কুবিতে আবারো ফিরলেন বিতর্কিত রেজিস্ট্রার মজিবুর রহমান
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

কুবি প্রতিনিধি: আর্থিক অনিয়ম, বিধিবহির্ভূত পদোন্নতি এবং শিক্ষা ছুটির শর্ত লঙ্ঘনের মাধ্যমে প্রায় ৩৩ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতির অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) সাবেক রেজিস্ট্রার মো. মজিবুর রহমান মজুমদার আবার একই পদে যোগদান করেছেন। অভিযোগের তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছিল তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে হাইকোর্টের সর্বশেষ স্থগিতাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে পুনরায় দায়িত্ব পালনের অনুমতি দিয়েছে বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

সোমবার (৬ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. দলিলুর রহমান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এই অনুমতির কথা জানানো হয়। তবে আর্থিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগে বরখাস্ত হওয়া একজন কর্মকর্তাকে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই প্রশাসনিক শীর্ষ দায়িত্বে ফিরিয়ে আনায় বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

এই বিতর্কিত নিয়োগ ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হলেন— পুনর্বহাল হওয়া রেজিস্ট্রার মো. মজিবুর রহমান মজুমদার, উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাসুদা কামাল এবং সদ্য বিদায়ী ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ নূরুল করিম চৌধুরী।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কুবি’র প্রথম রেজিস্ট্রার হিসেবে নিয়োগ পেয়েই মজিবুর রহমান মজুমদার অনিয়ম, নিয়োগ বাণিজ্য, অর্থ আত্মসাৎ, তথ্য জালিয়াতি ও শিক্ষক হেনস্তাসহ নানা বির্তকে জড়িয়েছেন। এর আগে ২০১৮ সালে তীব্র আন্দোলনের মুখে তাকে বদলি করা হলেও পরে তিনি ক্ষমতার জোরে স্বপদে ফেরেন। শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, অর্গানোগ্রাম সংশোধন ছাড়াই নিজের পদোন্নতির ফাইলে নিজে স্বাক্ষর করে বেআইনিভাবে দ্বিতীয় গ্রেডের বেতন-ভাতা তুলেছেন তিনি; যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২ লাখ ২৭ হাজার ৯৮০ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া শ্রীলঙ্কার কেলানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি সম্পন্ন না করেই চুক্তিপত্র লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে বেতন-ভাতা তুলে আরও ২০ লাখ ১৪ হাজার ১৪০ টাকা আত্মসাৎ করেছেন, যা অডিট মেমোতে ফেরতযোগ্য বলা হয়েছে। এই দুই খাতে প্রায় ৩৩ লাখ টাকা লোপাটের সত্যতা মেলায় ২০২৫ সালের ৩ মার্চ তাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করে সিন্ডিকেট। পরবর্তীতে উচ্চ আদালত থেকে সাময়িক স্থগিতাদেশ নিয়ে তিনি কায়দা করে এই যোগদানের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মজিবুর রহমান হাইকোর্ট থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে এলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাইলে ওই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে পারত। তবে প্রশাসন কেন আপিল না করে বিতর্কিত এই কর্মকর্তাকে বরণ করে নিল, সে বিষয়ে রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোহাম্মদ নূরুল করিম চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “তিনি কোর্টের রায় এনেছেন এতটুকুই জানি। আমার পদ ঠুনকো, এর বেশি কিছু উপাচার্যরাই বলতে পারবেন।” উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাসুদা কামালও স্বীকার করেছেন যে, বিশ্ববিদ্যালয় চাইলে এই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ ছিল।

এ বিষয়ে কুবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল বলেন— “হাইকোর্টের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ীই তাকে যোগদানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।” তদন্ত কমিটিতে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা জজ আদালতের আইনজীবী রয়েছেন বলে তিনি জানান। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন জুনিয়র কর্মকর্তা কীভাবে স্বপদে ফেরা একজন ক্ষমতাধর সিনিয়র কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত করবেন— এমন প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য কিছুটা অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, “এখানে একটি বড় গ্যাপ থেকে যাবে। বিষয়টি আসলেই নতুন করে ভাবার বা ঠিক করার প্রয়োজন রয়েছে।”

—জা. অর্থনীতি/এলএটি