গুরুত্ব কমছে পর্যটন খাতে চূড়ান্ত হয়নি মহাপরিকল্পনা

মোফাজ্জল বিদ্যুৎ, ঢাকা: স্বাধীনতার ৫৪ বছরে দেশের প্রায় সব খাত কমবেশি মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানও রাখছে। তবে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে খাতটির উন্নয়ন ও প্রসারে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ শুরু হলেও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি সম্ভাবনাময় পর্যটন খাত। প্রশাসনিক জটিলতা আর সমন্বয়হীনতায় সমন্বিত এবং চূড়ান্ত মহাপরিকল্পনার অনুমোদন এখনও হয়নি। ফলে নাজুক পরিস্থিতিতে রয়েছে এ খাত। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা ঘাটতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিকমানের সেবার ঘাটতিতে পর্যটকদের আগমন ধারাবাহিকভাবে কমছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু পর্যটনের ওপর ভর করে বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তবে পর্যটন উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা পর্যটনকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতি, দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা, পর্যাপ্ত প্রচারণার অভাব, পর্যটনসেবার মান, দক্ষ জনবলের সংকট এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি। একইসঙ্গে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলাও বড় চ্যালেঞ্জ।

খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রচারের অভাব, সমন্বয়হীনতা, পরিকল্পনার ঘাটতি এবং পরিবেশ তৈরি করতে না পারায় বছরের পর বছর খুঁড়িয়ে চলছে দেশের পর্যটন খাত। পর্যটন খাতের প্রধান সমস্যা হলো প্রচার-প্রচারণার অভাব। দেশের বাইরে পর্যটনকেন্দ্রগুলো নিয়ে কোনো প্রচার হয় না। ফলে বিদেশি পর্যটকরা আকর্ষিত হন না। এছাড়া বর্তমানে নিরাপত্তা ঘাটতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পর্যটকদের চাহিদামাফিক আন্তর্জাতিকমানের সেবার ঘাটতিতে পর্যটকদের আগমন ধারাবাহিকভাবে কমছে।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য বলছে, কোভিড মহামারির বড় ধাক্কা সামলে ২০২৩ সালে বাংলাদেশ পর্যটক বৃদ্ধিতে নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে। তবে মহামারি-পরবর্তী দুই বছর ধরে পর্যটক আগমনের সংখ্যায় ধারাবাহিকভাবে পতন ঘটছে। ২০১৮ সালে দেশে মোট ৫ লাখ ৫২ হাজার ৭৩০ জন পর্যটকের আগমন ঘটে। এর পরের বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে পর্যটক আগমনের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৬ লাখ ২১ হাজার ১৩১ জনে। তবে ২০২০ সালে বৈশ্বিক করোনা মহামারির প্রাদুর্ভাবের কারণে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও ভ্রমণ স্থবির হয়ে পড়ে। একইসঙ্গে দেশের পর্যটন খাতে বড় ধরনের ধস নামে। ওই বছর বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ৮১ হাজার ৫১৮ জনে। মহামারির সেই স্থবিরতা অব্যাহত ছিল পরের বছরেও। ২০২১ সালে পর্যটক আগমন আরও হ্রাস পেয়ে নেমে আসে ১ লাখ ৩৫ হাজার ১৮৬ জনে যা সংগৃহীত আট বছরের তথ্যের মধ্যে সর্বনিম্ন।

ট্যুরিজম বোর্ডের ভাষ্য, কোভিড মহামারির বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ার পর ২০২২ সাল থেকে দেশের পর্যটন খাত আবারও ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। ওই বছর দেশে ৫ লাখ ২৯ হাজার ২৬৮ জন পর্যটক আগমন করেন। ঘুরে দাঁড়ানোর এই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালে পর্যটক আগমন সর্বোচ্চ রেকর্ড চূড়ায় পৌঁছায়; ওই বছর রেকর্ড ৬ লাখ ৫৫ হাজার ৪৫১ জন পর্যটক বাংলাদেশ ভ্রমণ করেন।

তবে ২০২৩ সালের রেকর্ড সাফল্যের পর ২০২৪ সাল থেকে পর্যটক আগমনের চিত্রে আবারও স্থবিরতা ও মন্দাভাব দেখা দেয়। ২০২৪ সালে পর্যটকের সংখ্যা কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৩৩ হাজার ৯৪ জনে। পর্যটক হ্রাসের এই নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত থাকে ২০২৫ সালেও, যেখানে আগমনী পর্যটকের সংখ্যা আরও কমে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৫ হাজার ১৪৫ জনে।

তথ্য অনুযায়ী, দেশে পর্যটকদের আগমনের তালিকায় শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় রয়েছে ভারত, যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, জাপান, ইতালি, জার্মানি, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়া। তবে ২০২৪ সালের ছাত্র-অভ্যুথানের পর পর্যায়ক্রমে পাকিস্তানি পর্যটকদের আগমন বাড়ছে।

