[ বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক। এর আগে তিনি ছিলেন ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ব্রাঞ্চ ক্যাম্পাসের ডেপুটি ভাইস চ্যান্সেলর। এছাড়া তিনি ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি ও ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে বিভাগীয় প্রধান ও অধ্যাপক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের অনুমোদনপ্রাপ্ত ১২ সদস্যের শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, বাজার ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্যসহ নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। ]
প্রশ্ন: বিগত দেড় দশকে রাজনীতি, আমলাতন্ত্র ও ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ‘নেক্সাস’ বা অশুভ আঁতাত গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। রাষ্ট্র যখন নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে পৃষ্ঠপোষকতা করে এবং সেই গোষ্ঠী সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে—এই ‘পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতি’ বা প্যাট্রনেজ ইকোনমিকে আপনি কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?
এ কে এনামুল হক: আমাদের সমাজ ও মনস্তাত্ত্বিক গঠনের একটি বড় দুর্বলতা হলো, আমরা দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিকে দেশের জন্য অপ্রয়োজনীয় মনে করে আসছি। আমরা সচেতনভাবেই মেধাবী ও ভালো ছাত্রদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছি। এটি আমাদের সামাজিক চেতনার দৈন্য। বাস্তবতা হলো, রাজনীতি দেশের অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
যখন আমরা মেধাবীদের বলছি যে ‘রাজনীতি তোমার জন্য নয়’, তখন সেই শূন্যস্থান পূরণ করছে এমন একদল মানুষ—যারা লোভী এবং যারা রাজনীতিকে কেবল জীবিকা ও বিত্তবৈভবের মাধ্যম হিসেবে দেখে। তাদের কাছে দেশ বা জনস্বার্থ গৌণ। গত ১৫ বছর শুধু নয়, গত ৪০ থেকে ৫০ বছরের ইতিহাসে তাকালে দেখবেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতি মেধাবী ও সৎ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এই শূন্যতার কারণেই বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যতক্ষণ না ভালো মানুষ রাজনীতিতে আসবে, ততক্ষণ এই অসুন্দর চর্চা ও অশুভ আঁতাত চলতেই থাকবে। রাজনীতি খারাপ কিছু নয়, এটি সবার জন্যই প্রয়োজনীয়—এই বোধ সমাজে জাগ্রত করা জরুরি।
প্রশ্ন: এই যে রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন বা ব্যবসায়ীকরণের কথা বলছেন, এতে কি অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে? বর্তমান কাঠামোকে আপনি কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন?
এ কে এনামুল হক: রাজনীতি যখন জনস্বার্থের বদলে নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটকে পৃষ্ঠপোষকতা করে, তখন অর্থনীতির ভারসাম্য নষ্ট হয়। গত ১৫ থেকে ১৬ বছরে আমরা দেখেছি, ব্যবসায়ীরা ক্রমান্বয়ে রাজনীতিবিদ হয়ে উঠেছেন। অতীতে সংসদে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ এমপি ছিলেন পুরোদস্তুর রাজনীতিবিদ, যারা হয়তো জীবিকার প্রয়োজনে খণ্ডকালীন ব্যবসা করতেন। আর এখন চিত্রটি উল্টো—মূলত ব্যবসায়ীরাই এখন এমপি।
রাজনীতি ও ব্যবসার এই মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়াকে পশ্চিমাদের ভাষায় ‘অলিগার্ক’ (Oligarch) বলা হয়। অনেকে একে ‘লুম্পেন রাজনীতি’ও বলে থাকেন। আমার মতে, এই গোষ্ঠীটিই এখন ক্ষমতার কেন্দ্রে। তবে ৫ আগস্টের পরিবর্তনের পর একটি ইতিবাচক দিক হলো, ব্যবসায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হচ্ছে। এতে তারা হয়তো অনুধাবন করবেন যে, দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখাই ব্যবসার জন্য শ্রেয়। ব্যবসায়ী যখন নিজেকে কোনো দলের নয়, বরং দেশের সম্পদ মনে করবেন, তখনই সুস্থ অর্থনীতির বিকাশ ঘটবে। আর যদি রাজনীতির প্রভাবে রাতারাতি বিত্তশালী হওয়ার সংস্কৃতি চালু থাকে, তবে অর্থনীতি বেপরোয়া হয়ে উঠবে এবং সম্পদ পাচারের প্রবণতা কমবে না।
প্রশ্ন: সম্পদ পাচারের প্রসঙ্গ যখন এল—বলা হয়ে থাকে ১/১১-এর পর থেকে অর্থ পাচার বেড়েছে, যার অন্যতম কারণ ভীতি। বর্তমানেও দুর্নীতির অভিযোগে অনেকের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই পদক্ষেপগুলো কি সঠিক, নাকি এর ফলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে যা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে?
এ কে এনামুল হক: ব্যবসায়ীরা যখন রাজনীতিতে সরাসরি জড়িয়ে পড়েন, তখন ক্ষমতার পালাবদলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে সমস্যা হলো, ফলে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নেই এমন সাধারণ ব্যবসায়ীরাও অনেক সময় ভুক্তভোগী হন।
অর্থনীতিতে ‘আস্থা’ একটি বড় বিষয়। ব্যবসায়ীরা যদি দেশে স্বস্তি না পান এবং সবসময় আতঙ্কে থাকেন যে সরকার যেকোনো সময় তাদের সম্পদ বা ব্যাংক হিসাব জব্দ করতে পারে, তবে আর্থিকভাবে সচ্ছল কেউই দেশে টাকা রাখতে চাইবেন না। টাকা তরল পদার্থের মতো, এটি কোন পথে বেরিয়ে যাবে তা আটকানো কঠিন। এই insegurity বা নিরাপত্তাহীনতা থেকেই মূলত অর্থ পাচার বাড়ে।
টাকা পাচারের একটি ভয়াবহ দিক হলো মুদ্রাস্ফীতি, যা অনেকেই খেয়াল করেন না। যখন কেউ দেশ থেকে ডলার পাচার করেন, তখন তিনি ডলার নিয়ে যান ঠিকই, কিন্তু সমপরিমাণ দেশীয় মুদ্রা (টাকা) তো দেশেই থেকে যায়। সেই টাকাটা আর ব্যাংকিং চ্যানেলে ফেরত আসে না, কালো টাকা হিসেবে বাইরে ঘুরপাক খায়। এদিকে ব্যাংকিং খাত সচল রাখতে এবং তারল্য সংকট কাটাতে সরকারকে নতুন করে টাকা ছাপাতে হয়। এর অর্থ হলো, একই পরিমাণ পণ্যের জন্য বাজারে দ্বিগুণ টাকা ঘুরছে। ফলে মুদ্রাস্ফীতি অনিবার্য হয়ে পড়ে।
আমার মতে, ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতার চেয়েও এখন বেশি জরুরি ‘গোপনীয়তা’ বা আইনি সুরক্ষা। আমার ব্যাংক হিসাব একান্তই ব্যক্তিগত। দুর্নীতি দমন কমিশন বা রাষ্ট্র যদি আমার হিসাব দেখতে চায়, তবে সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া বা আদালতের ওয়ারেন্ট থাকা উচিত—যেমনটা বাসায় তল্লাশির ক্ষেত্রে হয়। বর্তমানে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকার লেনদেন হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিপোর্ট হয়ে যাওয়ার যে নিয়ম, তাতে মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে ভয় পায়। ফলে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংকিং খাতের বাইরে থেকে যাচ্ছে। অর্থনীতিকে সচল ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে ব্যাংকিং খাতে এই আস্থার সংকট দূর করা এবং গ্রাহকের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
প্রশ্ন: সম্প্রতি অর্থের বিনিময়ে ফ্রিজ করা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সচল করা বা নতুন করে জব্দ করার অভিযোগ উঠছে। অর্থনীতির বিকাশের জন্য এটি কতটা সুখকর?
এ কে এনামুল হক: এটি অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে একটি অশনিসংকেত। এর পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবের পাশাপাশি কিছু অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করার বিষয়টিও জড়িত। সাধারণত দেশে কোনো বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি হলে গ্রেপ্তারের সংখ্যা বেড়ে যায়। অতীতে পুলিশ যা করত, এখন অন্যরাও সেই সুযোগ নিচ্ছে, যার ভুক্তভোগী হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো ব্যাংকিং খাতের ওপর আস্থার সংকট। যখন একজন আমানতকারী দেখেন যে ব্যাংকে টাকা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা ব্যবহার করতে পারছেন না, তখন ভবিষ্যতে তিনি আর ব্যাংকে টাকা রাখবেন না; বরং নিজের কাছে নগদ অর্থ গচ্ছিত রাখবেন। দিনশেষে এতে আমাদের ব্যাংকিং খাতই দুর্বল ও ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই ব্যাংকিং খাতে হস্তক্ষেপ করার আগে সরকারের অত্যন্ত সতর্ক হওয়া উচিত। সুনির্দিষ্ট অপরাধের প্রমাণ থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হোক, তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু বিনা দোষে বা ঠুনকো অজুহাতে কারও অর্থ আটকে রাখা দেশের অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী।
বিশ্বের কোনো দেশই সঠিক নিয়মকানুন ছাড়া অর্থনৈতিকভাবে দাঁড়াতে পারেনি। আমরা যদি আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে মধ্যম আয়ের বা উন্নত দেশে পরিণত হতে চাই, তবে নিয়মকানুন বা রেগুলেশনগুলো অবশ্যই ন্যায্য (Fair) হতে হবে। এটি সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠারই অংশ। আমরা যদি তা নিশ্চিত করতে না পারি, তবে যারা সৎভাবে উপার্জন করছেন, তারাও নিরাপত্তার অভাবে পুঁজি বিদেশে পাঠিয়ে দেবেন। দুর্নীতিবাজরা তো টাকা পাচার করবেই, কিন্তু সৎ ব্যবসায়ীরাও যদি দেশবিমুখ হন, তবে দেশের ক্ষতি দ্বিগুণ হবে।
একটি সহজ উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। আমাদের রাস্তার পাশে যেসব ভ্রাম্যমাণ দোকান বসে, সেখানে বিশাল ব্যবসা হয়। পরিচ্ছন্নতা ও অন্যান্য ‘খরচ’ বা চাঁদা বাবদ তাদের প্রতিদিন বড় অঙ্কের টাকা দিতে হয়। একজন দোকানদার হয়তো দিনে ২ হাজার টাকা চাঁদা দেন, অর্থাৎ মাসে প্রায় ৬০ হাজার টাকা শুধু ভাড়ার মতো খরচ হয়। অথচ দোকানটি তার নিজের। চিন্তা করুন, শুধু রাস্তায় বসার জন্য যদি এত টাকা খরচ করেও তিনি টিকে থাকেন, তবে তার প্রকৃত আয় নিশ্চয়ই অনেক বেশি। অর্থনীতির এই বিশাল অংশটি কিন্তু ব্যাংকিং চ্যানেলে আসছে না। কারণ আমাদের ব্যাংকিং খাত স্বচ্ছ নয় এবং তারা ভয়ে সেখানে টাকা রাখতে চান না। আমার মতে, এটিই প্রধান সমস্যা। ব্যাংকিং খাতকে গোছাতে না পারলে ব্যবসাগুলো বড় হতে পারবে না, আর ব্যাংক ও বড় ব্যবসা ছাড়া দেশের উন্নয়ন অসম্ভব।
প্রশ্ন: অর্থ পাচার বা ডলার বাইরে চলে যাওয়ার পেছনে শিক্ষা বা চিকিৎসার মতো কিছু যৌক্তিক কারণও রয়েছে। এ ধরনের পুঁজি পাচার রোধে কী ধরনের পদক্ষেপ বা নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
