নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশব্যাপী সরকারি সেবা গ্রহণে ঘুষের দাবির তথ্য বেনামে সংগ্রহের লক্ষ্যে দুই তরুণ উদ্যোক্তা 'ঘুষসাইট’ নামে একটি ওয়েবসাইট চালু করেছেন।
এর মূল বার্তা বা স্লোগান- "দপ্তরের নাম বলুন। দাবিকৃত টাকার কথা লিখুন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম-পরিচয় গোপন রাখুন"।
গত ২১ আগস্ট চালু হওয়া এই ওয়েবসাইটে ব্যবহারকারীরা কোনো অ্যাকাউন্ট খোলা বা নাম, ইমেইল, ফোন নম্বর দেওয়া ছাড়াই সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের নাম, সেবার ধরন, আনুমানিক অবস্থান, ঘুষের পরিমাণ এবং ঘুষ দাবির পর কি হয়েছিল- এসব তথ্য প্রকাশ করতে পারেন।
নির্মাতাদের মতে, এই প্ল্যাটফর্মের উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির অপকর্ম প্রমাণ করা নয়; বরং এমন একটি উন্মুক্ত পাবলিক রেকর্ড বা লেজার তৈরি করা, যা অনানুষ্ঠানিক এই অর্থ লেনদেনের নিয়মিত চিত্র বা প্যাটার্ন উন্মোচন করবে।
৭৫ কোটি টাকার প্রকল্পে বদলে যাচ্ছে ধানমন্ডি লেক
ঘুষসাইটের অন্যতম নির্মাতা সাইফ কবির গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশের প্রত্যেকেই জানে যে ঘুষের অস্তিত্ব আছে। তবে যে তথ্যটি কারও কাছে নেই, তা হলো এর সুনির্দিষ্ট অংক বা হিসাব।
তিনি ভাষায়, তাড়াহুড়োর মধ্যে কাউন্টারে একা দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় আপনি হয়তো জানতে পারলেন যে একটি পাসপোর্ট ফাইল, ড্রাইভিং লাইসেন্স কিংবা নামজারির জন্য কত টাকা 'খরচ' দিতে হবে। কিন্তু তখন আপনার জানা থাকে না যে, চাওয়া টাকাটা (ঘুষের) স্বাভাবিক হার নাকি তার দ্বিগুণ। আমরা সেই তথ্যের ঘাটতি মেটাতেই এই উন্মুক্ত লেজার তৈরি করেছি।
সাইফ বলেন, যদি যথেষ্টসংখ্যক মানুষ তাদের কাছে দাবিকৃত টাকার পরিমাণ লিখে রাখেন, তবে পরবর্তীতে যিনি ওই দপ্তরে যাবেন, তিনি আগেই জেনে যাবেন তার কাছে কত টাকা চাওয়া হতে পারে।
ভারতের bribes.fyi নামের একটি ওয়েবসাইট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এই চিন্তা মাথায় আসে বলে জানান সাইফ।
টানা ৩-৪ ঘণ্টা লোডশেডিং: মারা যাচ্ছে মুরগি, দাম বেড়েছে ডিমেরও
ওয়েবসাইটটি দেখে তিনি তার বন্ধু ও সহনির্মাতা সাহেদ শরীফকে পাঠালে— তারা দুজন মিলে মাত্র একদিনের মধ্যে এর বাংলাদেশি সংস্করণটি তৈরি করে ফেলেন।
গত ২৩ আগস্ট পর্যন্ত ঘুষসাইটের তথ্য অনুযায়ী, দেশের আটটি বিভাগজুড়ে ঘুষের দাবি সংক্রান্ত বেশকিছু রিপোর্ট সেখানে জমা পড়েছে। প্ল্যাটফর্মটির শুরুতেই ৪৫৮টি রিপোর্টে প্রায় ২.৪৫ কোটি টাকার ঘুষের দাবির চিত্র উঠে এসেছে।
প্রাথমিক ৪৫৮টি রিপোর্টের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৫৪টি জমা পড়ে ঢাকা বিভাগ থেকে। এরপর চট্টগ্রামে ৯৮টি, সিলেটে ২৪টি, রাজশাহী ও খুলনায় ২২টি করে, ময়মনসিংহে ১৬টি, রংপুরে ১৫টি এবং বরিশালে ৭টি ঘুষের অভিযোগ জানানো হয়।
