ড. তোফাজ্জল ইসলাম গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ অনুষদের ডিন এবং ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক ও প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। তিনি ২০০২ সালে জাপানের হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অ্যাপ্লায়েড বায়োসায়েন্সে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। জেএসপিএস, হুমবোল্ডট, কমনওয়েলথ ও ফুলব্রাইট ফেলোশিপের আওতায় জাপান, জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্টডক গবেষণা করেছেন। আমেরিকান ফাইটোপ্যাথলজিক্যাল সোসাইটি, বিশ্ব বিজ্ঞান একাডেমি ও বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমীর নির্বাচিত ফেলো। সম্প্রতি গবেষণালব্ধ জ্ঞান ও প্রযুক্তির বড় অংশ বাজারে পৌঁছায় না, কারণ অ্যাকাডেমিয়া, শিল্প খাত ও সরকারের মধ্যে ‘ট্রিপল হেলিক্স’ কাঠামো গড়ে তোলার দুর্বলতা, গবেষণাকে পণ্য ও সেবায় রূপান্তরের কার্যকর বাণিজ্যিক সেতু হিসেবে গড়ে তোলা, ব্রেইন ড্রেন’কে ‘ব্রেইন গেইন’-এ রূপান্তরের কৌশলসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন দৈনিক জাতীয় অর্থনীতি’তে।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দিদারুল হক
জাতীয় অর্থনীতি: দেশে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু গবেষণালব্ধ জ্ঞান ও প্রযুক্তির বড় অংশ কেন বাজারে পৌঁছাতে পারছে না? ‘ল্যাব টু মার্কেট’ বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক বাধা কোথায়?
ড. তোফাজ্জল: প্রশ্নটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। বর্তমানে দেশের ১৭৩টি বিশ্ববিদ্যালয় ও শতাধিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিবছর হাজার হাজার গবেষণাপত্র প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু এসব গবেষণার সিংহভাগই কেবল অ্যাকাডেমিক স্বীকৃতি বা জার্নালের পাতাতেই আটকে থাকছে। সাধারণ মানুষ বা বাজারে তার সুফল পৌঁছাচ্ছে না। ফলে বিপুল মেধা ও সময়ের বিনিয়োগ সত্ত্বেও আমাদের জাতীয় অর্থনীতি ও জনজীবনে গবেষণালব্ধ জ্ঞান ও উদ্ভাবনের কাঙ্ক্ষিত প্রভাব দৃশ্যমান হচ্ছে না।
‘ল্যাব টু মার্কেট’ বা গবেষণাগার থেকে বাজারে উদ্ভাবন পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক বাধা হলো অ্যাকাডেমিয়া (বিশ্ববিদ্যালয়), শিল্প খাত এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব। এছাড়া সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নীতি আধুনিকায়ন না হওয়া আরেকটি বড় প্রতিবন্ধকতা। উদাহরণস্বরূপ, ২০১২ সালের ‘জাতীয় জীবপ্রযুক্তি নীতি’ গত এক যুগেও হালনাগাদ করা হয়নি। অথচ এ সময়ে জিনোম এডিটিং ও আধুনিক জিনোমিক প্রযুক্তির মতো বৈপ্লবিক উদ্ভাবন বিশ্বজুড়ে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতকে বদলে দিয়েছে। পুরোনো নীতি দিয়ে নতুন এসব প্রযুক্তির বাণিজ্যিক প্রয়োগ বা বাজারজাতকরণ সম্ভব হচ্ছে না।