এ কে এনামুল হক: দেখুন, আমি যদি দেশের অর্থনীতির ওপর ভরসা রাখতে না পারি, তবে বিকল্প পথ খুঁজবই। বিষয়টি শুধু অর্থনীতির একার নয়, এটি জীবনের নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। ধরুন, আমি জানি অসুস্থ হলে আমাকে সিঙ্গাপুর বা ভারতে যেতে হবে। তখন আমি জীবনের প্রয়োজনে যেভাবেই হোক বিদেশে টাকা জমিয়ে রাখব বা নিয়ে যাব। কারণ আমার জীবনের চেয়ে টাকা বড় নয়। সুতরাং চিকিৎসার নামে অর্থ চলে যাওয়া ঠেকাতে হলে আগে দেশের অভ্যন্তরীণ চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফেরাতে হবে।
আরেকটি শ্রেণি আছে যারা দেশান্তরী হতে চায়। তারা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে এ দেশে তাদের বা তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নেই। ফলে তারা স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি বিক্রি করে টাকা বিদেশে নিয়ে যান। এদের অনেকেই দুর্নীতিগ্রস্ত নন, কিন্তু দেশের প্রতি আস্থার অভাবে তারা সম্পদ রাখতে চাইছেন না।
সুতরাং আমাদের মনে রাখতে হবে, দেশ থেকে টাকা পাচারের তিনটি প্রধান গ্রুপ আছে: ১. দুর্নীতিবাজ, ২. যারা দেশে টাকা রাখা নিরাপদ মনে করছেন না, এবং ৩. যারা স্থায়ীভাবে দেশত্যাগ করছেন। এর মূল কারণ হলো, সামগ্রিকভাবে দেশের প্রতি আস্থার সংকট। অর্থনৈতিক নীতিমালার মাধ্যমে যদি আমরা মানুষের মনে এই বিশ্বাস স্থাপন করতে না পারি যে, এ দেশই তাদের ভবিষ্যৎ এবং এখানেই তারা সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও সুবিধা পাবে—তবে পুঁজি পাচার রোধ করা কঠিন হবে।
প্রশ্ন: আপনি আস্থার সংকটের কথা বলছিলেন। বর্তমান তরুণ প্রজন্মের দেশ ছাড়ার প্রবণতা এবং সামাজিকভাবে দেশের নেতিবাচক উপস্থাপনা কি অর্থনীতিতে কোনো প্রভাব ফেলছে?
এ কে এনামুল হক: অবশ্যই। শুধু বাংলাদেশ নয়, ভুটানের মতো দেশেও এখন একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। আমাদের নতুন প্রজন্ম, বিশেষ করে ‘জেন-জি’ (Gen-Z), দেশে থাকতে চাইছে না। এর অন্যতম কারণ হলো, আমরা তাদের সামনে দেশটাকে সবসময় নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করছি। আমাদের মিডিয়া বা সামাজিক আলোচনায় সবসময় উঠে আসে—‘এ দেশের সবকিছু খারাপ, আর বিদেশের সবকিছু ভালো’।
তুলনা করলে দেখবেন, বিবিসি যখন সংবাদ প্রচার করে, তখন তারা তাদের দেশের নেতিবাচক দিকগুলো খুব একটা সামনে আনে না। অথচ আমরা সবসময় নিজেদের খারাপ দিকগুলোই বড় করে দেখাই। এই মানসিকতা পরিবর্তন করা জরুরি। দেশে যে অনেক ভালো কাজ হচ্ছে, সেগুলোও তুলে ধরা প্রয়োজন। এতে মানুষ ভরসা পাবে এবং মনে করবে, ‘না, আমিও এ দেশে থাকতে পারি।’
শিক্ষা খাতের দিকে তাকালে দেখবেন, প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী আমেরিকা বা মালয়েশিয়ায় যাচ্ছেন। একজন ছাত্রের টিউশন ফি বাবদ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা (যেমন আমেরিকায় পড়ার জন্য প্রায় ১ লাখ ডলার) দেশ থেকে চলে যাচ্ছে। আমরা যদি দেশে মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত না করে শুধু তাদের সমালোচনাই করি, তবে তা ন্যায়সঙ্গত হবে না।
