নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের পদ্ধতি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের পরিবর্তে আবারও স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে নিয়োগের ক্ষমতা ফিরতে পারে, এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ ও আলোচনা শুরু হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বিষয়টি নিয়ে মিছিল ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের পদ্ধতি পরিবর্তন নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এমন পরিস্থিতিতে বিতর্কের কারণ বুঝতে হলে ফিরতে হবে অতীতে, জানতে হবে এনটিআরসিএর যাত্রা শুরু হয়েছিল কিভাবে? স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্ব মূলত স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে ছিল। শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতা ও মান নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ যাকে সংক্ষেপে বলা হয় এনটিআরসিএ।
এর পরের বছর ‘বেসরকারি শিক্ষক পরীক্ষা গ্রহণ, নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন বিধিমালা ২০০৬’ প্রণয়ন করা হয়। এর আওতায় শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা নেওয়া এবং যোগ্য প্রার্থীদের নিবন্ধন ও প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করে এনটিআরসিএ।
পরবর্তী সময়ে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের ক্ষেত্রে এনটিআরসিএর প্রত্যয়নপত্র একটি বাধ্যতামূলক যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে। তবে প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে ম্যানেজমেন্ট কমিটি বা গভর্নিং বডির ভূমিকা বজায় ছিল।
পরবর্তীতে গত ২০১৫ সালে আসে বড় পরিবর্তন। শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ২০১৫ সালে শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়নের পাশাপাশি শিক্ষক নিয়োগের জন্য প্রার্থী সুপারিশের দায়িত্বও এনটিআরসিএকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগে অনুসরণীয় পদ্ধতি সংক্রান্ত পরিপত্র জারি করে। একই সময়ে নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের সনদের মেয়াদ তিন বছর নির্ধারণ করা হয়।
এর পর থেকে এনটিআরসিএর তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত পরীক্ষা এবং মেধাক্রমের ভিত্তিতে সুপারিশের মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়ে আসছে।
নতুন করে বিতর্কের শুরু হওয়ার কারণের দিকে লক্ষ্য করলে জানা যায়, এনটিআরসিএর কার্যক্রম নিয়ে গত ৩ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভার কার্যবিবরণী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর শিক্ষক নিয়োগের ভবিষ্যৎ পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে ওই কার্যবিবরণীর বরাত দিয়ে বলা হয়, এনটিআরসিএকে ভবিষ্যতে শুধু শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়নের দায়িত্বে রাখা হতে পারে। ২০১৫ সালের পরিপত্র অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগের জন্য সুপারিশ করার দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনার কথাও উঠে আসে।
এমন পরিস্থিতিতে আবারও স্কুল পরিচালনা কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা চালুর আশঙ্কা তৈরি হয়। এর প্রতিবাদেই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও মিছিল দেখা যায়।
বিতর্কের মধ্যে ১০ আগস্ট রাতে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজে জানানো হয়, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। পরদিন ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে আরও ব্যাখ্যা দেন। মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত আলোচনা ও সিদ্ধান্তের খসড়া তৈরি হলেও সেটি এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি বলে তিনি জানান।
মন্ত্রণালয়ের বৈঠকের কার্যবিবরণীতে প্রয়োজনীয় সংশোধনের পর মন্ত্রীর অনুমোদন এবং এরপর প্রজ্ঞাপন জারির বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। ফলে বর্তমানে শিক্ষক নিয়োগের পদ্ধতি পরিবর্তন হবে কি না, সেটি নির্ভর করছে চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্তের ওপর।
এদিকে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা এনটিআরসিএর কাছেই থাকবে, নাকি আবারও প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির হাতে ফিরবে এ প্রশ্নকে কেন্দ্র করে শিক্ষা খাতে আলোচনা-সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে।
—জা. অর্থনীতি/এএইচএ