তবে এসব পরিসংখ্যান সম্পূর্ণভাবে ওয়েবসাইটটিতে ব্যবহারকারীদের নিজেদের দেওয়া ও অযাচাইকৃত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তাই গড় পরিমাণকে একজন সাধারণ সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে চাওয়া টাকার স্বাভাবিক চিত্র হিসেবে বিবেচনা না করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন সাইফ।
ওয়েবসাইটটির সার্বিক প্রক্রিয়া হয় কয়েকটি ধাপে বিভক্ত। প্রথম ধাপে ব্যবহারকারীরা সরকারি দপ্তর, সেবার ধরন, আনুমানিক অবস্থান, টাকার পরিমাণ এবং শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছে তা বিস্তারিত উল্লেখ করেন। একই সাথে কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত নাম বা পরিচয় না লেখার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া থাকে। তথ্য জমা দেওয়ার পর তা প্রকাশের আগে একটি স্বয়ংক্রিয় মডারেশন বা পরিমার্জন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যায়।
জুলাইয়ে এক টাকাও খরচ করতে পারেনি স্বাস্থ্য খাত
সাইফ জানান, প্রকাশিত তথ্য থেকে কারও নাম, ফোন নম্বর, এনআইডি, ফাইলের নম্বর বা অন্যান্য শনাক্তকারী তথ্য এবং আপত্তিকর ভাষা বা স্প্যাম বাদ দিতে একটি ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল স্বয়ংক্রিয়ভাবে লেখাগুলো পরীক্ষা করে। পরিমার্জনের পর যা প্রকাশিত হয় তা হলো—দপ্তরের নাম, সেবার ধরন, আনুমানিক অবস্থান, অর্থের পরিমাণ, ফলাফল এবং কোনো নাম-পরিচয় ছাড়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ। তবে কোনো ঘটনা প্রকৃতপক্ষে ঘটেছে কি না, তা এই ব্যবস্থা সশরীরে যাচাই করে না।
সাইফ বলেন, অধিকাংশ মানুষ ঘুষ দিয়ে তা আর কাউকে বলেন না। বেনামে হলেও এটি প্রকাশ্যে লিখে রাখার মাধ্যমে সেই নীরবতা ভাঙে। এই প্ল্যাটফর্মে জমা পড়া রিপোর্ট বা অভিযোগগুলো বিভাগ, দপ্তর, অর্থের পরিমাণ এবং ফলাফলের ভিত্তিতে সার্চ বা অনুসন্ধান করা যায়।
যেমন একটি রিপোর্টে দাবি করা হয়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মহাখালী অঞ্চলে জন্মনিবন্ধনের জন্য ১০,০০০ টাকা নেওয়া হয়েছে। ব্যবহারকারীর দাবি, শুরুতে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সেবা দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানালেও পরবর্তীতে ঘুষ দাবি করেন।
তবে সাইফ জোর দিয়ে বলেন, এসব রিপোর্টকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে নেওয়া উচিত নয়। আমি শুধু অনুরোধ করব যে প্রতিবেদনে যেন এটি স্পষ্ট থাকে যে তথ্যগুলো যাচাইকৃত নয়। এতে আমাদের সুরক্ষা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি তথ্য প্রদানকারী ব্যক্তিরাও সুরক্ষিত থাকবেন।
ওয়াটার বাস সার্ভিস ব্যর্থ ১২ কারণে
ওয়েবসাইটটি সম্পূর্ণভাবে এর নির্মাতাদের নিজস্ব অর্থায়নে এবং আংশিকভাবে ইচ্ছুক ব্যবহারকারীদের অনুদানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কোনো রিপোর্ট দাখিলের জন্য কোনো অনুদান বা ফি লাগে না।
তাদের প্রত্যাশা, রিপোর্টের সংখ্যা যত বাড়বে, এই পাবলিক লেজারের মাধ্যমে দেশের সরকারি সেবাখাতগুলোতে অনানুষ্ঠানিক অর্থ দাবি বা ঘুষের প্রকৃত চিত্রও ততোটাই স্পষ্টভাবে ফুটে উঠবে।
—জা. অর্থনীতি/এনজে