জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: পণ্য তৈরি হচ্ছে বেইজিংয়ে, কিন্তু মার্কিন বন্দরে গিয়ে পৌঁছাচ্ছে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ কিংবা ‘মেড ইন মেক্সিকো’ লেবেল লাগিয়ে! হোয়াইট হাউসের এমন বিস্ফোরক এক তথ্যে এখন তোলপাড় পুরো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মহল।
মার্কিন প্রশাসনের বাণিজ্য নীতিসংক্রান্ত সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দাবি করা হয়েছে, চীনের তৈরি পণ্য তৃতীয় কোনো দেশে নিয়ে সামান্য প্যাকেজিং বা লেবেল বদলে পুনরায় মার্কিন বাজারে পাঠানো হচ্ছে, যাকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বলা হয় ‘ট্রান্সশিপমেন্ট’।
মেক্সিকো, কানাডা, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারতের মতো প্রায় ৪০টিরও বেশি অংশীদার দেশের মাধ্যমে এই পুনঃচালান পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ ওয়াশিংটনের।
অবাধ বৈশ্বিক বাণিজ্যের যুগ কি শেষ?
তাদের হিসাবমতে, কেবল এক বছরেই প্রায় ৬ হাজার ৭০০ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য এভাবে ঘুরে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকেছে, যার ফলে ওয়াশিংটন হারিয়েছে আনুমানিক ২ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের শুল্ক রাজস্ব।
বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে ভারতের পুনে, গুজরাট ও চেন্নাইয়ের মতো বড় বড় শিল্প হাব।
প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, চীন থেকে বিপুল পরিমাণ পাম্প ও কম্প্রেসরের মতো যন্ত্রাংশ ভারতে এনে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে তা আমেরিকার কলকারখানায় রপ্তানি করা হচ্ছে।
তবে বাণিজ্যিক ডেটা বলছে ভিন্ন কথা। যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের এই জাতীয় যন্ত্রাংশ রপ্তানি মোট বাণিজ্যের এক শতাংশেরও কম।
যুক্তরাষ্ট্রের ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে শুল্কারোপ কানাডার
ভারত সরকার বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা জানিয়ে স্পষ্ট করেছে— তাদের কাস্টমস ও পণ্যের উৎপত্তিস্থল বা ‘রুলস অব অরিজিন’ তদারকির শক্তিশালী আইনি কাঠামো রয়েছে, যা কোনো প্রকার প্রতারণা অনুমোদন করে না।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অভিযোগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইনের স্বাভাবিক উৎপাদনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে।
আজকের গ্লোবালাইজেশনের যুগে এক দেশের কাঁচামাল অন্য দেশে প্রক্রিয়াজাত হয়ে তৃতীয় দেশে রপ্তানি হওয়া সম্পূর্ণ বৈধ ও স্বাভাবিক অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া। উৎপত্তিস্থলের জালিয়াতির সঙ্গে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে গুলিয়ে ফেলা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় খরচ কমাচ্ছে মার্কিনিরা, ওয়ালমার্টে ক্রেতা সংকট
ওয়াশিংটন এখন এআই-ভিত্তিক নজরদারি সীমান্ত চালুর কথা ভাবছে, যা নিয়মিত বাণিজ্যে নতুন পরিদর্শন বিলম্ব ও অশুল্ক বাধার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, তেল আমদানি কিংবা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির দরকষাকষিতে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতেই একের পর এক শুল্ক চাপ ও কঠোর তদন্তের কৌশল নিচ্ছে আমেরিকা।
শুল্কের প্রাচীর তুলে দিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যকে আটকে রাখার চেষ্টা বারবার নতুন নতুন বিকল্প রুট তৈরি করছে। তবে এই বাণিজ্যিক রেষারেষিতে যদি কৃত্রিম বাধা ও অতিরিক্ত শুল্কের বোঝা বাড়ে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ ভোক্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।
বাণিজ্য কূটনীতির এই নতুন লড়াই আন্তর্জাতিক বাজারকে কোন নতুন সংকটের দিকে নিয়ে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
