আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে আবারও আলোচনায় এসেছে ইয়েমেনের সশস্ত্র রাজনৈতিক আন্দোলন হুথি। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং দেশটির একটি বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে গোষ্ঠীটি। তবে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানিয়েছে, রিয়াদ লক্ষ্য করে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।
হুথিদের এই তৎপরতা নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকে শুরু হওয়া সংঘাত এখন সৌদি আরব ও ইরানের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট এবং আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের সঙ্গেও যুক্ত।
হুথিদের আনুষ্ঠানিক নাম ‘আনসার আল্লাহ’। ১৯৯০-এর দশকে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে জায়দি শিয়া সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে আন্দোলনটির বিকাশ ঘটে। অঞ্চলটির অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতা, রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ এবং স্থানীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি তাদের উত্থানে ভূমিকা রাখে। প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুথির নাম থেকেই আন্দোলনটির পরিচিতি এসেছে। তার মৃত্যুর পর ভাই আবদুল মালিক আল-হুথি নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
২০১১ সালে ইয়েমেনে গণবিক্ষোভের পর প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহ ক্ষমতা ছাড়েন। রাজনৈতিক রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে হুথিরা নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে। ২০১৪ সালে তারা রাজধানী সানা দখল করলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার রাজধানী ছাড়তে বাধ্য হয়। পরের বছর সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট হুথিদের অগ্রযাত্রা থামাতে এবং স্বীকৃত সরকারকে পুনর্বহাল করতে অভিযান শুরু করে। তবে দীর্ঘ লড়াইয়েও গোষ্ঠীটিকে তাদের প্রধান ঘাঁটি থেকে সরানো সম্ভব হয়নি।
সৌদি আরবের সঙ্গে হুথিদের বিরোধের অন্যতম কারণ সীমান্ত নিরাপত্তা ও ইয়েমেনের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ। পাশাপাশি ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতাও সংঘাতকে জটিল করেছে। ইরান হুথিদের গুরুত্বপূর্ণ সমর্থক। যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশের অভিযোগ, তেহরান গোষ্ঠীটিকে অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। তবে হুথিদের সব সিদ্ধান্ত সরাসরি ইরান নিয়ন্ত্রণ করে-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পৃথক প্রমাণ প্রয়োজন। ইয়েমেনের নিজস্ব রাজনৈতিক বাস্তবতা ও গোষ্ঠীটির স্থানীয় স্বার্থও গুরুত্বপূর্ণ।
সৌদি আরবের উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মোকাবিলা কঠিন। তুলনামূলক সস্তা ড্রোন প্রতিহত করতে ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজন, একসঙ্গে একাধিক দিক থেকে হামলা এবং ইয়েমেনের দুর্গম ভূপ্রকৃতি প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। তবে সাম্প্রতিক হামলার দাবি ও ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি।
২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে হুথিরা লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করে। ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশকে তারা এসব হামলার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এর ফলে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন, বিকল্প পথে পরিবহন, বিমা ও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে।
সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাত আরও বাড়লে এর প্রভাব ইয়েমেনের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের নৌপথ একসঙ্গে ঝুঁকির মুখে পড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি ইয়েমেনের রাজনৈতিক সমঝোতা, ক্ষমতা ভাগাভাগি এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে আলোচনা জরুরি।
জা.অর্থনীতি/এসআই