অনলাইন ডেস্ক: সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি কথা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে- বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নাকি আর মাত্র ১৪ দিন চলার মতো তেল বাকি আছে! এই দাবি শুনে যেকোনো মানুষেরই আঁতকে ওঠার কথা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিশ্বের এক নম্বর অর্থনৈতিক শক্তি এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে শীর্ষ দেশ যুক্তরাষ্ট্রের মতো রাষ্ট্র কি সত্যিই ২ সপ্তাহের মধ্যে তেলশূন্য হয়ে থমকে যাবে? নাকি পুরো বিষয়টিই একটি ভুল হিসাব ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের ফল?
অনলাইনে ভাইরাল হওয়া এই গুজবের পেছনে একটি খুব সরল কিন্তু ত্রুটিপূর্ণ অঙ্ক কষা হয়েছে। দাবিদারদের হিসাবটি বেশ সহজ। যুক্তরাষ্ট্রের জরুরি কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত বা ‘স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ’ (এসপিআর)-এ বর্তমানে তেল রয়েছে প্রায় ২৮ কোটি ৬৬ লাখ ব্যারেল। আর সাধারণ হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন মোট ব্যবহার হয় প্রায় ২ কোটি ৭ লাখ ব্যারেল পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য।
এখন ২৮ কোটি ৬৬ লাখকে ২ কোটি ৭ লাখ দিয়ে ভাগ করলেই উত্তর বের হয়ে আসে প্রায় ১৩.৮ বা ১৪ দিন! আপাতদৃষ্টিতে এই অঙ্ক দেখলে যে কারও মনে হতে পারে, মাত্র ১৪ দিন পরই যুক্তরাষ্ট্রের সব গাড়ি, প্লেন এবং কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে।
কিন্তু এই অঙ্কের ভেতরেই লুকিয়ে রয়েছে বিশাল এক ভুল। আমেরিকার তেল সরবরাহের মূল বা একমাত্র উৎস কখনোই এই কৌশলগত মজুত নয়। ভাইরাল হওয়া এই হিসাবটি বোঝার জন্য একটি দৈনন্দিন জীবনের উদাহরণ দেওয়া যাক। মনে করুন, একটি পরিবারে জরুরি বিপদের সময় বেঁচে থাকার জন্য আলমারিতে কিছু টিনজাত খাবার তুলে রাখা আছে।
এখন পরিবারের প্রতিদিনের মোট খাবারের চাহিদার সঙ্গে যদি আলমারির ওই টিনজাত খাবারের তুলনা করে বলা হয় যে তাদের হাতে মাত্র ১৪ দিনের খাবার আছে- তবে কি সেটা সঠিক হবে? একদমই না! কারণ, সেই হিসাবে বাড়ির ফ্রিজে কী খাবার আছে, প্রতিদিন বাজার থেকে কী কেনা হচ্ছে কিংবা স্থানীয় মুদিদোকানে কত খাবার আছে- তা সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের তেলের ক্ষেত্রেও ঠিক এই ভুলটিই করা হচ্ছে।
আমেরিকা সরকারের নিজস্ব সংস্থা ‘এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ (ইআইএ)-এর তথ্য বিশ্লেষণ করলে পুরো ভিন্ন এক চিত্র ফুটে ওঠে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুধু বসে বসে জমে থাকা তেল খরচ করে না, তারা নিজেরাও প্রচুর তেল উৎপাদন করে। বর্তমানে প্রতিদিন যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিজ দেশ থেকেই উত্তোলন করে।
এর পাশাপাশি তাদের বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলোর কাছে আরও প্রায় ৪২ কোটি ৪৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল জমানো রয়েছে। প্রতিদিন তাদের শোধনাগারগুলোতে ১ কোটি ৭৫ লাখ ব্যারেল তেল প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এর বাইরে প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল তেল আমদানি এবং রপ্তানিও করে দেশটি। ফলে জরুরি মজুত বা এসপিআর ফুরিয়ে যাওয়া মানেই পুরো আমেরিকার তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়।
