আন্তর্জাতিক ডেস্ক: পশ্চিম ইউক্রেনের একটি সাদামাটা আদালত কক্ষে আসামির নাম ঘোষণা করা হলো। কিন্তু কেউ হাজির হলেন না। কোনো জবাবও এল না। কারণ আসামি রাশিয়া। এভাবেই শুরু হয়েছিল ইউক্রেনীয় ব্যবসায়ী দেনিস কাতিউখার ১১ মাসের আইনি লড়াই। রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে তার হোটেল ও একটি অ্যাপার্টমেন্ট দখল করা হয়েছে। এ অভিযোগ প্রমাণ করতে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনের একটি আদালত রাশিয়াকে ৫১ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। তবে রাশিয়া এ অর্থ দেবে, এমন সম্ভাবনা নেই।
রয়টার্সের রুশ ও ইউক্রেনীয় সম্পত্তির নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার অভিযান শুরুর পর থেকে আজভ সাগরের উপকূলীয় এলাকায় শত হোটেল ও রিসোর্ট দখল করেছে রাশিয়া বা সেগুলো দখলের জন্য চিহ্নিত করেছে।
দখল করা জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলে ৭ হাজারের বেশি আবাসিক ও বাণিজ্যিক সম্পত্তিকে ‘মালিকানাহীন’ ঘোষণা করেছে রুশ কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে রয়েছে ৫২১টি হোটেল ও রিসোর্ট। এসব হোটেল-রিসোর্টের অন্তত ৭৭টির নিয়ন্ত্রণ এখন রুশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের হাতে। এর মধ্যে ২০টি রুশ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘোষিত অন্যতম লক্ষ্য হলো দখলকৃত ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডকে রাশিয়ার অংশ হিসেবে পুনর্গঠন করা। সম্পত্তি দখলের মাধ্যমে ওই এলাকাগুলোতে নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করার পাশাপাশি যুদ্ধের জন্য অর্থ আয়ও সম্ভব হচ্ছে বলে মনে করেন ওয়াশিংটনভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের জাতীয় নিরাপত্তা গবেষক কারোলিনা হার্ড। তবে ইউক্রেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, দখলকৃত এলাকায় রাশিয়া এমন কঠোর সম্পত্তি আইন চালু করেছে, যা রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্পত্তি দখলের জন্য একটি ‘আইনি আড়াল’ তৈরি করেছে। এসব আইনের কারণে ইউক্রেনীয়রা রুশ নাগরিকত্ব গ্রহণ না করলে তাদের সম্পত্তির মালিকানা হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন।
অন্যদিকে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, যারা চেয়েছেন তাদের সম্পত্তি রুশ আইনের অধীনে নতুন করে নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। যারা তা করেননি, তাদের সম্পত্তি ‘মালিকানাহীন’ হয়ে গেছে।
তিন দিনের মধ্যে মালিকানা প্রমাণের নির্দেশ: কাতিউখার গল্পটি এই সম্পত্তি দখলের একটি উদাহরণ। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি ইউক্রেন ছেড়ে জার্মানিতে চলে যাওয়ার পর তার বাবা জানান, কয়েকজন সশস্ত্র ব্যক্তি তার হোটেলে ঢুকে সেটিকে ‘মালিকানাহীন’ ঘোষণা করেছে। হোটেলের মালিকানা দাবি করতে হলে মাত্র তিন দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে বলা হয়। কাতিউখার বাবা নথিপত্র জমা দিলেও সমস্যা দেখা দেয়। দখলদার কর্তৃপক্ষ ইউক্রেনের পাসপোর্ট ও সম্পত্তির দলিল গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। কাতিউখার ভাষ্য অনুযায়ী, তার বাবাকে বলা হয়েছিল, ‘এগুলো একটি অস্তিত্বহীন দেশের নথি।’
