জাতীয় অর্থনীতি আন্তর্জাতিক: লোহিত সাগর অতিক্রম করতে ইচ্ছুক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য নতুন নিয়ম জারি করেছে ইরানের সমর্থনপুষ্ট ইয়েমেনি বাহিনী হুথি বিদ্রোহীরা। সেই নিয়মের আওতায় যাত্রা শুরুর আগে জাহাজ পরিচালনাকারীদের এখন যাত্রা শুরুর আগে হুথি গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হচ্ছে।
শুক্রবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শীর্ষ জাতীয় দৈনিক ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল (ডব্লিউএসজে)। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই নিয়ম জারির পর বর্তমানে জাহাজ কোম্পানিগুলো একটি অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ চ্যানেল ব্যবহার করে জাহাজের বিস্তারিত তথ্য হুথি বাহিনীকে জানাচ্ছে এবং তাদের জাহাজ যে হামলার শিকার হবে না, সে সংক্রান্ত নিশ্চয়তা চাইছে।
“এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে নিরাপত্তার পরিস্থিতি কতটা বদলে গেছে”,বলা হয়েছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে।
ডব্লিউএসজের প্রতিবেদন অনুসারে, সাগর অতিক্রম বা চলাচল বিষয়ক নিরপত্তা ছাড়পত্রের জন্য জাহাজ পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষকে ‘হিউম্যানিটারিয়ান অপারেশনস কোঅর্ডিনেশন সেন্টার’ (এইচওসিসি)-এর সাথে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। এ সংস্থাটি ২০২৪ সালের শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠা করেছে হুথিরা। বাণিজ্যিক জাহাজ এবং সেগুলোর পরিকল্পিত যাত্রাপথ সম্পর্কে তথ্য জানানোর উদ্দেশে এই সংস্থাটি গঠন করা হয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে,জাহাজগুলো জানিয়ে দেয় যে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই এবং তারা হুথিদের কাছে জানতে চায় যে তারা নিরাপদে চলাচল করতে পারবে কি না। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাধারণত ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই এর উত্তর দেয় এইচওসিসি।
গত বেশ কয়েক দিনে হুথিরা কিছু জাহাজের অনুরোধ পর্যালোচনা করার পর তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাও জারি করেছে।
এই অস্বাভাবিক ব্যবস্থাটি এখন কেবল আর কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নেই। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৬ আগস্ট পাঠানো এমন একটি ইমেইল আবেদনে জাহাজ এবং এর পরিকল্পিত যাত্রাপথ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ছিল।
ইমেইলটি পাঠিয়েছিল ‘ঝং চেং চাং লিং’ নামের একটি চীনা কন্টেইনার জাহাজের ক্রুরা। হুথি গোষ্ঠী জাহাজটিকে সাত দিনের জন্য চলাচলের অনুমতি দেয় এবং যাত্রাপথে তাদের ‘অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম’ (এআইএস) চালু রাখার নির্দেশ দেয়। উল্লেখ্য, এআইএসের মাধ্যমে জাহাজের পরিচয়, অবস্থান, গতি এবং যাত্রাপথের মতো তথ্য সম্প্রচারিত হয়, যার ফলে জাহাজটিকে ট্র্যাক করা সম্ভব হয়।
এই অস্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছে কারণ জাহাজ কোম্পানিগুলোকে দুটি বিকল্পের মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে হচ্ছে—হয় লোহিত সাগরের সংক্ষিপ্ত পথ ব্যবহার করা, অথবা পুরো অঞ্চলটি এড়িয়ে চলা।
লোহিত সাগর এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালি হলো ভারত মহাসাগর ও সুয়েজ খালের মধ্যে সংযোগকারী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ। বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর হুথিদের হামলার কারণে এই জলপথটি এখন অনেক বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। কিছু জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান দীর্ঘতর বিকল্প পথ গ্রহণের কথা বিবেচনা করতে বাধ্য হয়েছে; এর মধ্যে রয়েছে ‘কেপ অফ গুড হোপ’ ঘুরে যাওয়ার মতো পথ।
অবশ্য ইমেইল যোগাযোগের এই পদ্ধতির অর্থ এই নয় যে, লোহিত সাগরে প্রবেশের আগে জাহাজ কোম্পানিগুলোকে হুথিদের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে।
হুথিরা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই—এমন জাহাজগুলোকে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাড়তি সতর্কতা হিসেবে কিছু জাহাজ সংস্থা ‘এইচওসিসি’ এর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে; বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে উত্তেজনার মাত্রা বেড়ে যাওয়ার পর এমনটি করেছে তারা।
ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অধিকাংশ এলাকা হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তারা লোহিত সাগরে পণ্যবাহী জাহাজ ও ট্যাঙ্কারগুলোতে হামলার মাধ্যমে বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে।
২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল, কিন্তু চলতি বছরের জুলাই মাসে তা ভেঙে যায়। এর ফলে ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনীর মধ্যে নতুন করে তীব্র সংঘাত শুরু হয়েছে। -সূত্র : ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, এনডিটিভি
—জা.অর্থনীতি/আরএস