জাতীয় ঐক্যকে বিভক্ত করা উচিত হবে না (২)

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, নির্বাহী চেয়ারম্যান, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন জাতীয় অর্থনীতি’র সঙ্গে।

[গতকাল প্রকাশিত সাক্ষাৎকারের বাকি অংশ]

জাতীয় অর্থনীতি: বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবসময় আস্থার সংকট দেখা যায়। এখনও কি সেই সংকট বিদ্যমান?  আমরা পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেখছি। এক পক্ষ বলছে নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে অন্য পক্ষ ক্ষমতায় আসবে; জামায়াত বা বিএনপির মতো দলগুলো আগে থেকেই প্রতিপক্ষকে ইঙ্গিত করে বক্তব্য দিচ্ছে। এই যে আগে থেকেই ফলাফলের বিষয়ে মন্তব্য করার প্রবণতা বা এমন পরিস্থিতি তৈরি করা-এ বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

হোসেন জিল্লুর রহমান: এই ধরনের বক্তব্য নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। তবে আমি মনে করি, এই সংস্কৃতির পরিবর্তন হতে অনেক সময় লাগবে। প্রতিযোগিতার ভাষা অনেক সময় আক্রমণাত্মক হয়। কিন্তু আমাদের কাম্য হলো, এই আক্রমণাত্মক মনোভাব যেন কেবল ভাষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, মাঠ পর্যায়ে সহিংসতায় রূপ না নেয়। আপনি আস্থার কথা বললেন। আসলে একে অপরের প্রতি আস্থার চেয়েও ‘নিয়মের প্রতি আস্থা’ থাকাটা বেশি জরুরি। সবাই যেন মেনে নেয় যে, নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। ‘আমার জন্য শিথিল হোক, অন্যের জন্য নয়’-এই মানসিকতা পরিহার করতে হবে। বাংলাদেশে শুরু থেকেই আমরা ‘খেলার নিয়ম’ বা ‘রুলস অব দ্য গেম’-এর বিষয়ে ঐকমত্য তৈরিতে হোঁচট খেয়েছি। এর জন্যই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা এসেছিল। জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে এই আকাঙ্ক্ষা আরও প্রবল হয়েছে যে, বেশ কিছু মৌলিক বিষয়ে আমাদের ঐকমত্য প্রয়োজন।

প্রতিযোগিতা থাকবেই এবং তা কাম্য, কারণ এতে মানুষের বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা থাকে। যোগ্য প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার জন্য ভালো বিকল্প থাকা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে আমাদের এখনও বহুদূর যেতে হবে। তবে যে জায়গায় আমাদের সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া দরকার, তা হলো নিয়মগুলোর ব্যাপারে ঐকমত্য শিথিল না করা। সব দলকে এই অবস্থানে শক্ত থাকতে হবে। নিয়ম যদি আমার বিপরীতে যায়, আর আমি তা নিয়ে আন্দোলন শুরু করি-এটা মোটেও কাম্য নয়।

জাতীয় অর্থনীতি: এবার নির্বাচন কমিশনের প্রসঙ্গে আসি। সব মিলিয়ে আপনার কি মনে হয় নির্বাচন কমিশন তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পেরেছে, নাকি
তাদের কাজের মধ্যে আপনি কোনো ঘাটতি দেখছেন?

হোসেন জিল্লুর রহমান: দেখুন, নির্বাচন কমিশনের অনেক দায়িত্ব রয়েছে। এর মধ্যে আমি লক্ষ করেছি যে, তারা ডিজিটাল বিষয়গুলো মোটামুটি গুছিয়ে এনেছিল। ‘স্মার্ট ইলেকশন’ নামে একটি অ্যাপ তারা চালু করেছিল, যা বেশ কার্যকর বলে শোনা গেছে। সুতরাং এদিক থেকে প্রস্তুতি ভালোই। পোস্টাল ব্যালটের বিষয়ে কিছু বিচ্যুতির কথা শুনলেও, সামগ্রিকভাবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন। কেন্দ্রগুলোতে নির্বাচনি সরঞ্জাম পাঠানোসহ অন্যান্য কাজও ভালোভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। তবে আমাদের নির্বাচন কমিশনের একটি দুর্বলতা বা ঘাটতি হয়তো যোগাযোগের ক্ষেত্রে রয়ে গেছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা জানানোর বিষয়ে তারা যেন কিছুটা নড়বড়ে, হয়তো কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে আবার তা পাল্টে ফেলছেন, কিংবা চাপের মুখে পরিবর্তন করছেন। এসব জায়গায় তাদের আরও দৃঢ় হওয়া দরকার ছিল।
আমাদের মতো দেশে নির্বাচন কমিশনকে অনেক শক্তি বা ক্ষমতা দেওয়া আছে। কিন্তু আমরা দেখি, সেখানে দুটি সমস্যা হতে পারে- হয় ক্ষমতার অপব্যবহার, নয়তো আমি যেটাকে বলি ‘স্বেচ্ছায়
নিষ্ক্রিয়তা’। অর্থাৎ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও চুপচাপ হাত গুটিয়ে বসে থাকা এবং কিছু না করা। নির্বাচন কমিশনের উচিত এই স্বেচ্ছায় নিষ্ক্রিয়তা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার উভয় থেকেই মুক্ত হয়ে কাজ করা। নির্বাচন প্রক্রিয়াটিতো এই পর্যন্ত চলে এসেছে এবং আমরা তুলনামূলকভাবে সংঘাতহীনভাবেই এতদূর এসেছি। নির্বাচন কমিশন এ পর্যন্ত আসার সুনামটুকু অর্জন করেছেন। সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সেই সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টাই তারা করেছেন।

জাতীয় অর্থনীতি: আরেকটি প্রশ্ন করতে চাই-নতুন যে সরকার ক্ষমতায় এলো, তাদের আসলে কোন দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?

হোসেন জিল্লুর রহমান: সরকার গঠনের পরেই অনেক কিছু নির্ধারিত হবে, তবে একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তা হলো, জাতীয় ঐক্যকে আর ছিন্নভিন্ন করা একদমই উচিত হবে না। বরং জাতীয় ঐক্যকে কীভাবে আরও সংহত করা যায়, সেদিকে সচেষ্ট থাকতে হবে। কারণ আমরা যদি ‘সাংস্কৃতিক সংঘাত’ শুরু করি কিংবা যেটুকু সহনশীলতা অর্জন করেছি তা বিসর্জন দিই, তবে আমরা বড় বিপদে পড়তে পারি। তাই জাতীয় ঐক্যের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। অবশ্য জাতীয় ঐক্য বলতে আমি ‘জাতীয় সরকার’ বোঝাচ্ছি না; আমি বোঝাচ্ছি মানুষের মধ্যে যেন নতুন করে বিভাজন তৈরি না করা হয়, বরং তাদের একত্রিত করা হয়।

দ্বিতীয় জরুরি বিষয়টি হলো অর্থনীতি, যা বর্তমানে বেশ দুরবস্থায় আছে। রিজার্ভ বাড়া বা রেমিট্যান্স আসা দিয়ে অর্থনীতির মূল চিত্রটা পুরোপুরি বোঝা যাচ্ছে না। আপনারা দেখেছেন কর্মসংস্থানের অবস্থা কী। মূল্যস্ফীতিও কমছে না, বরং স্থির হয়ে আছে; বিনিয়োগও স্থবির। অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধাগুলো কিন্তু স্থির হয়ে থাকে না; আমরা গ্রহণ না করলে অন্য কেউ নিয়ে নেবে। এটি বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতার বিষয়। প্রতিযোগী হিসেবে আমরা দক্ষ ও সক্ষমভাবে এগোতে পারছি কি না, সেটাই দেখার বিষয়। অর্থনীতির চাকাকে সচল করতে হবে। অনেক ঘোষণা দেওয়া যেতে পারে, এত চাকরি বা কর্মসংস্থান হবে। কিন্তু বাস্তবে সেগুলো কীভাবে অর্জিত হবে, সেই অনুধাবনটা খুব জরুরি।সেজন্য আমি মনে করি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার, বিশেষ করে ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এক দশকে যে অর্থনৈতিক শাসন বা প্রবৃদ্ধির মডেল দাঁড় করিয়েছিল, তা অনেকাংশে এখনও অক্ষুণ্ণ আছে। আমরা ঋণনির্ভরতা কমাতে পারিনি। অন্তবর্তীকালীন সরকারও বিভিন্ন বাজেট সহায়তা নিয়েছে, যা ঋণনির্ভরতার ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে ব্যয় দক্ষতা বা এডিপি (ADP) বাস্তবায়নের হারও বাড়ানো যায়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও এ ক্ষেত্রে আমরা যেন উল্টো পথেই হেঁটেছি। দুর্নীতিও জোরালোভাবে কমানো সম্ভব হয়নি। হয়তো দৃশ্যমান। শ্যমান কিছু দুর্নীতি কমেছে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কালো ছায়া সর্বত্র রয়ে গেছে। দুর্নীতি কীভাবে মূলোৎপাটন করা যাবে, সে বিষয়ে একটি মহাপরিকল্পনা জাতির সামনে তুলে ধরা সংস্কার কমিশনগুলোর দায়িত্ব ছিল। এই জায়গাটিতে নজর দেওয়া খুবই জরুরি।আরেকটি বিষয় হলো ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল’ বা মানবসম্পদ। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত সঙ্গিন অবস্থায় আছে। অবকাঠামো ও প্রকল্প বাড়লেও শিক্ষার মান এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হচ্ছে না শিক্ষার বিস্তার ঘটছে ঠিকই, কিন্তু মানবসম্পদ গড়ে উঠছে না। এই নেতিবাচক সমীকরণটি ভাঙা খুব জরুরি। আগামী সরকারের কাছে আমার প্রত্যাশা থাকবে এ বিষয়ে কাজ করার। পাশাপাশি, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বিশ্ব পরিবেশ অনুধাবন করা এবং সজাগ দৃষ্টি রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘স্থায়ী বন্ধু’ বলে কিছু নেই; আমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী বন্ধু নির্বাচন করতে হবে এবং সময়ের সঙ্গে তা পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।সবশেষে একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই, যা নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কথা বলেছে এবং আমিও দীর্ঘদিন ধরে বলার চেষ্টা করছি। তা হলো আমাদের ‘স্টাইল অব গভার্নেন্স’ বা আমলাতান্ত্রিক শাসনপদ্ধতির বড় ধরনের পরিবর্তন দরকার। এটি সহজ কাজ নয় এবং কোনো একটি প্রজেক্ট দিয়ে এটি হবে না। আপনারা যেমন রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন করেন, তেমনি প্রশাসনিক সংস্কৃতির পরিবর্তনকেও নির্বাচিত সরকারের সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।