জাতীয় অর্থনীতি আন্তর্জাতিক: ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, একসঙ্গে বসবাসকারী (লিভ টুগেদার) সঙ্গীকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানানো মানেই আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়া নয়। আদালতের ভাষ্য, ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে মানুষের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হয়। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর কেউ আত্মহত্যা করলে সেটিকে সব সময় প্ররোচনা বলা যায় না। দেশটির তেলেঙ্গানা রাজ্যের এক তরুণীর মৃত্যুকে ঘিরে দায়ের করা মামলা বাতিল করে বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা ও বিচারপতি কে বিনোদ চন্দ্রনের বেঞ্চ এই পর্যবেক্ষণ দিয়েছে।
রায়ের খবর প্রকাশ পেয়েছে বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর)। আইনবিষয়ক সংবাদমাধ্যম বার অ্যান্ড বেঞ্চের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রায় ঘোষিত হয় সোমবার।
মামলার নথি অনুযায়ী, মৃত তরুণী ও অভিযুক্ত তরুণ ছোটবেলার বন্ধু ছিলেন। পরে তাদের মধ্যে সম্মতিভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং প্রায় তিন মাস তারা তরুণের বাসায় একসঙ্গে থাকেন। তরুণ বিয়ের প্রস্তাব দিলে তরুণী ও তার পরিবার রাজি হয়। পরে অভিযোগ ওঠে, তরুণের এক বন্ধু তরুণীর বদনাম করেন, তরুণের বাবা-মা ও বোন সম্পর্ক ভাঙতে চাপ দেন এবং বোনের হবু বরও আপত্তি জানান। একপর্যায়ে তরুণ বিয়েতে অসম্মতি জানান বলে অভিযোগ। মৃত্যুর আগে তরুণী তার বড় বোনকে ফোনে এ কথা জানিয়েছিলেন।
২০২২ সালে তরুণীর বোনের বক্তব্যের ভিত্তিতে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০৬ ও ৩৪ ধারায় মামলা হয়। এতে আসামি করা হয় ছয়জনকে। তাদের মধ্যে ছিলেন তরুণ নিজে, তার বাবা-মা ও বোন। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারা আত্মহত্যায় প্ররোচনা এবং ৩৪ ধারা অভিন্ন উদ্দেশ্যে একাধিক ব্যক্তির কাজ সংক্রান্ত। মামলাটি তেলেঙ্গানার মেদচাল-মালকাজগিরি জেলার কুশাইগুড়ার একটি আদালতে ১০১/২০২৪ নম্বর দায়রা মামলা হিসেবে বিচারাধীন ছিল।
ভারতের সর্বোচ্চ আদালত বলেছে, অভিযোগকারীর বক্তব্য পুরোপুরি মেনে নিলেও এতে প্ররোচনার কোনো আচরণ পাওয়া যায় না। বড়জোর এখানে বিয়েতে অস্বীকৃতির কথা আছে, যার পর তরুণী আত্মহত্যা করেছেন। আত্মহত্যায় প্ররোচনার অপরাধ প্রমাণ করতে হলে অভিযুক্তের ইচ্ছাকৃত প্ররোচনা কিংবা বিয়ে ভেঙে গেলে সঙ্গী এমন পথ বেছে নিতে পারেন, সে বিষয়ে তার সম্যক ধারণা থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হতে হবে। আদালতের মতে, এ ক্ষেত্রে অস্বীকৃতিটি তরুণীকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ছিল না। তরুণ আগে থেকেই জানতেন যে তরুণী এমন পদক্ষেপ নিতে পারেন, সেই ধারণাও তার ওপর আরোপ করা যায় না। শুধু অভিযোগকারীর বক্তব্য এসব প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়। অর্থাৎ রায়ে ‘ইচ্ছাকৃত প্ররোচনা’ ও ‘জ্ঞান’ থাকার শর্তের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা অভিযোগের বাইরে প্রমাণ ও প্রেক্ষাপটের গুরুত্বই তুলে ধরে।
বেঞ্চ আরও প্রশ্ন তোলে, সম্পর্ক যখন সম্মতিভিত্তিক এবং তরুণের পরিবারও তা মেনে নিয়েছিল বলে দেখা যাচ্ছে, তখন তরুণীকে কেন তার সঙ্গীর বাসা থেকে নিয়ে যাওয়া হলো। অভিযোগগুলোকে আদালত ভিত্তিহীন বলেও উল্লেখ করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্পর্কটি যে সম্মতিভিত্তিক ছিল, তা অভিযোগকারী পক্ষও স্বীকার করে নিয়েছে; বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর্যবেক্ষণে গুরুত্ব পেয়েছে।
মামলাটি আইনি লড়াইয়ের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে সর্বোচ্চ আদালতে পৌঁছায়। বিচারিক আদালত ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে অভিযুক্তদের অব্যাহতির আবেদন নাকচ করে দেয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তেলেঙ্গানা হাইকোর্টও তাদের রিভিশন আবেদন খারিজ করে বলে, বিতর্কিত তথ্যগুলো পূর্ণাঙ্গ বিচারেই নির্ধারণ করতে হবে। শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টে এসে স্বস্তি মিলল অভিযুক্তদের। সেখানে মামলাটির শিরোনাম ‘এক্সওয়াইজেড ও অন্যান্য বনাম তেলেঙ্গানা রাজ্য ও অন্য একজন’।
আদালত দায়রা মামলার সব কার্যক্রম বাতিল করেছে। ফলে তরুণের পরিবারের সদস্যসহ ছয় আসামির সবাই এ মামলা থেকে রেহাই পেলেন। কেউ হেফাজতে থাকলে অন্য মামলায় প্রয়োজন না হলে তাকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে বলা হয়েছে। জামিনে থাকা আসামিদের জামিননামাও বাতিল হয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালে কামারুদ্দিন দস্তগীর সানাদি বনাম মহারাষ্ট্র রাজ্য মামলায়ও সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া নিজে আত্মহত্যায় প্ররোচনা নয়। তবে এবারের রায়ে কোনো পূর্ববর্তী রায়ের উল্লেখ আছে কি না, তা প্রতিবেদনগুলোতে স্পষ্ট নয়।
তবে আদালত রায়ে এও উল্লেখ করেছে, আত্মহত্যা স্পর্শকাতর বিষয়। কেউ মানসিক চাপে থাকলে বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে কথা বলা কিংবা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া জরুরি।