রাফিক জাহান পিয়াস: ছোটবেলায় ফুটবল আমার কাছে শুধুই একটি খেলা ছিল না, ছিল এক ধরনের উৎসব। যদিও ছোটবেলায় আমি ফুটবল ভালো খেলতে পারতাম না তবুও ছোটবেলায় বিশ্বকাপ এলেই পুরো পাড়া যেন কেমন রঙিন হয়ে উঠত। আর সেই উৎসবের সবচেয়ে উজ্জ্বল রঙ ছিল হলুদ। টেলিভিশনের পর্দায় যখন ব্রাজিল মাঠে নামত, তখন মনে হতো পুরো পৃথিবী যেন অন্যরকম হয়ে গেছে। সেই হলুদ জার্সি, সবুজের ছোঁয়া, গ্যালারি ভর্তি উল্লাস– সব মিলিয়ে ছোট্ট মনে তৈরি হয়েছিল এক অদ্ভুত ভালোবাসা।
২০০২ সালের ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ ছিল আমার জীবনের প্রথম ভালোভাবে দেখা বিশ্বকাপ। তখন আমার বয়স ছিল দশ কি এগারো। বাবার চাকরি সূত্রে ছিলাম জামালপুর জেলার মেলান্দহ থানায়। তখন বুঝতাম না ফুটবলের রাজনীতি বা কৌশল, কিন্তু একটি জিনিস খুব ভালোভাবে বুঝতাম– একটি খেলা মানুষকে কত আনন্দ দিতে পারে। আমার ফুটবল প্রীতির শুরুটা হয়েছিল আমার বড় ভাইয়ের হাত ধরেই। তিনি ছিলেন ব্রাজিলের অন্ধ সমর্থক। খেলা শুরুর অনেক আগে থেকেই তিনি পোস্টার, জার্সি আর পতাকা সংগ্রহ করতেন। আমি মুগ্ধ হয়ে সেগুলো দেখতাম।
বিশ্বকাপের সময় দেখেছি আমাদের পাড়ার চেহারা বদলে যেতে। আমাদের এলাকার রাস্তার মোড়ে, এলাকার সবচেয়ে উঁচু গাছের মগডালে, বাড়ির ছাদে টানানো হয়েছিল বিভিন্ন দেশের পতাকা। তবে সবচেয়ে বেশি চোখে লেগেছিল হলুদ সবুজের মিশ্রিত ব্রাজিলের পতাকা। আমাদের এলাকায় ব্রাজিলের পাশাপাশি ছিল আকাশি রঙের আর্জেন্টিনার পতাকা আর একটি মাত্র ত্রিবর্ণের (সবুজ, সাদা এবং লাল) পতাকা যেটি ছিল ইতালির পতাকা। আমাদের এলাকার একমাত্র ইতালির সাপোর্টার ছিলেন আমাদের এলাকার আনোয়ার ভাইয়ের বাবা। শত পতাকার মাঝেও সবচেয়ে উজ্জ্বল রঙ ছিল হলুদ, যা আজও আমার আবেগ-অনুভূতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
আমার বাড়িতেও বিশ্বকাপ মানেই ছিল উৎসব। খেলা শুরু হওয়ার আগেই সবাই টিভির সামনে বসে যেত। বাবা খেলার বিশ্লেষণ করতেন, বড় ভাই-বোন খেলোয়াড়দের নিয়ে তর্কে মেতে উঠত। আর আমি চুপচাপ বসে শুধু অপেক্ষা করতাম কখন ব্রাজিল গোল করবে। গোল হলেই পুরো ঘরে আনন্দের চিৎকার পড়ে যেত। সেই মুহূর্তগুলো আজও মনে হলে বুকের ভেতর অন্যরকম উষ্ণতা অনুভব করি।
তখন সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করতেন রোনালদো নাজারিও। তার দৌড়, গোল করার ভঙ্গি আর সেই বিখ্যাত চুলের স্টাইল ছোটবেলার চোখে ছিল অসম্ভব আকর্ষণীয়। ফাইনালে তার দুটি গোল যেন পুরো পৃথিবীকে আনন্দে ভাসিয়ে দিয়েছিল। মনে আছে, খেলা শেষে আমরা বন্ধুরা রাস্তায় নেমে চিৎকার করছিলাম—‘ব্রাজিল, ব্রাজিল.. ব্রাজিল, ব্রাজিল...’। যদিও তখন বিশ্বকাপ জয়ের গুরুত্ব পুরোপুরি বুঝতাম না, তবু আনন্দটা ছিল নিখাদ।
