রাজশাহীর আবাসন খাতে চরম বিপর্যয়, দেউলিয়ার শঙ্কায় ব্যবসায়ীরা
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

রাজশাহী প্রতিনিধি: বৈষম্যমূলক করনীতি, ব্যাংক ঋণের আকাশছোঁয়া সুদের হার এবং নির্মাণসামগ্রীর লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে রাজশাহীর সম্ভাবনাময় আবাসন খাত এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। অবিলম্বে এই নীতিমালার সংস্কার করা না হলে স্থানীয় আবাসন ব্যবসায়ীরা দেউলিয়া হয়ে যাবেন এবং এর সাথে জড়িত ২৬৯টি সহযোগী শিল্পে ভয়াবহ ধস নামবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

শনিবার (২৭ জুন) বেলা ১২টার দিকে রাজশাহী নগরীর একটি রেস্তোরাঁয় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন রাজশাহীর আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন ‘রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড ডেভেলপার্স অ্যাসোসিয়েশন’ (রিডা)-এর নেতৃবৃন্দ।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন রিডার সাধারণ সম্পাদক আ. স. ম. মিজানুর রহমান কাজী। তিনি বলেন, “রাজশাহী মূলত একটি চাকুরিজীবী ও শিক্ষাকেন্দ্রিক শহর। ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো এখানে বড় কোনো করপোরেট ক্রেতা নেই; এখানকার আবাসন বাজার সম্পূর্ণভাবে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির আজীবনের সঞ্চয় ও পেনশনের টাকার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ২০২৩ সালের নতুন করনীতিতে যৌথ উন্নয়ন মডেলে জমির মালিকের ওপর ১৫% ক্যাপিটাল গেইন্স ট্যাক্স (মূলধনী লাভ কর) আরোপ করার পর থেকে জমির মালিকরা ডেভেলপারদের জমি দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। এর ফলে রাজশাহীতে নতুন প্রকল্প শুরু করা এক প্রকার বন্ধ হয়ে গেছে।” সাইনিং মানি, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্তি এবং পরবর্তীতে বিক্রির প্রতিটি ধাপে এই ১৫% ট্যাক্স দেওয়ার কারণে আবাসন খাতে বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে বলে তিনি জানান।

রিডার সাধারণ সম্পাদক আরও উল্লেখ করেন, রড-সিমেন্টের লাগামহীন দামের কারণে রাজশাহীতে বর্তমানে বর্গফুট প্রতি উৎপাদন খরচ প্রায় ২,০০০ টাকা বেড়ে গেছে। এর ওপর ব্যাংক ঋণের সুদ ১৬% ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন খরচ ১৩% হওয়ায় নতুন ফ্ল্যাট কেনা এখন মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে।

সংবাদ সম্মেলনে ব্যবসায়ীরা জানান, নতুন শুল্ক ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রতি টন রড উৎপাদনে খরচ প্রায় ১১,০০০ থেকে ১২,০০০ টাকা বেড়েছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও বাজারে কোনো ক্রেতা নেই। ফ্ল্যাট বিক্রি না হওয়ায় ব্যাংক ঋণও পরিশোধ করতে পারছে না অনেক প্রতিষ্ঠান।

বক্তারা সতর্ক করে বলেন, দেশের জিডিপিতে ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ অবদান রাখা এই খাতটি ধসে পড়লে পোশাক খাতের পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কর্মসংস্থান খাতের প্রায় ২ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বেকার হয়ে পড়বেন। এছাড়া চড়া করের কারণে ক্রেতারা ফ্ল্যাট নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) না নেওয়ায় সরকার বার্ষিক প্রায় ৩০,০০০ কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব হারাচ্ছে।

বিদ্যমান সংকট উত্তরণে সংবাদ সম্মেলন থেকে সরকারের কাছে দুটি জরুরি দাবি জানানো হয়:
১. জমি হস্তান্তর, সাইনিং মানি এবং ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশনের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত কর ও ভ্যাটের হার কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে আনা।
২. মধ্যবিত্তের আবাসন স্বপ্ন টিকিয়ে রাখতে একক অঙ্কের সুদে (সিঙ্গেল ডিজিট) দীর্ঘমেয়াদী বিশেষ গৃহঋণের ব্যবস্থা করা।

সময়মতো নীতিগত সংস্কার করা না হলে আবাসন খাতের এই স্থবিরতা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে বলে সংবাদ সম্মেলনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন রিডার সভাপতি তৌফিকুর রহমান লাভলু, সিনিয়র সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট ইরশাদ আলী ইশা, সহ-সভাপতি মোহাম্মদ কবির হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মেজবাউল বারীসহ সংগঠনের জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।