabine) নামক ক্যানসারের ওষুধটি একটি সামুদ্রিক স্পঞ্জ থেকে পাওয়া যৌগের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। এছাড়াও নরম প্রবাল থেকে প্রাপ্ত রাসায়নিক উপাদান কোষের অস্বাভাবিক বিভাজন রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। নিউরোফার্মাকোলজি ও ব্যথানাশক উদ্ভাবনেও সমুদ্র এক উদার প্রান্ত খুলে রেখেছে। গভীর সমুদ্রের শিকারি শামুক কোণ স্নেল (Cone Snail) এর পেপটাইড টক্সিন (বিষ) নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, এর ভেতরের নির্দিষ্ট রাসায়নিক উপাদান তীব্র ব্যথা উপশম করতে পারে। এটি থেকে তৈরি ‘জিকোনোটাইড’ (Ziconotide) নামক ওষুধটি বর্তমানে চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে, যা দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র ব্যথা নিরাময়ে মরফিনের চেয়েও প্রায় ১ হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী, অথচ এটি মরফিনের মতো শরীরে কোনো ক্ষতিকর আসক্তি তৈরি করে না। বর্তমান বিশ্বে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা ব্যাকটেরিয়ার ওষুধ-প্রতিরোধী হয়ে ওঠা। সামুদ্রিক অনুজীবীয় উপাদান আজ অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) প্রতিরোধে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। স্থলভাগের অণুজীব থেকে প্রাপ্ত প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকগুলো অনেক ক্ষেত্রেই আর কাজ করছে না। এই সংকট উত্তরণে বিজ্ঞানীরা এখন গভীর সমুদ্রের তলদেশের পলিতে থাকা অ্যাক্টিনোব্যাকটেরিয়া (Actinobacteria) এবং সায়ানোব্যাকটেরিয়া নিয়ে গবেষণা করছেন। সমুদ্রের চরম পরিবেশে থাকা এই অণুজীবগুলো সম্পূর্ণ নতুন রাসায়নিক কাঠামোর অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল যৌগ নিঃসৃত করে, যা মাল্টি-ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট (MDR) সুপারবাগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হচ্ছে। নিউরোডিজেনারেটিভ রোগের চিকিৎসায়ও সামুদ্রিক উপাদান ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে আলঝেইমার্স, পার্কিনসন্স এবং স্ট্রোকের মতো নিউরোডিজেনারেটিভ (মস্তিষ্কের কোষ ক্ষয়জনিত) রোগের চিকিৎসায় সামুদ্রিক শৈবাল এবং সামুদ্রিক অণুজীব থেকে প্রাপ্ত রাসায়নিক যৌগগুলো দারুণ সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। এই যৌগগুলো মস্তিষ্কের নিউরনে প্রদাহ কমাতে এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেস থেকে কোষকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। এছাড়াও সামুদ্রিক ওষুধি উপাদানগুলো অ্যান্টি-ভাইরাল এবং অ্যান্টি-ডায়াবেটিক ড্রাগ তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সবুজ রসায়ন ও টেকসই বায়োটেকনোলজিতে সমুদ্র আমাদের এক বিশাল ভাণ্ডার খুলে দিয়েছে। কেবল ওষুধি উপাদানই নয়, সমুদ্রের রাসায়নিক উদ্ভাবন পরিবেশ রক্ষায় এবং টেকসই শিল্পায়নেও ভূমিকা রাখছে। পরিবেশ রক্ষায় বায়ো-প্লাস্টিক ও পলিমার উৎপাদন এক যুগান্তকারী উদ্ভাবন। সামুদ্রিক শৈবাল থেকে প্রাপ্ত ও নিষ্কাশিত কার্বোহাইড্রেট ও পলিস্যাকারাইড ব্যবহার করে বর্তমানে সম্পূর্ণ পচনশীল এবং পরিবেশবান্ধব বায়ো-প্লাস্টিক তৈরি করা হচ্ছে, যা সিন্থেটিক প্লাস্টিকের একটি চমৎকার বিকল্প। এছাড়া থার্ড-জেনারেশন বায়োফুয়েল তৈরিতে সামুদ্রিক শৈবালের ভূমিকা অনস্বীকার্য। লিপিড বা চর্বি সমৃদ্ধ মাইক্রোঅ্যালগি (অণুবীক্ষণিক শৈবাল) থেকে উন্নত প্রযুক্তির জৈব-জ্বালানি বা বায়োফুয়েল উৎপাদন করা হচ্ছে। এই থার্ড-জেনারেশন বায়োফুয়েল উৎপাদনে ফসলি জমির প্রয়োজন হয় না এবং এটি বায়ুমণ্ডলে কার্বন নির্গমন হ্রাসে সরাসরি ভূমিকা রাখে।