একইসঙ্গে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামোয় মেধাস্বত্ব (পেটেন্ট ও কপিরাইট) সুরক্ষা এবং উদ্ভাবন বাণিজ্যিকীকরণের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থার চরম ঘাটতি রয়েছে। গবেষণালব্ধ প্রযুক্তি বাজারে গেলে গবেষক এবং প্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিকভাবে কীভাবে লাভবান হবেন— তার স্পষ্ট ‘রেভিনিউ শেয়ারিং’ নীতিমালা না থাকায় গবেষকদের মধ্যেও বাণিজ্যিক রূপান্তরের উৎসাহ কম থাকে। পাশাপাশি, গবেষণাগারের উদ্ভাবনকে বাজারে নেওয়ার মধ্যবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে প্রয়োজনীয় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের উপযোগী পরিবেশ এখনও গড়ে ওঠেনি।
এই স্থবিরতা কাটাতে হলে কেবল গবেষণাপত্র প্রকাশের উদ্দেশ্যে গবেষণা না করে, শিল্প খাত ও সমাজের বাস্তব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে ‘চাহিদাভিত্তিক গবেষণা’য় গুরুত্ব দিতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুযায়ী যৌথ অর্থায়নে গবেষণা পরিচালনা, উদ্ভাবনবান্ধব আইন তৈরি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নিশ্চিত করাই ‘ল্যাব টু মার্কেট’ বাস্তবায়নের মূল চাবিকাঠি। গবেষণার প্রকৃত সার্থকতা কেবল পেপারের সংখ্যায় নয়, বরং অর্থনীতিতে তার প্রকৃত অবদান ও মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমেই নির্ধারিত হওয়া উচিত।
জাতীয় অর্থনীতি: অ্যাকাডেমিয়া, শিল্প খাত ও সরকারের মধ্যে ‘ট্রিপল হেলিক্স’ কাঠামো গড়ে তুলতে বাংলাদেশের বর্তমান ঘাটতিগুলো কী এবং এ ক্ষেত্রে কোন ধরনের নীতিগত পরিবর্তন সবচেয়ে জরুরি?
ড. তোফাজ্জল: বাংলাদেশে অ্যাকাডেমিয়া, শিল্প খাত ও সরকারের সমন্বয়হীনতাই ‘ট্রিপল হেলিক্স’ কাঠামো গড়ে ওঠার প্রধান বাধা। গবেষণা ও প্রকাশনা হলেও তার বাণিজ্যিক প্রয়োগের কার্যকর ব্যবস্থা নেই; পাশাপাশি রয়েছে আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি।
এই স্থবিরতা কাটাতে বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সকে ‘ক্যাটালিস্ট’ বা অনুঘটক হিসেবে ভূমিকা রাখতে হবে। জাতীয় অগ্রাধিকার ও শিল্প খাতের বাস্তব চাহিদা চিহ্নিত করে সরকার, শিল্প খাত ও অ্যাকাডেমিয়ার যৌথ অর্থায়নে নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও সময়সীমানির্ভর গবেষণা পরিচালনা করা জরুরি।
একইসঙ্গে পেটেন্ট ও কপিরাইটের মাধ্যমে মেধাস্বত্ব সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং ভেঞ্চার ক্যাপিটালসহ সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শুধু সড়ক বা সেতুর মতো ভৌতিক অবকাঠামো নয়, জ্ঞান সৃষ্টি ও জ্ঞানভিত্তিক বাণিজ্যিকীকরণকেও জাতীয় উন্নয়নের ‘মেগা প্রকল্প’ হিসেবে গণ্য করতে হবে। এতে সাধারণ গবেষণাকেন্দ্রিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘উদ্ভাবন-ইকোসিস্টেম’ গড়ে উঠবে।
এই রূপান্তরে বিজ্ঞানী, শিল্পোদ্যোক্তা, নীতিনির্ধারক ও জনগণের মধ্যে সংলাপের ক্ষেত্র তৈরিতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মূলত একটি কার্যকর ট্রিপল হেলিক্সের জন্য কেবল তিন পক্ষের উপস্থিতিই যথেষ্ট নয়— প্রয়োজন নিয়মিত সমন্বয়, যৌথ অর্থায়ন, চাহিদাভিত্তিক গবেষণা এবং বাজারজাতকরণের জন্য একটি সমন্বিত নীতিকাঠামো।
জাতীয় অর্থনীতি: বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ও ‘ইনোভেট টু মার্কেট’ প্ল্যাটফর্মকে কীভাবে শুধু প্রদর্শনী বা নেটওয়ার্কিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে গবেষণাকে পণ্য ও সেবায় রূপান্তরের কার্যকর বাণিজ্যিক সেতু হিসেবে গড়ে তোলা যায়?
