মো. রাশেদ: ‘২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ’ শুরু হতে আর বেশি বাকি নেই। এবার আয়োজক হিসেবে থাকছে কানাডা, মেক্সিকো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ এই তিন দেশ। এই তিন দেশের মোট ১৬টি শহর যৌথভাবে আয়োজন করবে ফিফা বিশ্বকাপ।
চার বছর পরপর ফিফা বিশ্বকাপ এলেই বদলে যায় বাংলাদেশের চিত্র। গ্রামের অলিগলি থেকে শুরু করে রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক, সবখানেই দেখা মেলে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকার। যেন দক্ষিণ আমেরিকার দুই ফুটবল পরাশক্তির আরেকটি ঠিকানা হয়ে ওঠে বাংলাদেশ। বাড়ির ছাদ, দোকানের সামনে, মাঠের পাশে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, সবখানেই উড়তে থাকে নীল-সাদা আর হলুদ-সবুজ পতাকা। ফুটবলপ্রেমীদের এই আবেগ, উন্মাদনা আর ভালোবাসা দেখে সহজেই বলা যায়, বাংলাদেশ যেন এক খণ্ড আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল।
বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থনের ইতিহাস অনেক পুরোনো। একসময় টেলিভিশনের পর্দায় দারুণ স্কিল, নান্দনিক ফুটবল আর বিশ্বসেরা তারকাদের দেখে মুগ্ধ হয়েছিল এ দেশের মানুষ। একজন সমর্থক যেমন মুগ্ধ হয়েছিলেন ‘ডিয়াগো মেরাডোনার’ জাদুকরী ফুটবলে, তেমনি আরেকজন ভালোবেসেছেন ‘পেলে’ কিংবা ‘রোনালদো নাজারিওয়ের’ আক্রমণাত্মক খেলাকে। সেই ভালোবাসা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে।
এখনকার তরুণদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন ‘লিওনাল মেসি’ এবং ‘নেইমার’। বিশ্বকাপ এলেই এই উন্মাদনা যেন অন্য মাত্রা পায়। পাড়া-মহল্লায় শুরু হয় তর্ক-বিতর্ক, চায়ের দোকানে চলে ফুটবল বিশ্লেষণ, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে যায় সমর্থকদের পোস্টে। কেউ কয়েকশ’ ফুট লম্বা পতাকা তৈরি করেন, কেউ আবার নিজের বাড়ি রাঙিয়ে ফেলেন প্রিয় দলের রঙে। আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থকদের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কখনও হাস্যরস, কখনও আবেগ, আবার কখনও বন্ধুত্বের নতুন গল্প তৈরি করে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ ছিল বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনার এক অনন্য অধ্যায়।
বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘টিএসটি’ এলাকায় আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের রাতে দেখা যায় স্মরণীয় উদযাপন। হাজারও সমর্থক নীল-সাদা পতাকা হাতে রাস্তায় নেমে আসেন। ঢোল, গান আর আতশবাজিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। বহু বছরের অপেক্ষার পর মেসির হাতে বিশ্বকাপ ওঠার আনন্দে কেঁদেছেন অনেক সমর্থকও। সেই রাতে ঢাকা যেন ছোট্ট এক বুয়েনস আয়ার্সে পরিণত হয়েছিল। অন্যদিকে ব্রাজিল সমর্থকদের জন্য ২০২২ বিশ্বকাপ ছিল কষ্টের স্মৃতি। কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে হারের পর অনেক সমর্থককে ভেঙে পড়তে দেখা যায়।
প্রিয় দলকে নিয়ে স্বপ্ন দেখলেও সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তবুও ব্রাজিল সমর্থকদের আশা শেষ হয়ে যায়নি। তাদের বিশ্বাস, সামনের বিশ্বকাপে ঘুরে দাঁড়াবে সেলেসাওরা। ২০২৬ বিশ্বকাপকে ঘিরে এখন থেকেই শুরু হয়েছে নতুন স্বপ্ন দেখা। ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এই আসরের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হতে পারে মেসির ভবিষ্যৎ। অনেকের ধারণা, এটি হতে পারে কিংবদন্তি ‘লিওনাল মেসির’ শেষ বিশ্বকাপ।
তাই এবার দেশের জার্সিতে সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড গড়ার সুযোগটা হাত ছাড়া করতে চাইবে না মেসি। যদিও এই রেকর্ড এখনও জার্মানের কিংবদন্তি খেলোয়ার মিরোস্লাভ ক্লোসার ঝুলিতেই আছে। জার্মানির হয়ে ক্লোসা ২০০২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত চারটি বিশ্বকাপে ২৪ ম্যাচ খেলে গোল করেছেন ১৬টি। ২০২৬ বিশ্বকাপেই রেকর্ডটি নিজের করে নেওয়ার শেষ সুযোগ আছে মেসিরও। এখন পর্যন্ত পাঁচটি বিশ্বকাপে (২০০৬-২০২২) ২৬ ম্যাচে ১৩ গোল করে চতুর্থ স্থানে তিনি।
জার্মানের কিংবদন্তি খেলোয়ার মিরোস্লাভ ক্লোসা বলেন, আমি নিশ্চিত, বিশ্বকাপে আমার সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড দ্রুতই ভাঙতে চলেছে। এই বিশ্বকাপে এটা লিওনেল মেসি হয়তো পারবে। তাই প্রিয় তারকাকে বিশ্বমঞ্চে দেখতে আগ্রহের কমতি নেই কোটি কোটি ভক্তের। মেসির জাদুকরী পাস, ড্রিবলিং আর গোল উদযাপন আবারও মাতিয়ে তুলবে ফুটবল বিশ্ব, এমন প্রত্যাশাই সবার।
একই সঙ্গে ২০২৬ বিশ্বকাপে চোখ থাকবে ‘নেইমারের’ দিকেও। ইনজুরি কাটিয়ে ছন্দ নিয়ে আবার মাঠে ফেরার লড়াইয়ে আছেন এই ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টার। সমর্থকদের আশা, পুরোনো ছন্দে ফিরে এসে নেইমার আবার নেতৃত্ব দেবেন ব্রাজিলকে। তার স্কিল, গতি আর সৃষ্টিশীল ফুটবল নতুন করে প্রাণ ফিরিয়ে দিতে পারে ব্রাজিল দলে। ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি আবেগ, ভালোবাসা আর মানুষের মিলনের একটি বড় মাধ্যম।
বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল উন্মাদনা তারই প্রমাণ। বিশ্বকাপ যত এগিয়ে আসবে, ততই বাড়বে উত্তেজনা। আবারও নীল-সাদা আর হলুদ-সবুজে রঙিন হয়ে উঠবে দেশের আকাশ। তখন সত্যিই মনে হবে, বাংলাদেশেই যেন এক খণ্ড আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল।