সামুদ্রিক এনজাইম ও শিল্পকারখানায় ব্যবহার
সামুদ্রিক জীবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো এনজাইম। বিশেষ করে সমুদ্রের গভীর অঞ্চলে, উষ্ণ প্রস্রবণে কিংবা উচ্চ লবণাক্ত পরিবেশে বসবাসকারী অণুজীব এমন কিছু এনজাইম তৈরি করে, যেগুলো বিশেষ পরিবেশে কাজ করতে পারে। এসব এনজাইম খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জৈবপ্রযুক্তি এবং রাসায়নিক শিল্পে কাজে লাগানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে। উদাহরণস্বরূপ, লবণসহনশীল এনজাইম উচ্চ লবণাক্ত পরিবেশে পরিচালিত কিছু শিল্পপ্রক্রিয়ায় উপযোগী হতে পারে। একইভাবে নিম্ন তাপমাত্রায় কার্যকর এনজাইম কম তাপমাত্রায় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে শক্তির ব্যবহার কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে প্রতিটি এনজাইমের কার্যকারিতা, স্থায়িত্ব, উৎপাদন ব্যয় ও নিরাপত্তা পরীক্ষা করে তবেই বাণিজ্যিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হয়।

সামুদ্রিক কোলাজেন, কাইটিন ও অন্যান্য জৈব উপাদান
মাছের চামড়া, আঁশ ও অন্যান্য সামুদ্রিক উপজাত থেকে কোলাজেন এবং জেলাটিন সংগ্রহ করা যায়। এসব উপাদান খাদ্য, প্রসাধনী, ওষুধশিল্প এবং ক্ষত পরিচর্যার উপকরণ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। সামুদ্রিক উৎসের কোলাজেনের গুণাগুণ তার উৎস, নিষ্কাশন পদ্ধতি এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের ওপর নির্ভর করে। এছাড়া চিংড়ি ও কাঁকড়ার খোলসে থাকা কাইটিন থেকে কাইটোসান তৈরি করা যায়। কাইটোসান পানি থেকে কিছু দূষক অপসারণ, জৈব-অবক্ষয়যোগ্য আবরণ তৈরি এবং নির্দিষ্ট ধরনের ওষুধ সরবরাহব্যবস্থায় ব্যবহারের সম্ভাবনা রাখে। তবে পানি পরিশোধনে এর কার্যকারিতা পানির অম্লত্ব, দূষকের ধরন এবং অন্যান্য রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বাস্তব প্রয়োগের আগে পরীক্ষাগার ও মাঠপর্যায়ে যাচাই জরুরি।

ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
সমুদ্রের অফুরন্ত রাসায়নিক ভাণ্ডার মানবজাতির ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য ও টেকসই উন্নয়নের জন্য এক আশীর্বাদস্বরূপ। তবে এই বিপুল সম্ভাবনার খনি উন্মোচনের পথে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। গভীর সমুদ্র থেকে নমুনা সংগ্রহ করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং জটিল প্রযুক্তি সাপেক্ষ। একই সঙ্গে বাণিজ্যিকভাবে ওষুধ উৎপাদনের জন্য নির্বিচারে সামুদ্রিক জীব আহরণ করলে তা সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। তাই বর্তমান বিজ্ঞানের লক্ষ্য হলো ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম সংশ্লেষণ (Chemical Synthesis) এবং জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে সামুদ্রিক রাসায়নিক যৌগগুলোর অনুরূপ উপাদান তৈরি করা, যাতে সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রেখেই প্রকৃতির এই অনন্য রাসায়নিক উদ্ভাবনকে মানবকল্যাণে সর্বোচ্চ ব্যবহার করা যায়।

বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ রেফারেন্স ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল মেজারমেন্টস (বিআরআইসিএম)