সার আছে গুদামে, কৃষকের হাতে সংকট
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি: ধানের চারা সবুজ হয়েছে, মাঠজুড়ে নতুন ফসলের স্বপ্ন। কিন্তু ধানের পরিচর্যার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ঝিনাইদহের কৃষকেরা। দিনের পর দিন দোকানে ঘুরেও অনেকে ফিরছেন খালি হাতে। অথচ কৃষি বিভাগের দাবি, জেলার চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত সার বরাদ্দ ও মজুত রয়েছে।

কৃষকদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত দামে সার চাইলে অনেক দোকানে সংকটের কথা বলা হচ্ছে। আবার বাড়তি দাম দিতে রাজি হলে কোথাও কোথাও সেই সারই পাওয়া যাচ্ছে। ফলে গুদামে পর্যাপ্ত মজুত থাকার দাবি আর মাঠে কৃষকের সার না পাওয়ার বাস্তবতায় তৈরি হয়েছে অসঙ্গতি।

ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার দামুকদিয়া গ্রামের কৃষক টিপু সুলতান চলতি মৌসুমে দুই বিঘা জমিতে ধানের আবাদ করেছেন। জমিতে ধানের চারা বেড়ে উঠছে। এ সময়ে প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগ করতে না পারায় দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।

টিপু সুলতান বলেন, সময়মতো সার দিতে না পারলে ধানের ফলন কমে যেতে পারে। কিন্তু প্রয়োজনের সময় সার পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক দোকানে ঘুরেও সার মিলছে না। কোথাও কোথাও বাড়তি টাকা দিলে সার পাওয়া যায় বলে শুনছেন তিনি। এভাবে চললে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি খরচও বাড়বে।

তার মতো একই অভিযোগ জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকের। ধানের পরিচর্যার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করতে সকাল থেকে দোকানে দোকানে ঘুরছেন তারা। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অনেকে চাহিদার তুলনায় কম সার পাচ্ছেন, আবার কেউ কেউ ফিরছেন খালি হাতে।

কৃষকদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত দামে সার বিক্রির কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই তার ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। নির্ধারিত দামে সার চাইলে সংকটের কথা বলা হলেও বাড়তি দাম দিতে রাজি হলে কোথাও কোথাও সার পাওয়া যাচ্ছে। তাদের প্রশ্ন, সরকারি দামে সার না থাকলে বাড়তি দামে একই সার কীভাবে পাওয়া যাচ্ছে?

শৈলকুপার কৃষক উজ্জল মিয়া বলেন, জমিতে এখনই সার প্রয়োজন। কয়েকদিন পর দিলে সেই ঘাটতি পূরণ করা কঠিন। কিন্তু দোকানে গেলে সার নেই বলে জানানো হয়। অথচ বেশি দাম দিতে চাইলে সার পাওয়া যায়। বাড়তি দামে সার কেনার সামর্থ্য সব কৃষকের নেই।

আরেক কৃষক মাসুদ মোল্লা বলেন, ধানের আবাদে সার না দিলে ফলন হবে না। সার যদি গুদামে থাকে, তাহলে কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে না কেন, সেটাই তাদের প্রশ্ন। সরকারি দামে প্রয়োজনীয় সার পাওয়ার নিশ্চয়তা চান তারা।

কৃষকদের ভাষ্য, ধানের আবাদে প্রতিটি ধাপের সঙ্গে সময়ের হিসাব জড়িত। জমিতে যখন যে সার প্রয়োজন, তখনই তা প্রয়োগ করতে হয়। নির্ধারিত সময়ে সার দিতে না পারলে পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত সার দিয়েও সবসময় সেই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হয় না। এতে ধানের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তাদের অভিযোগ, সারের সংকট কিংবা বাড়তি দামে সার কিনতে হলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ছুটতে গিয়ে নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান সময়ও। তাই গুদাম থেকে ডিলার, ডিলার থেকে খুচরা বিক্রেতা এবং কৃষকের হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন তারা।

কৃষকদের দাবি, প্রকৃতপক্ষে কোথাও সরবরাহ ঘাটতি রয়েছে, নাকি মজুত থাকা সত্ত্বেও বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তবে কৃষি বিভাগের হিসাবে জেলার চিত্র ভিন্ন। তাদের দাবি, কৃষকের চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত সার বরাদ্দ রয়েছে। ফলে জেলায় সার সংকটের কোনো কারণ নেই।

ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, জেলায় সারের কোনো সংকট নেই। কৃষকের চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত সার বরাদ্দ রয়েছে। কোথাও নির্ধারিত দামের বেশি নেওয়া বা সার না দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, কোনো কৃষক সার না পাওয়া বা বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ করলে কৃষি বিভাগকে জানালে বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরকারি হিসাবে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকার পরও মাঠে কৃষকের প্রয়োজনের সময়ে তা না পাওয়ার অভিযোগের সমাধান এখন সরবরাহ ব্যবস্থার কার্যকর নজরদারির ওপরই নির্ভর করছে। কৃষকদের প্রত্যাশা, গুদাম থেকে তাদের হাতে সার পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নিশ্চিত করা হবে স্বাভাবিক সরবরাহ ও নির্ধারিত দামে বিক্রি।  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি