'ঋণের বোঝা সইতে না পেরে যুবকের আত্মহত্যা' কিংবা 'পাওনাদারের চাপে দিশেহারা নারীর চরম পথ বেছে নেওয়া'—সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সংবাদপত্রের পাতা খুললেই এমন হৃদয়বিদারক খবরাখবর নিয়মিত চোখে পড়ে। অর্থনৈতিক মন্দা, আকাশছোঁয়া দ্রব্যমূল্য আর ঋণের চক্রে পড়ে আমাদের সমাজে অনেকেই আজ চরম অসহায়। যখন কোনো অভিভাবকহীন নারী বা পুরুষ ঋণের সাগরে ডুবে যান, তখন হতাশার অন্ধকারে অনেকেই ভেবে বসেন—সামনে বুঝি কেবল দুটি পথই খোলা: হয় আত্মহত্যা, না হয় কোনো অনাচার বা অনৈতিক উপার্জনে জড়িয়ে পড়া।
কিন্তু আসলেই কি জীবনের শেষ এখানেই? বর্তমানের এই জ্বলন্ত সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ইসলাম আমাদের কী বার্তা দেয়?
পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক না কেন, ইসলাম মানুষের কষ্ট ও দারিদ্র্যকে গভীরভাবে বিবেচনা করে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই হারামকে হালাল করার অনুমতি দেয় না। চরম সংকটেও সমাজ বা পরিস্থিতির চাপে পড়ে জীবন ধ্বংস করা বা অনৈতিক পথে পা বাড়ানোকে ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।
জীবন আল্লাহর আমানত। চরম হতাশায় নিজের জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দেওয়ার অধিকার কারও নেই। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত মমতার সাথে বলেছেন,তোমরা নিজেদের হত্যা কোরো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু। (সুরা নিসা, আয়াত: ২৯)
ঋণ শোধ বা বেঁচে থাকার তাগিদে দেহব্যবসা বা কোনো অনৈতিক পথ বেছে নেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে জঘন্য অপরাধ। আল্লাহ বলেন, তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীলতা ও অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ৩২)
আজকের সমাজে এমন নির্মম বাস্তবতার কথাও শোনা যায়, যেখানে ঋণের টাকা জোগাড় করতে কোনো কোনো অভিভাবক নিজের সন্তানকে ভুল পথে ঠেলে দিচ্ছেন। মনে রাখা প্রয়োজন, কোনো নারীকে বা সন্তানকে এমন অপকর্মে বাধ্য করা যাবে না।
ইসলামের মূল নীতি হলো, সৃষ্টিকর্তার অবাধ্য হয়ে কোনো মানুষের নির্দেশ মানা যাবে না। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, অসৎ কাজে আনুগত্য নয়; আনুগত্য শুধু সৎ কাজের ক্ষেত্রেই হতে হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭১৪৫)
তাহলে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী?
যাঁরা আজ ঋণের জালে বন্দি হয়ে দিশেহারা, তাঁদের জন্য এই সময়ের উপযোগী কিছু বাস্তবমুখী ও ইসলামি সমাধান হলো:
কোনো অনৈতিক চাপ এলে তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। প্রয়োজনে বিশ্বস্ত আত্মীয়, আলেম, সমাজকর্মী বা আইনি ও সামাজিক সাহায্য সংস্থার শরণাপন্ন হতে হবে।
আয়ের উৎস ছোট হলেও হালাল উপায়ে জীবিকা অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে।
কেউ যদি পরিস্থিতির শিকার হয়ে ইতিমধ্যে কোনো ভুল পথে পা বাড়িয়েও থাকেন, তবে মনে রাখতে হবে আল্লাহর রহমতের দরজা সবসময় খোলা। আল্লাহ বলেন, হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ (সূরা জুমার, আয়াত: ৫৩)
ঋণ বা অভাব জীবনের একটি সাময়িক পরীক্ষা মাত্র। সাময়িক এই কষ্টের জন্য অনন্তকালের জীবনকে ধ্বংস করা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। হতাশা নয়, বরং ধৈর্য, দোয়া এবং সততার মাধ্যমেই সম্ভব এই সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়ানো।
জা. অর্থনীতি/ উমার
