জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক:
রেমিট্যান্স বাড়ছে, রিজার্ভ বাড়ছে, মূল্যস্ফীতিও কিছুটা কমেছে। তাহলে কি বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন নিরাপদ? পুরোপুরি নয়। কারণ অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে এমন কয়েকটি ঝুঁকি এখনও রয়ে গেছে। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা থেকে শুরু করে কম বিনিয়োগ, রাজস্ব ঘাটতি, বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য ঝুঁকি সবগুলো একসঙ্গে কাজ করতে পারে। আইএমএফ বলছে, সংস্কার না হলে এফওয়াই ২০২৭ এ বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে যেতে পারে। তাহলে ২০২৭ এর আগে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় পাঁচ ঝুঁকি কোনগুলো?
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন একই সঙ্গে স্বস্তি এবং উদ্বেগের দুটি গল্প চলছে। একদিকে রেমিট্যান্স শক্তিশালী, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগের তুলনায় ভালো অবস্থানে এবং মূল্যস্ফীতিও কিছুটা কমেছে। অন্যদিকে বিনিয়োগ দুর্বল, ব্যাংকিং খাত চাপে, রাজস্ব আদায় দুর্বল এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও অনিশ্চয়তা রয়েছে। অর্থাৎ সংকটের তীব্রতা কমলেও ঝুঁকি শেষ হয়ে যায়নি। ২০২৭ সালের আগে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি ঝুঁকি কী হতে পারে?
প্রথম ঝুঁকি, ব্যাংকিং খাত
বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় অংশই ব্যাংকনির্ভর। কিন্তু খেলাপি ঋণ, ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি এবং দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সমস্যা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। আইএমএফ সতর্ক করেছে, ব্যাংকিং খাতের সমস্যার সমাধান না হলে ঋণপ্রবাহ কমবে, বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে এবং প্রবৃদ্ধি দুর্বল থাকবে।
অর্থাৎ ব্যাংকের সমস্যা শুধু ব্যাংকের সমস্যা নয়। এর প্রভাব পড়তে পারে ব্যবসা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এমনকি সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনাতেও।
দ্বিতীয় ঝুঁকি, মূল্যস্ফীতি
জুলাইয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে। এটি আগের তুলনায় স্বস্তির খবর। কিন্তু ৮ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতি মানে মানুষের জীবনযাত্রার খরচ এখনও দ্রুত বাড়ছে।
মূল্যস্ফীতি আবার বাড়তে পারে জ্বালানি, খাদ্য বা আমদানি ব্যয়ের ধাক্কায়। আইএমএফ-এর মতে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের আমদানি ও ভর্তুকি ব্যয় বাড়িয়ে নতুন মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করেছে।
তৃতীয় ঝুঁকি, দুর্বল বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি
ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ না করলে নতুন কারখানা, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন তৈরি হবে না। বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশে বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল থাকার কথা উল্লেখ করেছে।
আইএমএফ-এর জুলাইয়ের মূল্যায়নে এফওয়াই২০২৭ এর প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে যাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, আর্থিক খাত ও রাজস্ব খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার না হলে মধ্যমেয়াদেও প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচে নেমে যেতে পারে।
চতুর্থ ঝুঁকি রাজস্ব ও সরকারের আর্থিক চাপ
বাংলাদেশের কর আদায় দীর্ঘদিন ধরেই তুলনামূলক কম। ফলে সরকারের হাতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় করার জায়গা সীমিত থাকে।
অন্যদিকে সুদ পরিশোধ ও ভর্তুকির মতো ব্যয় বাড়লে বাজেটের ওপর চাপ আরও বাড়ে। আইএমএফ তাই রাজস্ব বাড়ানো এবং অপ্রয়োজনীয় ভর্তুকি ও ব্যয় যৌক্তিক করার ওপর জোর দিয়েছে।
পঞ্চম ঝুঁকি বৈশ্বিক ধাক্কা
বাংলাদেশ তেল, জ্বালানি ও বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানি করে। আবার তৈরি পোশাকসহ রপ্তানির ওপরও দেশের অর্থনীতি অনেকটা নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। বাণিজ্য উত্তেজনা বা নতুন শুল্ক এলে রপ্তানি বাজারে চাপ তৈরি হতে পারে। আর বৈশ্বিক অর্থনীতি দুর্বল হলে বাংলাদেশের রপ্তানি ও রেমিট্যান্সেও প্রভাব পড়ার ঝুঁকি থাকে। বিশ্বব্যাংকও সতর্ক করেছে, দীর্ঘস্থায়ী মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত হলে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ভর্তুকি, আমদানি ব্যয় এবং বৈদেশিক লেনদেনে চাপ বাড়তে পারে।
তবে পাঁচটি ঝুঁকির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এগুলো একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। ব্যাংক দুর্বল হলে ঋণ কমে, বিনিয়োগ কমে। বিনিয়োগ কমলে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান দুর্বল হয়। রাজস্ব কমলে সরকারের সংস্কারের সক্ষমতাও কমে। আবার বৈশ্বিক ধাক্কায় আমদানি ব্যয় বাড়লে মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ একটি ঝুঁকি আরেকটিকে আরও বড় করে তুলতে পারে। তাই বাংলাদেশের সামনে এখন শুধু রিজার্ভ বাড়ানোর প্রশ্ন নয়।
প্রশ্ন হলো, এই স্বস্তিকে কি স্থায়ী অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা যাবে? ব্যাংকিং সংস্কার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বাড়ানো, রাজস্ব সক্ষমতা শক্তিশালী করা এবং বৈশ্বিক ধাক্কা মোকাবিলার প্রস্তুতি ২০২৭-এর আগে বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় পরীক্ষা এখন সেখানেই।
২০২৭-এর আগে অর্থনীতির সামনে পাঁচ বড় চ্যালেঞ্জ
রেমিট্যান্স ও রিজার্ভ বাড়ছে, মূল্যস্ফীতিও কিছুটা কমেছে। তবু ২০২৭ এর আগে বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে পাঁচ বড় ঝুঁকি রয়েছে—ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কম বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি, দুর্বল রাজস্ব এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা। আইএমএফ বলছে, প্রয়োজনীয় সংস্কার না হলে এফওয়াই ২০২৭-এ প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে যেতে পারে। সবচেয়ে বড় বিষয়, ঝুঁকিগুলো আলাদা নয়। একটি সমস্যা বাড়লে অন্য সমস্যাগুলোকেও আরও বড় করে তুলতে পারে।
প্রবৃদ্ধি ঠেকাতে পারে অর্থনীতির এই পাঁচ ঝুঁকি
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন স্বস্তি আছে, কিন্তু নিরাপত্তা পুরোপুরি নেই। ব্যাংকিং খাত দুর্বল হলে ঋণ ও বিনিয়োগ কমতে পারে। মূল্যস্ফীতি বাড়লে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমবে। বিনিয়োগ দুর্বল থাকলে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি আটকে থাকবে। রাজস্ব কম হলে সরকারের ব্যয়ের সক্ষমতা সীমিত হবে। আর তেলের দাম বা বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধাক্কা এলে আমদানি ও রপ্তানি উভয় জায়গায় চাপ আসতে পারে। তাই ২০২৭-এর আগে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, বর্তমান স্থিতিশীলতাকে টেকসই অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়া।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি