Print Date & Time : 08 November 2026 Sunday 08:04 pm

রূপগঞ্জের ৩০০ স্পটে চলছে মাদক কেনাবেচা, নিয়ন্ত্রণে ৩৫ সিন্ডিকেট

image

রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি: নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জের তিন শতাধিক স্পটে মাদক কেনাবেচা চলছে। কোনোভাবেই যেন বন্ধ করা যাচ্ছে না মাদক বিকিকিনি।

মাদক কারবারিরা এতই প্রভাবশালী যে, প্রতিবাদ করলেই হামলা, মামলার স্বীকার হতে হচ্ছে। তারাবো পৌরসভার উত্তর মাসাবো এলাকায় ছুটিতে গ্রামের বাড়ি এসে মাদকের ব্যবসার প্রতিবাদ করায় গত ৫ নভেম্বর রাতে মাদক কারবারিরা আবুল কালাম (৩৫) নামে এক পুলিশ কনস্টেবলের হাত-পা ভেঙে পায়ের রগ কেটে দিয়েছে।

এদিকে গত ছয় মাসে ৫ শতাধিক মাদক কারবারি ও সেবনকারীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

এ তালিকায় রূপগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবকদলের সদস্য সচিব আলী আহম্মেদের নাম রয়েছে। মাদক সেবনের অভিযোগে ডোপ টেস্ট করে তাকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। মাদকব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গত ১৫ মার্চ রূপগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক হুমায়ূন আহমেদ, সহকারী উপপরিদর্শক আহসানউল্লাহ ও নাদিরুল ইসলামকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

মাদকের স্পট

জানা গেছে, চনপাড়া পুনর্বাসনকেন্দ্রে মাদকের স্পট রয়েছে একশর বেশি। ৩২/৩৫টি সিন্ডিকেট এই স্পট নিয়ন্ত্রণ করে। গোলাকান্দাইল সাওঘাট এলাকার একটি পরিত্যক্ত ভবনের ভেতরে মাদক মজুত করা হয়। গোলাকান্দাইল ৫ নম্বর ক্যানেল এলাকা, গোলাকান্দাইল উত্তরপাড়া বালুরমাঠ, কালী মজলিসের বাগ, মুসলিমপাড়া কাঁঠালবাগান, ভুলতার মর্তুজাবাদ, ছোনাবো, তারাবো পৌরসভার হাটিপাড়া, নোয়াপাড়া, বরাবো, কায়েতপাড়া ইউনিয়নের নগরপাড়া, বাগবাড়ী, দেলপাড়া, নয়ামাটি, কামশাইর, বরুণা এলাকা রীতিমতো মাদকের ডিপো করা হয়েছে। গোয়ালপাড়া ও পূর্বাচল উপশহরেও মাদকের রমরমা বাণিজ্য চলছে।

রাতালদিয়া, সাওঘাট, পূর্ব দরিকান্দি, মাছিমপুর, রূপসী সুইসগেট, কালাদি, আতলাশপুর, হাটাবো টেকপাড়া, গন্ধর্বপুর, দক্ষিণ মাসাবোসহ আরও অনেক এলাকায় মাদকের ব্যবসা এখন জমজমাট। তারাবো দক্ষিণপাড়ার নবি হোসেন, নাজমুল, রাসেল, তারাবো উত্তরপাড়ার মানিক, রিফাত, বিল্লাল ও ইমন অবাধে মাদক ব্যবসা করে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

চনপাড়ায় যে মাদকের সিন্ডিকেট রয়েছে সেখানে কয়েকশ নারী রয়েছেন। কখনোই মাদকব্যবসায় ব্যবহার করা হচ্ছে বেদে বহর, কখনোই লবণবাহী সাম্পান, আবার কখনোই সিমেন্টের ক্লিংকারবাহী কার্গো জাহাজ।

হেরোইন, ইয়াবা, ফেন্সিডিলের পাশাপাশি স্কাফ, আইসপিল, টিডিজেসিক ও লুপিজেসিক ইঞ্জেকশনসহ নানা ধরণের মাদকদ্রব্যে হাতের নাগালেই মিলছে।

সরবরাহ যেভাবে

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাঁচপুর থেকে আধুরিয়া পর্যন্ত ছোট-বড় প্রায় ৭ শতাধিক শিল্পকারখানা রয়েছে। এসব শিল্পকারখানায় রয়েছে কয়েক লাখ শ্রমিক। এদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। তারা যে ছোট ছোট খুপরি ঘর কিংবা মেস ভাড়া করে বাস করেন সেখানে মাদকব্যবসায়ীরা ফেরি করে মাদকদ্রব্য সরবরাহ করছে।

সড়ক ও নৌপথে মাদকদ্রব্য আসে। মাদক প্রবেশের সবচেয়ে নিরাপদ রুট হচ্ছে বালু নদ। এ নদে পুলিশ টহলের ব্যবস্থা না থাকায় মাদকব্যবসায়ীরা নির্বিঘ্নে ইঞ্জিনচালিত ট্রলারযোগে মাদক নিয়ে আসে। এছাড়া শীতলক্ষ্যা নদীপথে পণ্যবাহী জাহাজে করে মাদক আসে রূপগঞ্জে। সেই সঙ্গে ঢাকা বাইপাস সড়ক দিয়ে বিভিন্ন যানবাহনে কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে মাদক আসে রূপগঞ্জে। কাঞ্চন সেতু থেকে পলখান পর্যন্ত সড়কের দুই পাশের কয়েকটি রেস্টুরেন্টে গাঁজার আসর বসে। বিশেষ করে ট্রাক চালকদের কেউ কেউ এ আসে অংশ নেন। আশুগঞ্জ-ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকেও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক হয়ে মাদক আসে। 

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভুলতা হচ্ছে মাদকের ট্রানজিট পয়েন্ট। আখাউড়া, কুমিল্লা, সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে মাদক বাস, নাইট কোচ, সংবাদপত্র বহনকারী মোটরসাইকেল কিংবা ট্রাকযোগে ঐ এলাকায় মাদক আসে।

অপরাধ

চনপাড়া বস্তিতে মাদকব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রায়ই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ঘটেছে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও। স্থানীয় প্রশাসন মাদকব্যবসা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছে। অভিযানের খবর পেয়ে মাদকব্যবসায়ীরা নিরাপদে চলে যায়। পুলিশের অভিযান ব্যর্থ হয়। মাদকব্যবসায়ীরা নানা কৌশলে মাদক বহন করে থাকেন। মাদক বহনের কাজে ব্যবহার করা হয় টোকাই ও শিশু-কিশোরদের। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশু, কিশোর ও মহিলাদের দিয়ে মাদক বহন করা হয়। মহিলাদের স্পর্শকাতর জায়গায় রেখে ইয়াবা, ফেন্সিডিল, হেরোইন ও গাঁজা বহন করা হয়। গত একযুগে নেশার কাজে বাধা দেওয়া ও প্রতিবাদ করায় ২০/২২ জন খুন হয়েছেন। 

নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব গোলাম ফারুক খোকন বলেন, মাদক নতুন প্রজন্মকে ধ্বংস করছে। মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে প্রত্যেককেই আরও সচেতন হতে হবে। প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে হবে। 

রূপগঞ্জ থানার ওসি এ এইচ এম সালাউদ্দিন বলেন, মাদকবিরোধী অভিযান নিয়মিত চলছে। রূপগঞ্জে অনেক দুর্গম ও চনপাড়া বস্তি এলাকাটা ঘিঞ্জি। টের পেয়ে পুলিশ ঢোকার আগেই মাদককারবারিরা নিরাপদে পালিয়ে যায়। 

নারায়ণগঞ্জ জেলা সহকারী পুলিশ সুপার মেহেদি ইসলাম বলেন, মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তারে পুলিশ তৎপর রয়েছে। মাদকব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গত ১৫ মার্চ রূপগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক হুমায়ূন আহমেদ, সহকারী উপপরিদর্শক আহসানউল্লাহ ও নাদিরুল ইসলামকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার এসএম আব্দুল্লাহ-বিন-শফিক বলেন, মাদকব্যবসা ও সেবন নির্মূলে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সভা সমাবেশ করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও কাজ করছে। গত একমাসে দেড় শতাধিক মাদক কারবারি ও সেবনকারীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে সফলতা আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভুঁইয়া দিপু বলেন, মাদকব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা যত প্রভাবশালীই হোক ছাড় দেওয়া হবে না। মাদকব্যবসায়ীদের সঙ্গে আমার কিংবা রূপগঞ্জ উপজেলা বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। নেতাকর্মীদের কেউ মাদকব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকলে দল থেকে বহিষ্কার করে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।

—জা. অর্থনীতি/এনজে