বিনোদন ডেস্ক: ভারতে অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে নানা প্রার্থীর জয়-পরজয়ে রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচনায় ছিল তারকাদের অংশগ্রহণ। এর মধ্যে দেশটির তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে বড় চমক দেখিয়েছেন দক্ষিণী তারকা থালাপতি বিজয়। কীভাবে তিনি শূন্য থেকে শুরু করে জয়ী হয়ে এখন মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার তালিকায়, সে আলোচনা এখন সবখানে।
সালটা ছিল ২০১৮। তখন মুক্তি পেয়েছিল থালাপতি বিজয়ের সিনেমা ‘সরকার’। সেই সিনেমাতে বিজয়কে রাজনৈতিক চরিত্রে দেখা যায়। সিনেমায় তিনি তামিলনাড়ুর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়ে জিতে যান। আর এখন ২০২৬ সাল। আট বছরের ব্যবধানে সিনেমার সেই ঘটনাই যেন বাস্তবে ফিরে এলো।
সিনেমার মতো দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিও উত্তরের চেয়ে অনেক পৃথক ধাঁচের। তারকানির্ভরতা তামিল, তেলেগু, মালয়ালম সিনেমার চিরচেনা বৈশিষ্ট্য। ঠিক তার মতোই তামিল রাজনীতিরও একটি ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য—সিনেমার তারকারা এখানে একপর্যায়ে রাজনীতিতে নামেন এবং ভোটের রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে মাত করেন। প্রতিপক্ষের প্রার্থীরাও অনেক সময় সিনেমাজগতের মানুষ হয়ে থাকেন। ফলে, বহুকাল ধরে তামিলভাষীদের রাজনীতি অনেকটা সিনেমার হিরো-ভিলেন সমীকরণের মতো চলছে। এ রকম এক ঐতিহ্যের মধ্যেই নতুন তারকা হিসেবে নিজেকে তামিল সমাজে ‘ভাইরাল’ করেছেন থালাপতি বিজয়। তাঁর কথাবার্তা মনোযোগ কাড়ছে বাংলাদেশের দর্শকদেরও।
পর্দায় থালাপতি বিজয় ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করা এক গণনায়ক। সিনেমায় তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো সাধারণ মানুষের হয়ে লড়াই করে। এই ইমেজ তাঁকে দর্শকদের কাছে আলাদা জায়গা দিয়েছে। বিপুল জনপ্রিয়তা তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সব সময়। তবে রাজনীতির ময়দানে পা রেখেই বিজয়ের অভূতপূর্ব সাফল্যের পেছনে সেটাই একমাত্র কারণ নয়। এর পেছনে কাজ করেছে তাঁর কৌশলী ভাবনা, সাংগঠনিক ক্ষমতা, জনসংযোগের কৌশল আর সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। বিজয়ের এই উত্থানের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ও কৌশলের কথা উল্লেখ করেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো।
ভোটের লড়াইয়ে নবাগত হলেও বিজয় তৃণমূল স্তরের কাজটা শুরু করেছিলেন ২০০৯ সালে। ভক্তদের সংগঠিত করে বিভিন্ন অঞ্চলে তৈরি করেন ফ্যান ক্লাব, তামিল ভাষায় যাকে বলে ‘রাসিগার মন্ড্রম’। প্রাথমিক পর্যায়ে এই ক্লাবের সদস্যরা বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজ করতেন, যেমন রক্তদান শিবিরের আয়োজন করা, ত্রাণকার্য চালানো, পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের সহায়তা করা। এই কাজগুলো অভিনেতার বাইরেও বিজয়ের আলাদা ভাবমূর্তি তৈরিতে সহায়তা করেছে।
ভক্তদের সংগঠিত করার পেছনে বিজয়ের যে রাজনৈতিক অভিলাষ ছিল, সেটা প্রকাশ পায় ২০২১ সালে। তখনো তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেননি। রাজনীতির বাইরে থেকে নীরবে নির্বাচনী আবহ পরীক্ষা করেন। ফ্যান ক্লাবের সদস্যদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী করেন। এসব প্রার্থীদের পক্ষে বিজয় নিজে সামনে না থাকলেও সংগঠিত প্রচার চালায় তাঁর ফ্যান ক্লাব। নির্বাচনে ১৬৯ প্রার্থীর মধ্যে ১১৫ জনই জয়লাভ করেন। বলা যায়, সেই থেকেই পুরোপুরি মাঠে নামলেন বিজয়।