তবে এই খবরটির কি কোনো সত্যতাই নেই? আসল উদ্বেগের জায়গাটি কোথায়? ন্যাশনাল পাবলিক রেডিও (এনপিআর)-এর প্রতিবেদন এবং সরকারি তথ্যে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশলগত তেলের মজুত সত্যিই গত চার দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। ২০২০ সালের শেষের দিকে যেখানে এই জরুরি ভান্ডারে প্রায় ৬৩ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল তেল ছিল, ২০২৬ সালের আগস্টের শেষে এসে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৮ কোটি ৬৬ লাখ ব্যারেলে। ১৯৮২ সালের পর এই ভান্ডার আর কখনোই এতটা খালি হয়নি।
মূলত করোনা মহামারি পরবর্তী অর্থনীতি সামাল দেওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারের তেলের দাম কমানো এবং বিশ্ব রাজনৈতিক সংকটের কারণে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং জো বাইডেন- দুই প্রেসিডেন্টের আমলেই এই জরুরি ভান্ডার থেকে বিপুল পরিমাণ তেল তুলে বাজারে ছাড়া হয়েছে।
এসপিআর বা এই কৌশলগত মজুতকে একটি ‘বিমা পলিসি’ বা ইনস্যুরেন্সের সাথে তুলনা করা যায়। স্বাভাবিক সময়ে কেউ বিমার টাকায় জীবনধারণ করে না, দেশের নিয়মিত উৎপাদিত ও বাণিজ্যিক তেল দিয়েই সব চলে। কিন্তু বড় কোনো যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক অবরোধ, কিংবা প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের মতো কোনো চরম বিপর্যয় ঘটে গেলে এই জরুরি ভান্ডারই দেশকে রক্ষা করে।
তাই আমেরিকা এখনই ১৪ দিনে অচল হয়ে পড়ছে না ঠিকই, তবে তাদের সেই জরুরি নিরাপত্তার দেয়াল বা 'বিমা পলিসি' যে আগের চেয়ে অনেক বেশি দুর্বল ও সংকুচিত হয়ে পড়েছে- সেটিই মূল দুশ্চিন্তার বিষয়।
মাত্র ১৪ দিনের তেলে চলছে আমেরিকা? খবরটি কি সত্য, নাকি স্রেফ ভুল হিসাব? সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি অংক ভাইরাল হয়েছে, যেখানে বলা হচ্ছে আমেরিকার জরুরি তেলের ভান্ডারে আছে ২৮ কোটি ৬৬ লাখ ব্যারেল তেল, আর দিনে খরচ হয় ২ কোটি ৭ লাখ ব্যারেল। ফলে মাত্র ১৪ দিনেই নাকি ফুরিয়ে যাবে তেল! কিন্তু আসল সত্যি হলো, এই জরুরি ভান্ডার ছাড়াও আমেরিকা প্রতিদিন ১ কোটি ৩৯ লাখ ব্যারেল তেল নিজেই উৎপাদন করে। তাই ১৪ দিনে আমেরিকা অচল হওয়ার খবরটি ভুল, তবে চার দশকের মধ্যে তাদের জরুরি তেলের ভান্ডার সবচেয়ে নিচে নেমে গেছে- এটা পুরোপুরি সত্যি।
আমেরিকার জরুরি তেলের ভান্ডার খালি হয়ে আসছে! চার দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেলের মজুত। ২০২০ সালে যেখানে ৬৩ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল তেল জমানো ছিল, বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৮ কোটি ৬৬ লাখ ব্যারেলে!
সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং জো বাইডেন- উভয়ের আমলেই আন্তর্জাতিক বাজার সামাল দিতে বিপুল পরিমাণ জরুরি তেল তুলে খরচ করা হয়েছে। যদিও আমেরিকা এখনই তেলশূন্য হয়ে পড়ছে না, তবে হঠাৎ কোনো বড় যুদ্ধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে এই খালি হতে যাওয়া ভান্ডার দেশটির নিরাপত্তার জন্য ডেকে আনতে পারে চরম বিপদ!
—জা. অর্থনীতি/এলএটি