সবশেষে আমি বলব, একটি ‘ন্যায়পরায়ণ সমাজ’ বা ‘ফেয়ার সোসাইটি’ গড়ে তোলা খুব জরুরি। বৈষম্যহীন সমাজ মানে এই নয় যে সবাই সমান ফলাফল পাবে। যেমন—শিক্ষক হিসেবে আমি কাউকে ‘এ’ গ্রেড দিই, কাউকে ‘সি’ দিই। যতক্ষণ পর্যন্ত মূল্যায়নটা স্বচ্ছ ও ন্যায্য থাকে, ছাত্ররা তা মেনে নেয়। কিন্তু যখনই সেখানে অবিচার হয়, তখনই ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সমাজে এই ‘ফেয়ারনেস’ বা ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে না পারলে মানুষ দেশবিমুখ হবে, যা অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ ফল বয়ে আনবে।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের অর্থনীতির ৮০ শতাংশের বেশি অনানুষ্ঠানিক খাত। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এই খাতটিকে কি যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে?
এ কে এনামুল হক: অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি বা ইনফরমাল ইকোনমি এখনও আমাদের দেশের কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি। এই খাত নিয়ে একটি প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা হলো, এটি জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয় না। এটি সঠিক নয়। অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি জিডিপির হিসাবে ঠিকই থাকে। যেটা থাকে না, তা হলো অবৈধ বা ‘ব্ল্যাক’ ইকোনমি—যদিও তারও কিছু অংশ জিডিপিতে ঢুকে যায়।
পরিসংখ্যান দেখলে বুঝবেন, আমাদের কৃষি খাত প্রায় ৪০ শতাংশ কর্মসংস্থান তৈরি করে এবং এটি পুরোটাই অনানুষ্ঠানিক। একইভাবে আমাদের দোকানপাট বা খুচরা ব্যবসা আরও ২০ শতাংশ কর্মসংস্থান দেয়, যা মূলত অনানুষ্ঠানিক। সব মিলিয়ে অর্থনীতির মাত্র ১৫ থেকে ২০ শতাংশ হলো আনুষ্ঠানিক বা ফরমাল খাত, বাকি পুরোটাই অনানুষ্ঠানিক।
নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে উচিত ছিল এই অনানুষ্ঠানিক খাতকে জোর করে বিধিনিষেধের বেড়াজালে বা ফরমাল কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা না করে, বরং তাদের কার্যক্রমকে সহজ বা মসৃণ (Lubricate) করা। একটি উদাহরণ দিই। আমি পরিবেশ নিয়ে কাজ করি, তাই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি টানি। আমাদের দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে বড় কোনো রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট হয়তো নেই, কিন্তু তাই বলে কি রিসাইক্লিং হচ্ছে না? অবশ্যই হচ্ছে। আমি যে পত্রিকাটা পড়ছি, তা ফেলে দেওয়া হচ্ছে না; বরং ঠোঙা বানানোসহ নানা কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু আমাদের মাথায় পশ্চিমা ধারণা ঢুকেছে যে, কাগজ থেকে আবার কাগজই বানাতে হবে। অথচ ঠোঙা বানানোও যে এক ধরনের রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহার, তা আমরা আমলে নিচ্ছি না।
সমস্যা হলো, যারা ঠোঙা বানায় বা ছোট ব্যবসা করেন, তারা ব্যবসা বড় করার জন্য ব্যাংকের ঋণ পান না। কারণ ব্যাংক তাদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় না। আমাদের এই মানসিকতা বদলাতে হবে। অনানুষ্ঠানিক খাতকে তাদের মতো করেই বড় হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ক্ষুদ্রঋণ বা মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন ব্র্যাক ব্যাংক) ভালো ভূমিকা রাখছে। ‘সবকিছুকেই আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে এনে অর্থনীতি বড় করতে হবে’—এই ধারণার সঙ্গে আমি একমত নই।
প্রশ্ন: সম্প্রতি পুরো দক্ষিণ এশিয়াজুড়েই তরুণদের মধ্যে এক ধরনের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর মূল কারণ কী বলে মনে করেন?
এ কে এনামুল হক: আমার পর্যবেক্ষণে, এই সমাজগুলোতে স্বচ্ছতা বা ট্রান্সপারেন্সির অভাবই এর মূল কারণ। বর্তমান জেন-জি (Gen-Z) প্রজন্মের প্রধান দাবিই হলো স্বচ্ছতা। তাদের প্রশ্ন—‘আমি যা বলতে চাই, তা বলতে পারছি না কেন?’ নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনার দিকে তাকালে দেখবেন, সেখানে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার কারণেই ক্ষোভ বেড়েছে। আমাদের বুঝতে হবে, তরুণরা কথা বলতে চায়। যখনই আমরা তাদের আটকাতে যাই, তখনই তারা বিদ্রোহ করে।
এটি সামাল দেওয়ার দুটি উপায় আছে। এক, নিজের দেশে তাদের কথা বলার বা মত প্রকাশের নিজস্ব ও কার্যকর ব্যবস্থা রাখা। দুই, রাষ্ট্র ও সমাজে পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রাখা, যাতে কেউ প্রশ্ন করলে সঠিক উত্তর পায়। যদি আমরা সমাজে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে না পারি, তবে তরুণ প্রজন্ম স্বস্তি (Comfort) পাবে না। আর তারা স্বস্তি না পেলে তা দেশের জন্য ক্ষতিকর।
জেন-জির এই আন্দোলন মূলত সমাজে ন্যায়বিচার বা ‘ফেয়ারনেস’-এর অভাব থেকে উৎসারিত। দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে আমাদের দেশের গণতন্ত্র বা নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে তাদের মনে প্রশ্ন আছে। যখন তারা দেখে যে সমাজে স্বচ্ছতা নেই এবং ভালো মানুষের মূল্যায়িত হওয়ার সুযোগ কম, তখন তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়।
তরুণ প্রজন্মের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, তারা সমাজকে এক ধরনের ইউটোপিয়ান (অতি-আদর্শিক) দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে। আমাদের বয়সে আমরা বাস্তবতা বিচার করে দেখি কোনটা সম্ভব আর কোনটা নয়। কিন্তু তারা তুলনা করে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে। তারা দেখছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের সমালোচনা করা যায়, কিন্তু আমাদের দেশে সামান্য কিছু বললেই রাষ্ট্রদ্রোহী হওয়ার ভয় থাকে। ইন্টারনেটের কারণে এই বৈষম্যগুলো এখন তাদের চোখের সামনে পরিষ্কার। তাই তাদের প্রতিবাদ করাটাই স্বাভাবিক। রাষ্ট্র যদি এসব বিষয় গুছিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে না পারে, তবে এমন অস্থিরতা বাড়তেই থাকবে।
প্রশ্ন: আয় ও সম্পদের বৈষম্য থেকেই কি এ ধরনের প্রতিবাদের প্রবণতা বাড়ছে, নাকি কর্মসংস্থানহীনতা এর প্রধান কারণ?
এ কে এনামুল হক: বিদ্রোহ বা প্রতিবাদ একেবারে বন্ধ করা সম্ভব নয়, তবে বৈষম্য কমিয়ে আনা জরুরি। কিন্তু বৈষম্য কমানোর নামে ভুল পথে হাঁটা যাবে না। চুরির শাস্তি হিসেবে যেমন হাত কেটে ফেলা সমাধান নয়, তেমনি ধনীদের ঢালাওভাবে শাস্তি দিয়ে বা তাদের সম্পদ কেড়ে নিয়ে সবার মধ্যে বিলিয়ে দিলে দারিদ্র্য কমবে না; বরং আমরা সবাই মিলে তখন ‘গরিবানা’ ভাগ করে নেব।
আমাদের মনে রাখতে হবে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। যারা এই প্রবৃদ্ধি ঘটাচ্ছেন, তারা যদি দেশে নিরাপদ বোধ না করেন, তবে তারা সম্পদ বিদেশে সরিয়ে নেবেন। এতে কর্মসংস্থান কমবে। তাই সমাধান হলো—ধনী বা বিত্তশালীদের করের (Tax) আওতায় আনা এবং কর ব্যবস্থা স্বচ্ছ করা।
চীন তাদের কর ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এনেছে। তারা ধনীদের ওপর কর বাড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু বিনিময়ে তাদের ‘স্বস্তি’বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। অর্থাৎ, রাষ্ট্র বলছে—‘তুমি সঠিক নিয়মে ট্যাক্স দাও, তোমার সম্পদে কেউ হাত দেবে না, তুমি ন্যায়বিচার পাবে।’আমাদেরও এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না করলে ধনীরা টাকা পাচার করবে, দেশে বিনিয়োগ হবে না, আর তাতে বৈষম্য ও অসন্তোষ—দুটোই বাড়বে।
প্রশ্ন: ব্যবসার পরিবেশ সহজ করার ক্ষেত্রে আমাদের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা লাইসেন্স প্রথা কতটা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে?
এ কে এনামুল হক: আমরা অর্থনৈতিক নিয়মগুলোকে এখনও ন্যায্য বা সহজ করতে পারিনি। এর বড় উদাহরণ হলো আমাদের ‘লাইসেন্স রাজ’বা লাইসেন্স প্রথা। অর্থনীতির ভাষায় আমরা একে বলি ‘মনোপলি রেন্ট (Monopoly Rent)। যেকোনো কাজের জন্যই আমাদের দেশে লাইসেন্স নিতে হয়। অথচ এর যৌক্তিকতা কতটুকু?
আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে যে চায়ের দোকানদার চা বিক্রি করেন, তার কোনো লাইসেন্স নেই। তিনি উল্টো তার বন্ধুকে ডেকে এনে ব্যবসা করতে বলেন। এতে কি ক্ষতি হচ্ছে? অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চাইলে লাইসেন্স প্রথা শিথিল করতে হবে। লাইসেন্স কেবল তখনই জরুরি, যখন জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি থাকে—যেমন ড্রাগ বা লিকার (মদ) বিক্রির ক্ষেত্রে। কিন্তু রিকশা চালাতেও কেন লাইসেন্স লাগবে?
লাইসেন্স নবায়নের নামে প্রতিবছর সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হয়, যা দুর্নীতির জন্ম দেয়। আপনি যদি রাজস্ব বাড়াতে চান, তবে পদ্ধতি সহজ করুন। যেমন টেলিভিশনের লাইসেন্স ফি এখন একবারেই (১০ বছরের জন্য) নিয়ে নেওয়া হয়। গাড়ির বা রিকশার ক্ষেত্রেও এমনটা করা উচিত—একবার ফি দিয়ে আজীবনের বা দীর্ঘমেয়াদি অনুমতি দেওয়া হোক। ট্যাক্স বা ফি আদায়ের নামে মানুষকে হেনস্তা করার যে ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, তা বাতিল করে ব্যবসার পথ সহজ করতে হবে। এতে মানুষের আয় বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং সরকারও তার প্রাপ্য রাজস্ব পাবে।
—————————