এরপর ২০২৪ সালে নিজের দল ‘তামিলাগা ভেট্রি কাজাগম’ বা টিভিকে গঠন করে রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরু করেন বিজয়। শুরু থেকে তাঁর লক্ষ্য ছিল ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন। ভোটের লড়াইয়ে জিততে গেলে দরকার শক্তিশালী কর্মীবাহিনী। তাই টিভিকে একটি কাঠামোগত প্রক্রিয়া চালু করে। এই প্রক্রিয়ায় নির্বাচন করা হয় ওয়ার্ডস্তরের নেতা, বুথ এজেন্ট ও নির্বাচনী এলাকার সমন্বয়কারীদের। জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে নয়, বরং দলের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাপকাঠিতেই বেছে নেওয়া হয় তাঁদের। পাশাপাশি সাধারণ সমর্থকদের মধ্যেও ব্যাপকভাবে দলীয় কার্যক্রম চলতে থাকে।
বিজয়ের দল টিভিকের নির্বাচনী প্রতীক বাঁশি। এই প্রতীক ছড়িয়ে পড়েছিল দলীয় ব্যানার থেকে শুরু করে ভোটারদের দৈনন্দিন পরিসরে। নারীরা তাঁদের বাড়ির বাইরে, রাস্তায়, উঠোনে এই প্রতীক এঁকে রেখেছিলেন, যাতে পাড়া-মহল্লাজুড়ে টিভিকের প্রতি সমর্থন আরও স্পষ্ট হয়। এই প্রচার কার্যক্রম অফলাইনের পাশাপাশি অনলাইনেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
এর মধ্যে বড় এক ধাক্কা আসে বিজয়ের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে রাজনৈতিক সমাবেশে পদপিষ্ট হয়ে ৪২ জনের মৃত্যুর ঘটনায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে বিজয়ের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার। কিন্তু মৃতদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে, তাদের ২০ লাখ রুপি করে ক্ষতিপূরণ দিয়ে বিজয় যেভাবে সেই ধাক্কা সামাল দিয়েছেন, তাতে তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা বেড়েছে অনেকটা। এরপর বড় সমাবেশ বাদ দিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জনসম্পৃক্ততাকে গুরুত্ব দেন তিনি। এটাই হয়ে ওঠে তাঁর প্রধান প্রচার কৌশল।
বিজয়ের এই উত্থানের পেছনে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে তাঁর স্বচ্ছ ভাবমূর্তি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়ায় যুবসমাজের বড় অংশের সমর্থন পেয়েছেন। অভিনয় ক্যারিয়ার ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে বিজয় বুঝিয়ে দেন, পার্টটাইম নয়, বরং ফুলটাইম রাজনীতিক হিসেবেই ময়দানে নামছেন তিনি। এই ঘোষণা রাজনীতিবিদ হিসেবে বিজয়ের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়িয়েছে। সেই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের আবেগকে মাথায় রেখে নতুন কর্মসংস্থান, দুর্নীতিমুক্ত সরকারের স্বপ্ন দেখিয়েছেন তিনি। নারী ভোট-ব্যাংকের কথা মাথায় রেখে মাসিক ২ হাজার পাঁচশ রুপির অর্থসাহায্য, গরিব পরিবারের মেয়েদের বিয়েতে আট গ্রাম করে সোনা এবং শাড়ি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। শিক্ষাকেই দিয়েছেন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। নির্বাচনী প্রচারে তিনি ঘোষণা করেছেন, যদি তাঁর দল ক্ষমতায় আসে, তাহলে দুই একরের কম জমির কৃষক পরিবারের সন্তানদের উচ্চশিক্ষার সম্পূর্ণ খরচ সরকার বহন করবে।
তবে এই সাফল্যই শেষ কথা নয়। বরং, এখান থেকে শুরু হলো বিজয়ের আসল পরীক্ষা। তাঁর সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ এই জনসমর্থন ধরে রাখা, দক্ষভাবে প্রশাসন চালানো, দলকে একসূত্রে বেঁধে রাখা এবং প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, থালাপাতি বিজয় কী এবার মাস্টার কিংবা পর্দার দুর্দান্ত অভিনেতার মতো চৌকস একজন স্টেট প্রশাসক হতে পারবেন? কারণ, নির্বাচনে জয় নিয়ে ফেরা যতটা না কষ্টসাধ্য সামনের চ্যালেঞ্জ সামলানো তারচেয়ে বেশি কষ্টের।
—জা. অর্থনীতি/এনএ