আজকাল সকালে ঘুম থেকে উঠে টুথব্রাশের ওপর রঙিন টুথপেস্ট লাগিয়ে দাঁত মাজা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু আপনি কি জানেন, যে চকচকে দাঁতের আশায় ফেনা তুলে প্রতিদিন দাঁত মাজছেন, তাতেই লুকিয়ে আছে আপনার ও আপনার পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি?
হ্যাঁ, আধুনিক গবেষণায় এমনটাই স্পষ্ট হচ্ছে। বহুজাতিক কোম্পানির টুথপেস্টগুলোতে ব্যবহৃত ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান মানুষের প্রাকৃতিক মুখের স্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে। এই বিভ্রান্তিকর প্রচারণার যুগে যখন মানুষ স্বাস্থ্যকর ও প্রাকৃতিক সমাধানের দিকে আবার ঝুঁকছে, তখন এক হাজার চারশত বছর আগের এক মহিমান্বিত অভ্যাসের দিকেই ইঙ্গিত করছে বিজ্ঞান—আর তা হলো মেসওয়াক।
কৃত্রিম উপাদান আর আধুনিক ক্ষতিকর টুথপেস্টের ভীড়ে মেসওয়াক কোনো সাধারণ কাঠের ডাল নয়; এটি একাধারে একটি প্রাকৃতিক উপাদান, বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি এবং আত্মিক তৃপ্তি।
মেসওয়াক হলো প্রাকৃতিক উপাদানের খনি: বিশেষ করে আরাক (পিলু) গাছের ডাল থেকে তৈরি মেসওয়াকে প্রকৃতির নিজ হাতে তৈরি কিছু উপাদান বিদ্যমান, যা কোনো কৃত্রিম গবেষণাগারে বানানো সম্ভব নয়-
সিলিকা: দাঁতের ময়লা ও দাগ দূর করে স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা দেয়।
প্রাকৃতিক ফ্লোরাইড: দাঁতকে ক্ষয়রোগ থেকে রক্ষা করে (কৃত্রিম ফ্লোরাইডের মতো এটি ক্ষতিকর নয়)।
সালফার ও উদ্ভিজ্জ তেল: শক্তিশালী প্রাকৃতিক অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল হিসেবে কাজ করে, যা মুখের দুর্গন্ধ এবং মাড়ির প্রদাহ সৃষ্টি করা ক্ষতিকর জীবাণু ধ্বংস করে।
ক্যালসিয়াম ও পটাশিয়াম: দাঁতের এনামেল বা বাইরের কঠিন আবরণকে মজবুত রাখতে সহায়তা করে।
মেসওয়াকেই রয়েছে স্বয়ংক্রিয় ব্রাশের গঠন: আরাক ডালের অগ্রভাগ চিবিয়ে নরম করলে তা থেকে হাজার হাজার সূক্ষ্ম প্রাকৃতিক তন্তু বা ফাইবার বের হয়। কৃত্রিম প্লাস্টিক ব্রাশের শক্ত নাইলন ব্রিসল বা সুতা প্রায়শই মাড়িতে ক্ষত সৃষ্টি করে বা মাড়ি ক্ষয় করে দেয়। অথচ মেসওয়াকের কোমল তন্তুগুলো দাঁতের প্রতিটি কোণ ও মাড়ির কিনারা আলতোভাবে পরিষ্কার করে এবং মাড়িতে আকুপাংচারের মতো রক্তসঞ্চালন বাড়ায়।
লালারসের চমৎকার নিঃসৃত: মেসওয়াক চিবানোর ফলে মুখে পর্যাপ্ত লালারস (Saliva) নিঃসৃত হয়। লালারস হলো মানুষের মুখের ভেতরের প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা। এটি মুখের এসিডিক পরিবেশকে স্বাভাবিক করে এবং ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া গজাতে দেয় না।
ইবাদত, স্বাস্থ্য ও সুন্নতের অপূর্ব মেলবন্ধন রয়েছে মেসওয়াকে : ইসলামে মেসওয়াককে কেবল মুখের স্বাস্থ্য সচেতনতার একটি অংশ বলা হয়নি, বরং এটিকে ইবাদতের ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
বিখ্যাত হাদিস গ্রন্থ বুখারি শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যদি আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর না হতো, তবে আমি তাদেরকে প্রত্যেক নামাজের সময় মেসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম।
সুনানে নাসায়ির অন্য এক হাদিসে মেসওয়াক করার মূল রহস্য ও ফজিলত তুলে ধরা হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, মেসওয়াক মুখকে পবিত্র করে এবং রবকে সন্তুষ্ট করে।
একজন বিশ্বাসীর জন্য এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে? মেসওয়াক ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি একই সাথে তিনটি মহান সৌভাগ্য অর্জন করতে পারছেন:
১. শারীরিক ও দন্তসুরক্ষা: ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান মুক্ত প্রাকৃতিক দাঁতের পরিচর্যা।
২. সুন্নতের অনুসরণ: প্রিয় রাসুল (সা.)-এর পবিত্র অভ্যাস নিজের জীবনে ধারণ করা।
৩. ইবাদতের সওয়াব: প্রতিবার অজুর আগে বা মেসওয়াক ব্যবহারের মাধ্যমে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়া ও তাঁর সন্তুষ্টি লাভ করা।
আধুনিকতা ও বহুজাতিক ব্র্যান্ডগুলোর চটকদার বিজ্ঞাপনে ভুলে আমরা যে প্লাস্টিক ব্রাশ আর ক্ষতিকর রাসায়নিক পেস্টের ওপর নির্ভর হয়ে পড়েছিলাম, তার সঠিক বিকল্প আমাদের হাতের কাছেই রয়েছে। বিজ্ঞান যত এগোচ্ছে, ততই এটি প্রমাণিত হচ্ছে যে প্রকৃতির কোলে সমাধানগুলোই সবচেয়ে নিরাপদ।
তাই আসুন, বিষাক্ত রাসায়নিক থেকে দাঁতকে বাঁচাতে এবং সুন্নতের আলোয় জীবনকে উদ্ভাসিত করতে আবার মেসওয়াককে আমাদের প্রতিদিনের সঙ্গী বানিয়ে নিই। মেসওয়াকই হোক মুখের সার্বিক সুরক্ষায় সেরা পছন্দ।
জা. অর্থনীতি/ উমার