ড. তোফাজ্জল: বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ারকে কেবল প্রদর্শনী, পুরস্কার বা নেটওয়ার্কিংয়ের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে উদ্ভাবন বাণিজ্যিকীকরণের কার্যকর প্ল্যাটফর্মে রূপ দিতে হবে। সম্প্রতি ১৭৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণে যেসব সম্ভাবনাময় উদ্ভাবন চিহ্নিত হয়েছে, সেগুলোকে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যাওয়াটাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।
এজন্য সম্ভাবনাময় উদ্ভাবকদের সঙ্গে সরকার, শিল্প খাত, ব্যাংক ও ভেঞ্চার ক্যাপিটালের সমন্বয়ে বাণিজ্যিকীকরণ কর্মশালা আয়োজন করা প্রয়োজন। এতে উদ্ভাবনের বাজার সম্ভাবনা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও উৎপাদন ব্যয় নির্ধারণ করে সরাসরি মূলধন, অবকাঠামো ও স্টার্টআপ সহায়তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
মূলত ‘ইনোভেট টু মার্কেট’ প্রক্রিয়াকে ধারাবাহিক রূপ দিতে হবে— উদ্ভাবন চিহ্নিতকরণ ও প্রোটোটাইপ থেকে শুরু করে বিনিয়োগ, শিল্প অংশীদারিত্ব, পরীক্ষামূলক উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণ পর্যন্ত। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে এ ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হলে ইনোভেশন ফেয়ারের উদ্ভাবনগুলো বাস্তব সমস্যার সমাধান ও অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টিকারী পণ্য ও সেবায় রূপান্তরিত হবে।
জাতীয় অর্থনীতি: দেশে উদ্ভাবনের মেধাস্বত্ব, পেটেন্ট ও প্রযুক্তি স্থানান্তর প্রক্রিয়া কতটা জটিল? গবেষকদের উদ্ভাবন দ্রুত পেটেন্ট ও বাণিজ্যিকীকরণের আওতায় আনতে কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন?
ড. তোফাজ্জল: গবেষণালব্ধ উদ্ভাবনকে বাণিজ্যিক রূপ দিতে কার্যকর মেধাস্বত্ব ও পেটেন্ট ব্যবস্থা অপরিহার্য। তবে বাংলাদেশে আইনি সহায়তার ঘাটতি, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও পদ্ধতিগত দীর্ঘসূত্রতার কারণে দেশীয় উদ্ভাবকদের পেটেন্ট আবেদনের হার অত্যন্ত কম; যা বহু সম্ভাবনাময় প্রযুক্তিকে বাজারে পৌঁছানোর আগেই থমকে দিচ্ছে।
এই স্থবিরতা কাটাতে একটি আধুনিক জাতীয় উদ্ভাবন ও বিজ্ঞান নীতি প্রণয়ন করা জরুরি। এই নীতির আওতায় বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পৃথক পেটেন্ট বাজেট বরাদ্দ, গবেষকদের পেশাদার আইনি ও কারিগরি সহায়তা প্রদান এবং রাষ্ট্রীয় খরচে পেটেন্ট নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
একইসঙ্গে পেটেন্ট অফিসের সক্ষমতা ও গতি বাড়িয়ে আবেদন প্রক্রিয়া সহজীকরণ করা প্রয়োজন। একটি স্বচ্ছ, দ্রুত ও গবেষকবান্ধব পেটেন্ট পরিকাঠামো গড়ে তোলা গেলে বিদেশি প্রযুক্তির ওপর অন্ধ নির্ভরতা কমবে। ফলে সুরক্ষিত দেশীয় উদ্ভাবনগুলো জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য যোগ করার পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজারেও নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
জাতীয় অর্থনীতি: প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মেধাবী গ্র্যাজুয়েট ও গবেষক তৈরি হলেও দেশে গবেষণা ও কর্মসংস্থানের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় মেধা পাচার হচ্ছে। এ প্রবণতা রোধ করে ‘ব্রেইন ড্রেন’কে কীভাবে ‘ব্রেইন গেইন’-এ রূপান্তর করা সম্ভব?