আরেকজন ছিলেন রোনালদিনহো। তাকে দেখলে মনে হতো ফুটবল খেলাটা খুব সহজ। মুখে সবসময় হাসি, পায়ে জাদু। তার খেলা দেখে মনে হতো, ফুটবল আসলে আনন্দের আরেক নাম। সেই বয়সে আমরা মাঠে নেমে তার মতো খেলার করার চেষ্টা করতাম। কেউ হয়তো তার মতো পারতাম না, তবু নিজেদের রোনালদিনহো ভাবতেই ভালো লাগত।
বিশ্বকাপের সময় রাত জেগে খেলা দেখার স্মৃতিগুলোও ভীষণ প্রিয়। মা বারবার ঘুমাতে যেতে বলতেন, কিন্তু ব্রাজিলের খেলা বলে কথা! চোখে ঘুম থাকলেও টিভির সামনে বসে থাকতাম। খেলা শেষে কখন যে ঘুমিয়ে পড়তাম, তা নিজেও বুঝতাম না। সকালে স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে খেলার আলোচনা চলত পুরো দিনজুড়ে। কে ভালো খেলেছে, কোন গোলটা সুন্দর ছিল— এসব নিয়েই মেতে থাকতাম। তখনকার দিনে এত স্মার্টফোন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল না। তাই বিশ্বকাপের আনন্দটা ছিল আরও সরল, আরও গভীর। পাড়ার সবাই মিলে একসঙ্গে খেলা দেখা, বিদ্যুৎ চলে গেলে হতাশ হওয়া, আবার বিদ্যুৎ এলে উল্লাসে ফেটে পড়া— এসব ছোট ছোট মুহূর্তই ছিল আসল আনন্দ। ব্রাজিলের প্রতি ভালোবাসাটা শুধু জয়ের জন্য ছিল না। তাদের খেলার ভেতরে একটা সৌন্দর্য ছিল। মনে হতো, তারা শুধু জিততে খেলছে না, মানুষকে আনন্দ দিতেও খেলছে। সেই সৌন্দর্যই ছোটবেলার মনকে সবচেয়ে বেশি টেনেছিল।
সময় বদলেছে। এখন অনেক বিশ্বকাপ দেখেছি, অনেক খেলোয়াড় এসেছে-গেছে। জীবনের ব্যস্ততাও বেড়েছে। আগের মতো আর রাত জেগে সব খেলা দেখা হয় না। তবু বিশ্বকাপ এলেই কোথা থেকে যেন ছোটবেলার সেই অনুভূতিগুলো ফিরে আসে। টিভির পর্দায় হলুদ জার্সি দেখলেই মনে পড়ে যায় সেই পুরোনো দিনগুলো— বন্ধুদের উল্লাস, বাবার হাসি, মায়ের বকুনি আর নির্ভেজাল আনন্দে ভরা রাত।
আজ বুঝতে পারি, ছোটবেলার সেই ব্রাজিল প্রীতি আসলে শুধু একটি ফুটবল দলের প্রতি ভালোবাসা ছিল না। সেটি ছিল একটি সময়ের প্রতি ভালোবাসা, কিছু মানুষের প্রতি ভালোবাসা, কিছু স্মৃতির প্রতি ভালোবাসা। হলুদ জার্সি তাই এখনও আমার কাছে শুধুই একটি রঙ নয়; এটি শৈশবের প্রতীক, আনন্দের প্রতীক, ভালোবাসার প্রতীক।
হয়তো ভবিষ্যতে আরও অনেক বিশ্বকাপ আসবে, নতুন নতুন তারকার জন্ম হবে। কিন্তু ছোটবেলার সেই প্রথম ভালোবাসা কখনও বদলে যাবে না। সেই ছোটবেলার স্বপ্নগুলো এখনও কোথাও হারিয়ে যায়নি। কারণ কিছু অনুভূতি সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয় না, বরং আরও গভীর হয়। আমার কাছে ব্রাজিলের হলুদ জার্সিও ঠিক তেমনই— যত দিন যাবে, ততই মনে করিয়ে দেবে আনন্দভরা ছোটবেলার গল্প। সময় বদলেছে, মাঠ বদলেছে, কিন্তু হলুদ জার্সির প্রতি ভালোবাসাটা একই রয়ে গেছে— একদম প্রথম দিনের মতোই তাজা, নিখাদ। আমার জীবনে হয়ত প্রথম প্রেমটা হয়েছিল এই হলুদ রঙের জার্সির সঙ্গেই...
