জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: অল্প জায়গা, স্বল্প পুঁজি, এমনকি জমি, রাসায়নিক সার কিংবা বালাইনাশক ছাড়াই চাষ করা সম্ভব পুষ্টিগুণে ভরপুর মাশরুম। দেশেই বছরে উৎপাদিত হচ্ছে ৪০ হাজার টনের বেশি এই ফসল। বাজারমূল্য প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। অথচ বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সুনির্দিষ্ট বাজার, সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থার অভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিতে পারছে না বাংলাদেশের মাশরুম খাত।
বিলিয়ন ডলারের হাতছানি থাকলেও বিপণন ও সংরক্ষণের অভাবে থমকে আছে মাশরুম খাত। সম্ভাবনাময় এই কৃষিপণ্যকে ঘিরে দেশে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্যোক্তা ও উৎপাদনের ক্ষেত্র। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে বাণিজ্যিক সাফল্যে রূপ দিতে এখনো রয়েছে বেশ কিছু বাধা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ৪০ থেকে ৪২ হাজার টন মাশরুম উৎপাদিত হচ্ছে। এর মধ্যে ওয়েস্টার মাশরুমের উৎপাদন সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি চাষ হচ্ছে ব্ল্যাক বা কান, মিল্কি, ঋষি, ইরিনজি ও বাটন জাতের মাশরুম। বর্তমানে এই খাতের বাজারমূল্য প্রায় ৮০০ কোটি টাকা, যা ৬৫ দশমিক ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান।
একসময় অভিজাত হোটেল ও রেস্তোরাঁর চাহিদা মেটাতে মাশরুম আমদানির ওপর নির্ভর করতে হতো। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রায় ৭০ টন মাশরুম আমদানি হলেও বর্তমানে আমদানির পরিমাণ নেমে এসেছে প্রায় শূন্যের কোঠায়।
অন্যদিকে, দেশের ১৭ কোটি মানুষের মাত্র ১০ শতাংশ নিয়মিত মাশরুম খেলে বছরে প্রায় ১৫ লাখ ৫১ হাজার টনের চাহিদা তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ দেশেই রয়েছে উৎপাদন ও বাজার সম্প্রসারণের বিশাল সুযোগ।
বিশ্ববাজারের চিত্রও বেশ আশাব্যঞ্জক। গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চের হিসাবে, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী মাশরুমের বাজার ছিল ৭১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের। ২০২৬ সালে তা ৭৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে। আর আইএমএআরসির হিসাবে, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক বাজারের আকার ৮০ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। ২০৩৪ সালের মধ্যে তা ১২৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন দেশের উদ্যোক্তারাও। ঢাকার ধামরাইয়ের আড়ালিয়া গ্রামের জহিরুল ইসলাম ২০১৭ সাল থেকে মাশরুম চাষ করছেন। ১০ শতাংশ জমিতে তার খামারে রয়েছে ৩০০টি বেড ও প্রায় ২৫ হাজার স্পন। প্রতিদিন উৎপাদন হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ কেজি মাশরুম। প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৪০০ টাকায়। সব খরচ বাদে মাসে তার লাভ ৭৫ থেকে ৮০ হাজার টাকা। বর্তমানে খামারটির বিনিয়োগ ও মূল্য প্রায় ৪০ লাখ টাকা।
জহিরুলের মতে, রপ্তানিযোগ্য মাশরুম উৎপাদনে জোর দিতে হবে। পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট বাজার এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা গেলে এই খাত আরও সম্প্রসারিত হবে।
পুষ্টিগুণের দিক থেকেও মাশরুমের রয়েছে গুরুত্ব। মুন্ন মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ডা. বজলুল করিম চৌধুরী জানান, প্রোটিনসমৃদ্ধ মাশরুম মাছ-মাংসের বিকল্প খাবার হতে পারে। এতে বিভিন্ন খাদ্য উপাদান রয়েছে।
এদিকে, মাশরুম চাষ সম্প্রসারণে ২০২৩ থেকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদি ৯৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এর আওতায় ২৫টি নতুন জার্মপ্লাজম সংগ্রহ, ২০টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে ৪৪টি জেলা, ১৪৮টি উপজেলা ও ১৫টি মেট্রোপলিটন থানা এলাকায়। তৈরি হয়েছেন প্রায় ৬০০ উদ্যোক্তা এবং ১৮ হাজার দলভুক্ত চাষি।
প্রকল্প পরিচালক ড. মোসা. আখতার জাহান কাঁকন জানিয়েছেন, হংকং, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও সৌদি আরবে বিভিন্ন জাতের মাশরুমের নমুনা পাঠানো হয়েছে। বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকেও ইতিবাচক সাড়া মিলেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশা, ২০৩০ থেকে ২০৩৩ সালের মধ্যে দেশের মাশরুম বাজারের বার্ষিক মূল্য ১১৫ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব।
এ ছাড়া শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ ভবনের ছাদে সৌর প্যানেলের নিচের জায়গা মাশরুম চাষে ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছেন। এতে একই জায়গায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও কৃষিকাজ-দুই সুবিধাই পাওয়া সম্ভব।
তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন উন্নত মানের স্পন, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, উপযুক্ত প্যাকেজিং, সংরক্ষণ এবং কার্যকর বিপণন ব্যবস্থা। এসব বাধা কাটাতে পারলেই দেশের মাশরুম খাত স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে পারে।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি