বিচ্ছেদ যখন অনিবার্য হয়ে যায়

বিয়ে একটি পবিত্র বন্ধন যা প্রশান্তি ও ভালোবাসার প্রতীক। কিন্তু জীবনের জটিল সমীকরণে কখনও কখনও এই বন্ধন তাসের ঘরের মতো ভেঙে যায়। ইসলামে বিচ্ছেদ বা তালাককে বৈধ করা হয়েছে কেবল চরম নিরুপায় অবস্থায়, তবে এর আগেও রয়েছে অনেক ধাপ এবং পরেও রয়েছে সুনির্দিষ্ট কিছু অধিকার ও দায়িত্ব। একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে বিবাহবিচ্ছেদের এই নিয়মগুলো জানা আমাদের সবার জন্য জরুরি।

১. তালাকের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে করণীয়

বিচ্ছেদের পথে হাঁটার আগে ইসলাম কিছু সংশোধনমূলক পদক্ষেপের কথা বলে:

ছোটখাটো ভুল বা মতের অমিল থেকে জেদ ধরে বসে থাকা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ক্ষমা করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন (সহিহ মুসলিম)। একে অপরের ভুলগুলো বড় করে না দেখে সহনশীল হওয়াই ইসলামের প্রথম শিক্ষা।

নিজেদের ভেতর সমস্যার সমাধান না হলে দুই পরিবারের মুরুব্বি বা বিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে সালিস বৈঠক করা উচিত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা সুরা নিসায় নির্দেশ দিয়েছেন যেন উভয় পক্ষ থেকে সালিস নিয়োগ করে মীমাংসার চেষ্টা করা হয়।

যদি বিচ্ছেদ একান্তই অপরিহার্য হয়ে পড়ে, তবে হুটহাট তিন তালাক না দিয়ে সুন্নাহ পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত। ইসলামি বিধান মতে, স্ত্রীর পবিত্র অবস্থায় (যেখানে মিলন হয়নি) একটি করে তালাক দিয়ে অপেক্ষা করা উত্তম, যাতে ফিরে আসার পথ খোলা থাকে।

 ২. বিচ্ছেদ-পরবর্তী জরুরি পদক্ষেপ

তালাক হয়ে যাওয়ার পর স্বামী ও স্ত্রী উভয়েরই কিছু ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব পালন করতে হয়:

তালাকপ্রাপ্ত নারীর জন্য ইদ্দত পালন করা ওয়াজিব। সাধারণত এটি তিনটি মাসিক চক্র পর্যন্ত স্থায়ী হয়। তবে নারী গর্ভবতী হলে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত এই সময়কাল বহাল থাকে। এটি মূলত বংশধারা নিশ্চিত করার একটি প্রক্রিয়া।

ইদ্দতকালীন সময়ে স্ত্রীর থাকার জায়গা এবং জীবনযাত্রার যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করা প্রাক্তন স্বামীর দায়িত্ব। এটি কোনো করুণা নয়, বরং নারীর শরিয়তসম্মত অধিকার।

দেনমোহর স্ত্রীর পাওনা হক। বিচ্ছেদের সময় যদি দেনমোহর বাকি থাকে, তবে তা অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে। পবিত্র কুরআনে সন্তুষ্টচিত্তে দেনমোহর আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সম্পর্ক শেষ মানেই শত্রুতা নয়। বিচ্ছেদের পরও একে অপরের প্রতি কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য বা সম্মানহানি করা ইসলাম সমর্থন করে না। বিচ্ছেদ হতে হবে সুন্দর ও মার্জিত প্রক্রিয়ায়।

 ৩. সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও প্রতিপালন

তালাকের পর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয় সন্তানরা। তাদের অধিকার সুরক্ষায় ইসলামের নির্দেশনা স্পষ্ট। সাধারণত পুত্রসন্তান ৭ বছর এবং কন্যাসন্তান ৯ বছর বয়স পর্যন্ত মায়ের নিবিড় মমতায় লালিত-পালিত হবে। এই সময়কাল অতিক্রম করলে তারা পিতার অভিভাবকত্বে ফিরে যাবে।

সন্তান যার কাছেই থাকুক না কেন, তাদের খাওয়া-পরা ও শিক্ষার যাবতীয় খরচ পিতাকেই বহন করতে হবে। এটি সন্তানের অধিকার এবং পিতার আবশ্যিক দায়িত্ব।

জীবন সবসময় আমাদের মনের মতো চলে না। বিচ্ছেদ বেদনাদায়ক হলেও যদি তা অনিবার্য হয়, তবে ইসলামের দেওয়া এই মানবিক ও ন্যায়সংগত নীতিমালা অনুসরণ করা উচিত। এতে কেবল পরকালীন মুক্তিই নয়, বরং ইহকালেও অনেক সামাজিক ও আইনি জটিলতা থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

 

 জা. অর্থনীতি/ উমর