ড. তোফাজ্জল: প্রশ্নটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে কাজের সূত্রে প্রতিদিন আমার ল্যাবের অর্ধশতাধিক তরুণ গবেষকের চোখে আমি যে প্রচ্ছন্ন উদ্বেগ দেখি, তা হলো পড়াশোনা শেষে বিদেশে পাড়ি জমানোর অদম্য তাগিদ। দেশে বিশ্বমানের গবেষণার অবকাঠামো, মেধার সঠিক মূল্যায়ন ও ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের নিশ্চয়তা না থাকায় তাদের এই বিদেশমুখিতা। রাষ্ট্র বিপুল অর্থ ব্যয় করে যে আন্তর্জাতিক মানের মানবসম্পদ তৈরি করছে, তার প্রকৃত সুফল তুলে নিচ্ছে উন্নত বিশ্ব। এ প্রেক্ষাপটে ‘ব্রেইন ড্রেন’কে কেবল মেধা পাচার হিসেবে না দেখে, নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে তা ‘ব্রেইন গেইন’ ও ‘ব্রেইন সার্কুলেশন’ -এ রূপান্তর করা এখন জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন।
প্রথমত, আমাদের গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আমূল সংস্কার প্রয়োজন। উচ্চ অর্থায়নের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি দরকার রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, স্বচ্ছ ও কঠোর মেধাভিত্তিক (Meritocratic) পরিবেশ প্রতিষ্ঠা। একজন আন্তর্জাতিক মানের গবেষককে আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত পূর্ণ অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা, সামাজিক মর্যাদা এবং যৌক্তিক আর্থিক নিরাপত্তা দিতে হবে যাতে দেশের সেরা মেধাবীরা আমলাতন্ত্র বা অন্যান্য পেশার পরিবর্তে বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনকে প্রধান ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নিতে উৎসাহিত হন।
দ্বিতীয়ত, বিদেশে অবস্থানরত মেধাবীদের ফিরিয়ে আনতে চীন, তাইওয়ান ও ভারতের মতো কৌশলগত ‘ট্যালেন্ট রিপ্যাট্রিয়েশন’ বা মেধা প্রত্যাবর্তন উদ্যোগ নিতে হবে। অক্সফোর্ড, হার্ভার্ড, এমআইটি কিংবা কর্নেলে অবস্থানরত যেসব বাংলাদেশি গবেষকের দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা রয়েছে, তাদের দেশে ফেরাতে বিশেষ ‘ইনকিউবেশন প্যাকেজ’ দিতে হবে— যার মধ্যে থাকবে আলাদা গবেষণা তহবিল, বিশ্বমানের ল্যাব সুবিধা, স্টার্টআপ ফান্ডিং ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা। আর যারা স্থায়ীভাবে দেশে ফিরতে পারছেন না, তাদের মেধা ও বৈশ্বিক নেটওয়ার্ককে কাজে লাগাতে ‘ব্রেইন সার্কুলেশন’ মডেল গ্রহণ করা জরুরি, যেখানে যৌথ গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে প্রবাসী বিজ্ঞানীরা সরাসরি দেশীয় গবেষক ও শিক্ষায়তনের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন।
তৃতীয়ত, আমাদের ফেলোশিপ ও উচ্চশিক্ষার কৌশলে পরিবর্তন আনতে হবে। শতভাগ সরকারি খরচে বিদেশে পিএইচডি পাঠানোর পাশাপাশি ‘স্যান্ডউইচ পিএইচডি মডেল’ ব্যাপকভাবে চালু করা যেতে পারে। এই মডেলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ তত্ত্বাবধানে গবেষণার একটি অংশ বিদেশের উন্নত ল্যাবে এবং অপর অংশটি দেশে সম্পন্ন হবে। ফলে অর্জিত জ্ঞান ও উদ্ভাবন সরাসরি বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, জীবপ্রযুক্তি ও জলবায়ু সংকটের মতো জাতীয় অগ্রাধিকারমূলক সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
পরিশেষে মেধা ধরে রাখা কোনো সাময়িক কর্মসূচির বিষয় নয়। পিএইচডি শেষে দেশে ফেরা গবেষকদের জন্য সুনির্দিষ্ট ক্যারিয়ার ট্র্যাকিং, গবেষণা নেতৃত্ব ও ল্যাব বরাদ্দের একটি স্থায়ী সমন্বিত নীতিকাঠামো প্রয়োজন। মেধাভিত্তিক নিয়োগ, অর্থনৈতিক প্রণোদনা, গবেষণার স্বাধীনতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ইতিবাচক মেলবন্ধন ঘটানো গেলে ‘ব্রেইন ড্রেন’ প্রতিরোধ করে বাংলাদেশকে একটি টেকসই জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর করা সম্ভব।
জাতীয় অর্থনীতি: বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের দেশের গবেষণা ও শিল্প খাতে যুক্ত করতে কী ধরনের ‘রিটার্নিং ট্যালেন্ট’ বা ‘অফশোর-অনশোর’ মডেল কার্যকর হতে পারে?
