প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়াতে মিউচুয়াল  ফান্ডকে শক্তিশালী করা হবে

বাংলাদেশের খ্যাতনামা চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট মাসুদ খান। করপোরেট ও আর্থিক খাতে প্রায় সাড়ে চার দশকের অভিজ্ঞতা তার। গত ৪ জুন পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেয়েই কাঠামোগত সংস্কার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ও বাজারের গভীরতা বাড়াতে একাধিক উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে আলাপচারিতায় পুঁজিবাজার সংস্কারের রোডম্যাপ, বড় কোম্পানিকে বাজারে আনার পরিকল্পনা, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমন্বয়, বাজার তদারকি জোরদার এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠনের নানা দিক তুলে ধরেছেন নতুন বিএসইসি চেয়ারম্যান। জাতীয় অর্থনীতির নিজস্ব প্রতিবেদক জাকির হোসাইনের নেওয়া সাক্ষাৎকারটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

জাতীয় অর্থনীতি: দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বল্পমেয়াদে কোন বিষয়গুলোকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন?

মাসুদ খান: দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখি, আইনগত সীমাবদ্ধতায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছিল না। তাই লিস্টিং রেগুলেশন ও বাজার তদারকিতে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অস্বাভাবিক লেনদেনে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী, ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়া হয়েছে। বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের জিডিআর লিস্টিংয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি কোম্পানির লিস্টিংয়ের পথও সহজ হয়েছে।

টি+১ সেটেলমেন্ট, স্ক্রিপ নেটিং এবং আন্তর্জাতিক মানের ক্লিয়ারিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাজেটে পুঁজিবাজারবান্ধব কয়েকটি সিদ্ধান্ত এসেছে— ইন্টার-কোম্পানি ডিভিডেন্ড ট্যাক্স প্রত্যাহার, ব্যক্তি পর্যায়ের ডিভিডেন্ড কর ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, মিউচুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগসীমা তুলে দেওয়া এবং বন্ডের মুনাফাকে করমুক্ত রাখা। এতে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

জাতীয় অর্থনীতি: বাজেটে কর-সুবিধা দেওয়ার পরও বড় দেশীয় ও বহুজাতিক কোম্পানি শেয়ারবাজারে না এলে কী করবেন?

মাসুদ খান: বড় কোম্পানিগুলো মূলধনের বড় অংশ সংগ্রহ করে ব্যাংক ঋণ ও বন্ডের মাধ্যমে যার উৎস সাধারণ মানুষের অর্থ। তাই নির্দিষ্ট সীমার বেশি ঋণ বা টার্নওভার থাকা কোম্পানিগুলোকে পাবলিক ইন্টারেস্ট কোম্পানি (পিআইসি) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার পরিকল্পনা করছি। পিআইসি হলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাদের তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন বাধ্যতামূলক করা হবে।

জাতীয় অর্থনীতি: বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর ও আইডিআরের সঙ্গে সমন্বয় কীভাবে জোরদার করবেন?

মাসুদ খান: বাজেট প্রণয়নে এনবিআরের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গেও সমন্বয় বাড়ানো হচ্ছে। তিনটি প্রধান নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে প্রতি তিন মাসে শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক এবং নিয়মিত কর্মকর্তা পর্যায়ের সমন্বয় সভার পরিকল্পনা রয়েছে।

জাতীয় অর্থনীতি: উদ্যোক্তা-পরিচালকদের ৩০ শতাংশ শেয়ারধারণের শর্ত বাস্তবায়নে কী করবেন?

মাসুদ খান: স্টক এক্সচেঞ্জই এখানে প্রাইমারি রেগুলেটর। আগে তাদের পরিকল্পনা জানতে চাইব এবং ব্যবস্থা নিতে বলব। প্রয়োজন হলে পরে বিএসইসি উদ্যোগ নেবে। বিষয়টি বাস্তবায়নে সময়সীমা ও নীতিমালা নির্ধারণে আলোচনা চলছে।

জাতীয় অর্থনীতি: ব্রোকারেজ হাউজে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও শেয়ার আত্মসাতের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে?

মাসুদ খান: অতীতে নজরদারির ঘাটতি ছিল। তাই ডিএসইকে ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী ব্রোকারেজ হাউজগুলোতে নিয়মিত পরিদর্শন করতে হবে।

জাতীয় অর্থনীতি: নীতিগত সিদ্ধান্তে অংশীজনদের মতামত কতটা গুরুত্ব পাবে?

মাসুদ খান: ব্রোকার, মার্চেন্ট ব্যাংক, মিউচুয়াল ফান্ডসহ সব অংশীজনের মতামত নিয়ে নতুন বিধিমালা করা হচ্ছে। আইপিও, পাবলিক ইস্যু, মার্জিন রুলসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

জাতীয় অর্থনীতি: এসএমই প্ল্যাটফর্ম নিয়ে কমিশনের পরিকল্পনা কী?

মাসুদ খান: এসএমই প্ল্যাটফর্মে সম্ভাবনার পাশাপাশি কারসাজির ঝুঁকিও বেশি। তাই নতুন তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে সুবিধা ও ঝুঁকি— দুই দিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

জাতীয় অর্থনীতি: পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়াতে কী উদ্যোগ নেওয়া হবে?

মাসুদ খান: বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়াতে মিউচুয়াল ফান্ড খাতকে শক্তিশালী করা হবে। কেপিআইভিত্তিক গ্রেডিং চালু করা হবে। পাশাপাশি প্রভিডেন্ট ও গ্র্যাচুইটি ফান্ডকে মিউচুয়াল ফান্ড, করপোরেট বন্ড ও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হবে।

জাতীয় অর্থনীতি: আপনার মেয়াদ শেষে পুঁজিবাজারকে কোথায় দেখতে চান?

মাসুদ খান: ভালো কোম্পানির সংখ্যা বাড়াতে আইপিও অনুমোদন ৫০ দিনের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ডাইরেক্ট লিস্টিং সহজ করা হবে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি বাড়ানো হবে। পাশাপাশি এআইভিত্তিক সার্ভেইল্যান্স, ডেরিভেটিভ মার্কেট, ইটিএফ, আরইআইটি, শক্তিশালী বন্ড মার্কেট এবং ডিজিটাল বিএসইসি গড়ে তোলা হবে। লক্ষ্য, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে ফ্রন্টিয়ার থেকে ইমার্জিং মার্কেটে উন্নীত করা।

জাতীয় অর্থনীতি: সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

মাসুদ খান: ‘হাই গেইন মানেই হাই রিস্ক’ (উচ্চ মুনাফার ঝুঁকিও উচ্চ)— এটি মনে রাখতে হবে। দ্রুত লাভের আশায় নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিতে বিনিয়োগ করুন। বিনিয়োগের আগে কোম্পানি সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে-বুঝে সিদ্ধান্ত নিন।

জাতীয় অর্থনীতি: সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

মাসুদ খান: আপনাকেও ধন্যবাদ।