স্বপ্নের হোটেল ‘অ্যাডমিরাল’: আজভ সাগরের উপকূলীয় কিরিলিভকায় ‘অ্যাডমিরাল’ হোটেলটি গড়ে তুলেছিলেন কাতিউখা। ২০১৪ সালে কয়েকটি ছোট কটেজ দিয়ে শুরু হলেও ধীরে ধীরে এটি ১০০ কক্ষের একটি বড় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়। সেখানে ছিল তিনটি বার, একটি রেস্তোরাঁ, দোকান, সুইমিংপুল এবং শিশুদের জন্য পানিতে খেলার জায়গা।
২০২১ সালে রুশ দখলের আগের শেষ পর্যটন মৌসুমে কিরিলিভকায় প্রায় ২০ লাখ পর্যটক গিয়েছিলেন বলে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। ওই বছর ‘অ্যাডমিরাল’ হোটেলটি ‘হসপিটালিটি অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কারও পেয়েছিল। কিন্তু ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে সশস্ত্র ব্যক্তিরা হোটেলটি দখল করার মাত্র ৯ দিন পর রুশ-নিয়ন্ত্রিত একটি কমিশন এর নতুন মালিক নির্ধারণ করে। হোটেলটির নতুন মালিক হিসেবে ‘রিসোর্টস অব জাপোরিঝঝিয়া রিজিয়ন’ নামে একটি রুশ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দেখানো হয়। ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠানটির আয় ছিল ৬ কোটি ৫৭ লাখ রুবল, যা প্রায় ৮ লাখ ডলারের সমান।
পরে হোটেলটি আবার চালু করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে কাতিউখা নিজের পুরোনো হোটেলটি দেখতে পান। তবে তাকে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করে হোটেলটির নতুন ওয়েবসাইট। সেটি তার তৈরি পুরোনো ওয়েবসাইটের প্রায় হুবহু অনুকরণ করা হয়েছিল। শুধু ভাষা ইউক্রেনীয় থেকে রুশ করা হয়।
ক্ষতির হিসাব ৩ হাজার পৃষ্ঠায়: ২০২৩ সালের মাঝামাঝি ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করতে শুরু করেন কাতিউখা। তার তৈরি হিসাব দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজার পৃষ্ঠায়। একটি কক্ষ সাজাতে কত খরচ হয়েছিল, তারও হিসাব করেন তিনি। মাইক্রোওভেনের দাম ছিল ৪০ ডলার, ঝাড়বাতি ৪১ ডলার, ওক কাঠের বেডসাইড টেবিল প্রতিটি ৩১ ডলার। এমনকি ২০ সেন্টের ক্যান ওপেনারের হিসাবও বাদ দেননি তিনি। নির্মাণসামগ্রী, যন্ত্রপাতি, ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও কেনাকাটার রসিদ মিলিয়ে বিশাল একটি হিসাব তৈরি করেন আইনজীবীর সহায়তায়। প্রায় এক বছর ধরে চলে মামলাটি। রাশিয়ার কোনো প্রতিনিধি আদালতে অংশ নেননি। কয়েকটি শুনানি বোমা হামলা বা সাইরেনের কারণে পিছিয়ে যায়। অবশেষে ৩০ এপ্রিল বিচারক মিখাইলো স্মোকোভিচ কাতিউখাকে ৫১ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার রায় দেন। আদালত রাশিয়ার পদক্ষেপকে কার্যত সম্পত্তি অধিগ্রহণ হিসেবে বিবেচনা করে।
ক্ষতিপূরণের আশায় দীর্ঘ লড়াই: কাতিউখা রাশিয়ার বিরুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ ইউরোপীয় ইউনিয়ন-সমর্থিত ‘রেজিস্টার অব ড্যামেজ ফর ইউক্রেন’-এও নথিভুক্ত করেছেন। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত এই সংস্থা রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে ক্ষতি, সম্পত্তি নষ্ট বা অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করছে। ক্ষতিপূরণের দাবিতে ইতিমধ্যে ১ লাখ ৯৫ হাজারের বেশি মানুষ আবেদন করেছেন। সংস্থাটি বলছে, শেষ পর্যন্ত এ ধরনের দাবির সংখ্যা ৬০ লাখ থেকে ৮০ লাখে পৌঁছাতে পারে। তবে এসব ক্ষতিপূরণ দেওয়ার অর্থের উৎস বা ব্যবস্থা এখনও নির্ধারিত হয়নি। কাতিউখা জানেন, তার জীবদ্দশায় রাশিয়ার কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবু তিনি লড়াই চালিয়ে যেতে চান। তার আশা, একদিন তার নাতি-নাতনিরা এই ন্যায়বিচারের লড়াইয়ের সুফল দেখতে পারবে।