ড. তোফাজ্জল: প্রবাসী বিজ্ঞানীদের মেধা ও অভিজ্ঞতা যুক্ত করতে একটি জাতীয় মহাপরিকল্পনার অধীনে ‘অফশোর-অনশোর হাইব্রিড মডেল’ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। চীনের ‘থাউজেন্ড ট্যালেন্ট’ কর্মসূচির আদলে বাংলাদেশেও একটি ‘রিটার্নিং ট্যালেন্ট ইনসেন্টিভ প্রোগ্রাম’ চালু করা যেতে পারে, যার মাধ্যমে প্রাথমিক ধাপে অন্তত এক হাজার উচ্চদক্ষতাসম্পন্ন প্রবাসী গবেষককে আকৃষ্ট করা সম্ভব। তবে কেবল ফিরিয়ে আনাই যথেষ্ট নয়; তাইওয়ানের বিখ্যাত ‘সিনচু সায়েন্স পার্ক’-এর মডেলে বিশেষায়িত প্রযুক্তি অঞ্চল গড়ে তুলে বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প খাত ও স্টার্টআপের সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে তাদের যুক্ত করতে হবে।
প্রবাসী বিজ্ঞানীদের ধরে রাখতে প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা অনুদান, অত্যাধুনিক ল্যাব, কর-সুবিধা এবং প্রশাসনিক ও গবেষণার পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে যারা স্থায়ীভাবে ফিরতে পারছেন না, তারা যেন দূর থেকে কিংবা সাময়িকভাবে দেশে এসে যৌথ গবেষণায় যুক্ত থাকতে পারেন— অর্থাৎ অনশোর ও অফশোর দুই ধরনের সক্ষমতাকেই একই নীতিকাঠামোয় সংযুক্ত করতে হবে। এই প্রবাসী গবেষকরা কেবল নিজেদের গবেষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকবেন না, বরং দেশীয় গবেষকদের বৈশ্বিক মানদণ্ডে উন্নীত করতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করবেন।
এজন্য কেবল ভৌত অবকাঠামো নয়, বরং মেধা পাচার রোধ, প্রবাসী মেধা আকর্ষণ, শিল্প-অ্যাকাডেমিয়া সংযোগ এবং জ্ঞানভিত্তিক বাণিজ্যিকীকরণের একটি পূর্ণাঙ্গ ‘উদ্ভাবন ইকোসিস্টেম’ গড়ে তোলাকে জাতীয় ‘মেগা প্রজেক্ট’ হিসেবে গণ্য করা উচিত। প্রযুক্তির অন্ধ ভোক্তা হয়ে থাকলে বাংলাদেশ নিছক বিদেশি পণ্যের বাজারে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে দেশের মেধাকে প্রযুক্তিতে রূপান্তর করে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানো এবং তা বিশ্ববাজারে রপ্তানি করা।
আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠী ও মেধাবী গবেষক রয়েছে। তবে বড় ঘাটতি হলো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, উদ্যোক্তা সংস্কৃতি ও ফলাফলমুখী উদ্যোগের। সেমিনার-কেন্দ্রিক ক্ষণস্থায়ী প্রচারণার বাইরে গিয়ে প্রবাসী মেধা, দেশীয় সম্ভাবনা, শিল্প খাত ও সরকারি নীতিকে একই প্রাতিষ্ঠানিক সূত্রে বাঁধতে হবে। এই সমন্বিত প্রয়াসই বাংলাদেশকে প্রযুক্তির নিছক গ্রাহক থেকে বৈশ্বিক উদ্ভাবক ও রপ্তানিকারক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করতে পারে।
[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, অনুবাদ, প্রতিক্রিয়া ও চিঠিপত্রে প্রকাশিত মতামত, উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব। এগুলোর সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতির সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সর্বদা মিল না-ও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখার বিষয়ে জাতীয় অর্থনীতি কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ]