প্রযুক্তি ডেস্ক: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন এসেছে। আর এই পরিবর্তনের ধাক্কায় সিলিকন ভ্যালির শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো (বিগ টেক) এখন ফ্রন্ট রো বা সুবিধার আসন থেকে সরাসরি ‘হট সিট’ বা রাজনৈতিক জেরার মুখে পড়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের গত দুই বছর ধরে নানা সুবিধাজনক নীতি উপভোগ করা মেটা, ওপেনএআই এবং অ্যানথ্রপিকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ডেমোক্র্যাটদের কঠোর নজরদারির ঝুঁকিতে পড়েছে।
প্রযুক্তিভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম টেকক্রাঞ্চের এক বিশেষ প্রতিবেদনে মার্কিন রাজনীতি ও সিলিকন ভ্যালির এই নতুন দ্বন্দ্ব ও কৌশলগত পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত দুই বছর ধরে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলছিল সিলিকন ভ্যালির শীর্ষ নেতৃত্ব। হোয়াইট হাউজের নানা অনুষ্ঠান ও নীতি নির্ধারণে উপস্থিতি, নির্বাচনি তহবিলে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার অনুদান এবং ডাইভারসিটি কর্মসূচি কমানোর মাধ্যমে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হওয়ার প্রতিযোগিতা চলেছে। বিনিময়ে বিগ টেক প্রতিষ্ঠানগুলো কর ছাড়, কড়া এআই আইন স্থগিত রাখা এবং একের পর এক নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্ত এড়িয়ে যাওয়ার মতো বড় সুবিধা পেয়েছিল।
তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের ইঙ্গিত মিলতেই মোড় ঘোরাতে শুরু করেছে এই বহুজাতিক টেক কোম্পানিগুলো। ক্ষোভ সামাল দিতে এবং ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে মরিয়া হয়ে উঠেছে তারা। মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগেই ডেমোক্র্যাটিক সেনেট লিডার চাক শুমারের কন্যা জেসিকা শুমারকে উচ্চপদে নিয়োগ দিয়েছে ওপেনএআই। এর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের পরিবেশগত ক্ষোভ ও ভয় দূর করতে নিজেদের ডেটা সেন্টারগুলোকে এখন থেকে ‘কম্পিউট ক্যাম্পাস’ নামে ডাকার ঘোষণা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। একইভাবে মেটা চালু করেছে ‘আমেরিকাস ওয়ার্কফোর্স অ্যাকাডেমি’ এবং অ্যানথ্রপিক শুরু করেছে ‘ক্লড কোর’ উদ্যোগ।
মার্কিন অলাভজনক ভোক্তা অধিকার সংস্থা ‘পাবলিক সিটিজেন’-এর এআই নীতিবিষয়ক পরিচালক জে বি ব্রাঞ্চ বিষয়টিকে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাবমূর্তি রক্ষায় ‘পিআর ওয়াশিং’ বা সস্তা জনসংযোগ কৌশল বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, নির্বাচন সামনে রেখে নিজেদের গণতান্ত্রিক ও জনকল্যাণমুখী দেখাতে এই লবিস্ট নিয়োগ ও নাম পরিবর্তনের নাটক সাজানো হয়েছে।
এদিকে মেটার প্রেসিডেন্ট ডিনা পাওয়েল ম্যাককরমিক এক সাম্প্রতিক সম্মেলনে বলেছেন, ‘মার্কিন জনগণ যে সরকারকে নির্বাচিত করবে, তাদের সঙ্গেই কাজ করতে হবে। সুবিধা আদায় এবং নীতি নির্ধারণের জন্য দ্বিপাক্ষি সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি’।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, টেক জায়ান্টদের এই কৌশল কতটা সফল হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। গবেষণা সংস্থা ডেটা অ্যান্ড সোসাইটির গবেষণা পরিচালক অ্যালিস মারউইক মনে করেন, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এখন আর রাজনৈতিক মোড় ঘুরিয়ে আগের জায়গায় ফেরা সম্ভব নয়। জনগণ ও নির্বাচিত ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা এআই প্রযুক্তি এবং ডেটা সেন্টারের কারণে দৈনন্দিন জীবনের ক্ষতি নিয়ে বহু আগে থেকেই ক্ষুব্ধ।
নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আগামী দুই বছর ওয়াশিংটন ও রাজ্য পর্যায়গুলোতে এআই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাতের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন গত ডিসেম্বরে ‘এআই লিটিগেশন টাস্কফোর্স’ গঠন করে রাজ্যগুলোর নিজস্ব এআই আইন বা বিধিনিষেধ বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছিল। হোয়াইট হাউজ থেকে বলা হয়েছে, মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতির স্বার্থে এআই প্রযুক্তির অবাধ বিকাশ অব্যাহত রাখতে চান ট্রাম্প।
তবে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে আসা নতুন কংগ্রেসে এবার এআই-এর অবাধ বিস্তার ও ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরুদ্ধে একাধিক কঠোর বিল আনার প্রস্তুতি চলছে। বিশেষ করে স্থানীয় জনগণকে স্বস্তি দিতে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল, ডেটা সেন্টার তৈরি এবং তথ্য সুরক্ষার বিষয়ে আইনপ্রণেতারা কঠোর অবস্থান নিচ্ছেন। পলিটিক্যাল ক্যাম্পেইন বিশেষজ্ঞ আরিয়ান রঞ্জন বলেন, ‘কংগ্রেসের আগামী দুই বছরে সাধারণ মানুষের সরাসরি ক্ষোভ—যেমন বিদ্যুৎ বিল এবং স্থানীয় কর্মসংস্থানের ওপর ভিত্তি করেই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন আইনি ফ্রেমওয়ার্ক বা বিধিনিষেধ তৈরি হবে’।
এর পাশাপাশি এআই খাতের আর্থিক বাবল ফেটে যাওয়ার আশঙ্কাও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর পরই পুঁজিবাজারে প্রযুক্তি খাতে ট্রিলিয়ন ডলারের দরপতন ঘটেছে। ফলে অ্যানথ্রপিকের বহুল আলোচিত ট্রিলিয়ন ডলারের আইপিও এখন অনিশ্চয়তার মুখে। বিশ্লেষক জে বি ব্রাঞ্চ সতর্ক করে বলেছেন, ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন এআই খাতের আর্থিক সাফল্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। যদি এআই খাতের এই বিনিয়োগ বাবল ফেটে যায়, তবে ট্রাম্প প্রশাসনকেই সেই আর্থিক ধসের দায়িত্ব নিতে হবে।
ওয়াশিংটনে ক্ষমতার এই পটপরিবর্তন মার্কিন এআই ও প্রযুক্তি খাতের ভবিষ্যৎকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিল, যেখানে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হচ্ছে সিলিকন ভ্যালির জায়ান্টদের।