এদিকে নতুন অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিকমানের সেবা চালুর মাধ্যমে বাংলাদেশকে অন্যতম পর্যটনবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে তৈরি করা হয় মহাপরিকল্পনা। তবে এই মহাপরিকল্পনা কাগজকলমে সীমাবদ্ধ। পর্যটন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে ২৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা খরচ করে আন্তর্জাতিক পরামর্শক সংস্থা আইপিই গ্লোবালকে দিয়ে পর্যটন মহাপরিকল্পনা তৈরি করে আওয়ামী লীগ সরকার। ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু হলেও শেষ হয় ২০২৩ সালের জুনে। এরপর প্রশাসনিক বিভিন্ন জটিলতা আর সরকারি দপ্তরের সমন্বয়হীনতার কারণে কাজ আর এগোয়নি। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার আগের মহাপরিকল্পনার খসড়াটি আবার পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেয়। এজন্য রিভিউ কমিটি করা হয়। রিভিউ শেষে জুলাই মাসে এটি জাতীয় পর্যটন কাউন্সিলে (এনটিসি) অনুমোদন হওয়ার কথা থাকলেও এখনও সুনিশ্চিত খবর মেলেনি।

জানা গেছে, মহাপরিকল্পনায় দেশজুড়ে ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন সম্পদ চিহ্নিত করা হয়। দেশকে আটটি অঞ্চল ও ৫১টি ক্লাস্টারে ভাগ করে পর্যটনকেন্দ্রিক উন্নয়ন প্রকল্প ও পদক্ষেপ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়।

খাতসংশ্লিষ্টদের আশা, ২০২৪ থেকে ২০৪১ সাল মেয়াদে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন শেষে বছরে অন্তত ৫৫ লাখ ৮০ হাজার বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে আসবে যা বর্তমানের চেয়ে ১০ গুণের বেশি। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে অন্তত ২ কোটি ১৯ লাখ ৪০ হাজার মানুষের। তবে কাগুজে সেই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ আর দৃশ্যমান হয়নি।


গতকাল শনিবার সংবাদ সম্মেলনে মহাপরিকল্পনা চূড়ান্তের ব্যাপারে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, দেশের পর্যটন খাতের ডিজিটাল রূপান্তর এবং সার্বিক উন্নয়নে খণ্ড খণ্ড পদক্ষেপের পরিবর্তে একটি সুদূরপ্রসারী ও সমন্বিত মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করার কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। এ পরিকল্পনা প্রণয়নে ব্যাপক গবেষণা ও গভীর বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে, কারণ দীর্ঘদিন ধরে সঠিক তথ্য-উপাত্তের অভাব এবং সমৃদ্ধ তথ্যভাণ্ডার না থাকায় দেশের জন্য অন্যতম বড় দুর্বলতা। এ ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে মাঠপর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা এবং প্রতিটি পর্যটন গন্তব্যে সরেজমিন গিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। সংগৃহীত তথ্যগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার মাধ্যমে চলতি অক্টোবর মাসের মধ্যেই মহাপরিকল্পনাটি চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী। তিনি বলেন, সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আগামী নভেম্বর মাসের মধ্যে পরিকল্পনাটি পুরোপুরি চূড়ান্ত করা হবে এবং ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এটি জাতীয় পর্যটন পরিষদের বৈঠকে উপস্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

মহাপরিকল্পনা তৈরি করলেই পর্যটন খাতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না বলে উল্লেখ করেন দ্য বেঙ্গল ট্যুরস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাসুদ হোসেন। তার মতে, সরকারকে প্রথমে পর্যটন পণ্য চিহ্নিত করে সেগুলো আন্তর্জাতিকমানে উন্নীত করতে হবে। পরে পর্যটকদের লক্ষ্য করে প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। সঠিক বাজারে সঠিক পর্যটন পণ্যের প্রচার নিশ্চিত করা জরুরি। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের পর্যটনকে তুলে ধরতে বিভিন্ন দেশে প্রচার কার্যক্রম, পর্যটন মেলা এবং বাংলাদেশের দূতাবাস ও হাইকমিশনগুলোকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন মাসুদ হোসেন। তিনি বলেন, বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের ক্ষেত্রে প্রচার বাংলাদেশের অন্যতম বড় ঘাটতি। পর্যটকদের প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহের পাশাপাশি বাংলাদেশের পর্যটন গন্তব্যগুলোর বিষয়ে আরও জোরাল প্রচার প্রয়োজন।

আজ রোববার ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস। ‘ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে রোববার থেকে শুরু হচ্ছে বিশ্ব পর্যটন দিবসের সপ্তাহব্যাপী আয়োজন। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এসব কর্মসূচিতে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন, ট্যুরিস্ট পুলিশসহ মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন সংস্থা এবং পর্যটন খাতের সরকারি-বেসরকারি অংশীজনরা অংশ নেবেন।