পর্যটন ও এভিয়েশন খাতে তরুণদের কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা

আধুনিক যুগের পর্যটন ব্যবস্থা অনেকটাই উন্নত যোগাযোগ ও প্রযুক্তিনির্ভর। যে দেশের যোগাযোগব্যবস্থা যত উন্নত ও আধুনিক, সাধারণত সে দেশে পর্যটকদের আগমনও তত বেশি এবং পর্যটন শিল্পও তত গতিশীল। একটি দেশের পর্যটনকে সঠিকভাবে উপস্থাপন ও বিকশিত করতে পরিবহন ও যোগাযোগ, আবাসন, খাদ্য ও পানীয় এবং বিনোদন ও আকর্ষণীয় স্থানসহ বিভিন্ন খাতের সমন্বয় প্রয়োজন। এসব খাতের মধ্যে পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা পর্যটন বিকাশের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

বিশ্বের পর্যটন প্রসার ও বিকাশে বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এয়ারলাইন্সের সফল বাণিজ্যিক উড্ডয়ন আন্তর্জাতিক ভ্রমণব্যবস্থায় যোগ করেছে নতুন মাত্রা। একসময় যে দূরত্ব অতিক্রম করতে মাসের পর মাস সময় লাগত, আধুনিক বিমান যোগাযোগের কারণে এখন তা কয়েক ঘণ্টায় সম্ভব হচ্ছে। প্রযুক্তি ও বিমান যোগাযোগের উন্নয়নে পৃথিবী যেন মানুষের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে।

বিশ্ব পর্যটন সংস্থার বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৫০ সালে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা ছিল প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ। বর্তমানে সেই সংখ্যা ১২০ কোটিরও বেশি। ভ্রমণপিপাসু মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এক দেশ থেকে অন্য দেশে দ্রুত ও সহজে যাতায়াতের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম হিসেবে আকাশপথের গুরুত্বও বাড়ছে। ফলে বাণিজ্যিকভাবে বেসামরিক বিমান চলাচল খাতের সম্ভাবনা ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। আর এর সঙ্গে বাড়ছে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা।

আন্তর্জাতিক এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (IATA) বিশ্বের বিমান পরিবহন খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক সংগঠন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এয়ারলাইন্স ও বিমান পরিবহনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এই খাতের সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আন্তর্জাতিক রুটের বিস্তার, নতুন গন্তব্য যুক্ত হওয়া এবং পর্যটন ও ব্যবসায়িক ভ্রমণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এভিয়েশন খাতে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্রও তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক বিমান পরিবহন ব্যবস্থার বাইরে নয়। দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা, প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা, ক্রমবর্ধমান ব্যবসা-বাণিজ্য এবং পর্যটন সম্ভাবনার কারণে বাংলাদেশ এভিয়েশন খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এয়ারলাইন্স যাত্রী ও কার্গো পরিবহন সেবা পরিচালনা করছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স, নভোএয়ারসহ দেশীয় এয়ারলাইন্সের পাশাপাশি কাতার এয়ারওয়েজ, সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স, সৌদি এয়ারলাইন্স, মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স, এমিরেটস, থাই এয়ারওয়েজ, ইতিহাদ, এয়ার ইন্ডিয়া, এয়ার এরাবিয়া, ক্যাথেপ্যাসিফিক, এয়ার চায়না, চায়না ইস্টার্ন, চায়না সাউদার্ন, কুয়েত এয়ারওয়েজ, গালফ এয়ার, টার্কিশ এয়ারলাইন্স, শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইন্স, ওমান এয়ার, হিমালয় এয়ারলাইন্স, ফ্লাইদুবাই, ইজিপ্টএয়ারসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যমান বিমানবন্দরগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগও চলছে। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালু হওয়ায় ভবিষ্যতে যাত্রী ও বিমান চলাচলের সক্ষমতা আরও বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। নতুন অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ এবং যাত্রীসংখ্যা বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় আগামী দিনে বাংলাদেশে এয়ারলাইন্স ও এভিয়েশন ব্যবসার পরিধি আরও বাড়তে পারে।

এখানেই তৈরি হচ্ছে দক্ষ জনশক্তির বড় সম্ভাবনা। এভিয়েশন খাত কেবল পাইলট কিংবা প্রকৌশলীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে রিজারভেশন ও টিকিটিং, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, এয়ারপোর্ট অপারেশন, এয়ারলাইনস অপারেশন, কাস্টমার সার্ভিস, সেলস ও মার্কেটিং, কার্গো, ট্রাভেল এজেন্সি, ট্যুর অপারেশন এবং কেবিন ক্রুসহ অসংখ্য পেশা।

এ কারণে বাংলাদেশে বেকার তরুণদের জন্য পর্যটন ও এভিয়েশন খাত একটি সম্ভাবনাময় কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র হতে পারে। ট্যুরিজম ম্যানেজমেন্ট, এভিয়েশন ম্যানেজমেন্ট, রিজারভেশন অ্যান্ড টিকিটিং বা জিডিএস, হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, এয়ারপোর্ট অপারেশন, এয়ারলাইনস অপারেশন, কেবিন ক্রু, ট্যুর গাইডিং, ট্যুর প্যাকেজ ও ভিসা প্রসেসিং, ট্রাভেল এজেন্সি ও ট্যুর অপারেশন ম্যানেজমেন্ট, কাস্টমার সার্ভিস, ইকো-ট্যুরিজম এবং কমিউনিটি-বেজড ট্যুরিজম—এসব বিষয়ে কর্মমুখী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ তরুণদের দক্ষ করে তুলতে পারে।

সরকারের জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ ধরনের প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এসব প্রশিক্ষণ যথাযথভাবে পরিচালিত হলে প্রশিক্ষিত তরুণরা এয়ারলাইনস, জিএসএ, পিএসএ, ট্রাভেল এজেন্সি, ট্যুর অপারেটর, হজ ও ওমরাহ এজেন্সি এবং অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পেতে পারেন।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই খাতে শুধু চাকরির সুযোগই নেই, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগও রয়েছে। প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়ে একজন তরুণ ট্রাভেল এজেন্সি, ট্যুর অপারেটর কিংবা বিভিন্ন ধরনের পর্যটনসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেন। ফলে পর্যটন ও এভিয়েশন খাতকে শুধু চাকরির বাজার হিসেবে না দেখে উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্র হিসেবেও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

দেশের পর্যটন সম্পদও এ সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেটের চা-বাগান, হাওরাঞ্চল, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা ও ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে আন্তর্জাতিক পর্যটনের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা গেলে দেশে বিদেশি পর্যটকের আগমন বাড়ানো সম্ভব। এর সঙ্গে বিমান যোগাযোগ, নিরাপদ পরিবহন, মানসম্মত আবাসন, খাবার, বিনোদন এবং ডিজিটাল পর্যটনসেবার সমন্বয় ঘটাতে হবে।

বিশ্বের অনেক দেশ পর্যটন ও এভিয়েশনকে অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত করেছে। বাংলাদেশও চাইলে এই খাতকে কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি বড় উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব।

লেখক: মো. সাইফুল্লার রাব্বী 

এসিস্টেন্ট ম্যানেজার, কাস্টমার সাপোর্ট এন্ড ট্রেনিং ডিপার্টমেন্ট, সেবার বাংলাদেশ।