বিনোদন প্রতিবেদক: ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ঘটনার আলোকচিত্র ধারণের জন্য প্রশংসিত ভারতের কিংবদন্তি আলোকচিত্রী রঘু রাই আর নেই। রোববার (২৬ এপ্রিল) দিল্লির একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তাঁর ছেলে আলোকচিত্রী নিতিন রাই বাবা রঘু রাইয়ের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। খবর হিন্দুস্তান টাইমসের।
নিতিন রাই জানান, গত দুই বছর ধরে তিনি ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন। প্রথমে প্রোস্টেট ক্যানসার শনাক্ত হলেও তা নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে পেটে ছড়িয়ে পড়লে সেটিও চিকিৎসায় সেরে ওঠেন। তবে, সম্প্রতি ক্যানসার মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ায় অবস্থার অবনতি ঘটে, পাশাপাশি বয়সজনিত জটিলতাও বাড়ে।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিদেশি আলোকচিত্রীদের মধ্যে রঘু রাই ছিলেন প্রথম সারির। ভারতের ‘দ্য স্টেটমেন্ট’ পত্রিকার প্রধান আলোকচিত্র সাংবাদিক হিসেবে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের আশ্রয়শিবির ঘুরে ঘুরে উদ্বাস্তু বাংলাদেশিদের অবর্ণনীয় কষ্টের জীবনযাত্রা তুলে ধরেন তাঁর ক্যামেরায়।
পাশাপাশি রঘু রাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশে প্রবেশ করে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যক্ষ যুদ্ধের দৃশ্য, চূড়ান্ত বিজয়ের পর বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধাদের দেশে ফেরা ও পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দৃশ্য তাঁর ক্যামেরায় ধারণ করেছিলেন।
রঘু রাইয়ের তোলা ছবিগুলো একদিকে যেমন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল হয়ে আছে, তেমনি সেগুলো ব্যক্তিগতভাবে তাঁকেও আলোকচিত্রী হিসেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দিয়েছে।
প্রসঙ্গত, রঘু রাই দুই বছর ধরে প্রোস্টেট ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন বলে জানান তাঁর ছেলে আলোকচিত্রী নীতিন রাই। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাবার প্রোস্টেট ক্যানসার ধরা পড়ে দুই বছর আগে। তবে, তিনি সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। এরপর তা পাকস্থলিতে ছড়িয়ে পড়ে, সেটিও নিরাময় করা হয়। সম্প্রতি ক্যানসার তাঁর মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে। পরে বয়সজনিত কিছু সমস্যাও দেখা দেয়।’
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভারতীয় সময় রোববার বিকেল চারটায় নয়াদিল্লিতে রঘু রাইয়ের শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হবে।
রঘু রাইয়ের জন্ম ১৯৪২ সালে, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাবের ঝাংয়ে (বর্তমানে পাকিস্তানে)। তিনি ১৯৬২ সালে তাঁর বড় ভাই আলোকচিত্রী এস পলের কাছে আলোকচিত্রের শিক্ষা গ্রহণ শুরু করেন।
অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়জুড়ে বিস্তৃত ছিল তার সমৃদ্ধ কর্মজীবন। পেশাগত জীবনের শুরুতে তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হলেও আলোকচিত্রকেই নিজের প্রধান পেশা হিসেবে বেছে নেন। মাত্র ২৩ বছর বয়সে বড় ভাইয়ের মাধ্যমে ক্যামেরার সঙ্গে তার পরিচয়। এরপর ধীরে ধীরে তিনি একজন খ্যাতিমান ফটোসাংবাদিক ও সম্পাদক হিসেবে পরিচিতি পান।
১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে রঘু রাই তাঁর পেশাদার জীবন শুরু করেন। তিনি ১৯৬৫ সালে নয়াদিল্লিতে ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় আলোকচিত্রী হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তী সময় তিনি ইন্ডিয়া টুডেসহ অন্য পত্রিকায়ও কাজ করেন।
রঘু রাই পেশাগত জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ছবি তোলেন। এর মধ্যে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্র অন্যতম। তা ছাড়া তিনি ইন্দিরা গান্ধী, মাদার তেরেসা, দালাই লামা, সত্যজিৎ রায়সহ অনেক আলোচিত–খ্যাতিমান ব্যক্তির আলোকচিত্র তুলেছেন।
১৯৭২ সালে ভারত সরকার রঘু রাইকে দেশটির চতুর্থ সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় বেসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’ প্রদান করে। ১৯৭১ সালের যুদ্ধ, বাংলাদেশি শরণার্থীদের দুর্দশা, পাকিস্তানের আত্মসমর্পণ নিয়ে অনবদ্য কাজের জন্য তাঁকে এই সম্মান দেওয়া হয়।
রঘু রাই দীর্ঘ কর্মজীবনে ১৮টির বেশি বই প্রকাশ করেন। তাঁর কাজ টাইম, লাইফ, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, নিউজউইক, দ্য নিউ ইয়র্কার-এর মতো শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
রঘু রাইয়ের প্রয়াণে ভারতসহ বিশ্ব আলোকচিত্র ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তার এই চলে যাওয়া দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিকতা ও আলোকচিত্র জগতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
—জা. অর্থনীতি/এনএ